বিজ্ঞাপন

বাজেটে প্রণোদনা পেতেই ছাঁটাই নিয়ে এমন বক্তব্য বিজিএমইএর!

June 5, 2020 | 11:41 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আসন্ন বাজেটে প্রণোদনা বা অর্থ সহয়তা পেতেই শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বক্তব্য দিয়েছেন বলে মন্তব্য এসেছে কয়েকজন শ্রমিক নেতার কাছ থেকে। তার এই বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলেও মন্তব্য তাদের। আর শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে এমন বক্তব্যে পোশাকখাতে নতুন করে শ্রম অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলেও শঙ্কা জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৫ জুন) কয়েকজন শ্রমিক নেতার সঙ্গে সারাবাংলার কথা হলে তারা এমন মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিজিএমইএ সভাপতির ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘অনেকেই ছাঁটাই নিয়ে প্রশ্ন করছেন। ছাঁটাই কিন্তু পহেলা জুন থেকে হবে আসলে। এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। কিন্তু করার কিছু নেই। কারণ শতকরা ৫৫ ভাগ ক্যাপাসিটিতে ফ্যাক্টরি চললে আমাদের পক্ষে ছাঁটাই ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তবে এই ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের জন্যে কী করা হবে, সে জন্যে সরকারের কাছে আমরা বিনীতভাবে আবেদন করি, আমরা একসঙ্গে কীভাবে এই ক্রাইসিসটা অতিক্রম করব। কারণ ছাঁটাই আসলে হবে। তবে এটিও পরিস্থিতি ঠিক হঠাত করে বদলে যেতে পারে। যদি পরিস্থিতির উত্তরণ হয় তবে একই শ্রমিকরা আমাদের ফ্যাক্টিরিতে অগ্রাধিকার পাবেন।’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন: করোনায় আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম

ছাঁটাই বিষয়ে অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিজিএমইএ ব্যবস্থা নেবে সেই কারখানার বিরুদ্ধে যারা এপ্রিল ও মে মাসে ছাঁটাই করেছে। এর বাইরে নয়। কারণ ছাঁটাই করা এবং কাজ দেওয়া এই দুটোই কিন্তু উদ্যোক্তাদের করতে হয়। মজুরি দেওয়ার জন্যে সরকার একটি লোন দিয়েছেন। আমাদের সহযোগিতা করেছেন। এটি কিন্তু জুন মাসে শেষ হয়ে যাবে। জুন মাসে শেষ হলেও আমাদের বুঝতে হবে ৫৫ শতাংশ ক্যাপাসিটি দিয়ে ফ্যাক্টরি চালিয়ে ১০০ ভাগ লেবার ফোর্স রাখতে পারব, আমরা এটা কিন্তু পারব না।’

জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছাঁটাই তো তারা করে আসছে। এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের উপরে শ্রমিক ছাঁটাই করে ফেলেছে। এখন ছাঁটাইয়ের বড় করে ঘোষণা দিয়েছে, হয়ত বড় কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্যে। হয়ত তারা এখন শ্রমিক ছাঁটাই করতে আইন শিথিল করতে চায়, শ্রমিকদের এখন বের করে দেবে টাকা পয়সা ছাড়া, পরে আবার প্রণোদনা নেবে, আবারও শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকাবে। এতে মালিকপক্ষের সব দিক থেকেই লাভ।’

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে প্রকাশ্যে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কথা বলা, কারণ সামনে বাজেট আছে। নতুবা এখন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রশ্নই ওঠে না। সামনের বাজেট থেকে তারা আরও প্রণোদনা নিতে চায়। আর বিজিএমইএ সভাপতির এ ঘোষণায় গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। দেখা দিতে পারে শ্রমিক অসন্তোষ। এ বক্তব্য দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি। এই বক্তব্য শ্রমিক অসন্তোষের জায়গা তৈরি করেছে।’

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘গরিবের এক ধরনের শক্তি আছে যে কারণে করোনা হয় না- বিজিএমইএ সভাপতির এই বক্তব্য বর্ণবাদকে উস্কে দিয়েছেন। বরং তিনি বলতে পারতেন গরিবের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। শ্রমিকদের বয়স কম থাকায় তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্তের হার কম। মালিকপক্ষ হিসেবে তার বক্তব্য সমিচীন হয়নি।’

ছাঁটাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছাঁটাই তো ঈদের পর দিন থেকেই হচ্ছে। শ্রমিকদের ফ্যাক্টরিতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। আইডি কার্ড রেখে বের করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেওয়া হলেও বেতন দেওয়া হয়নি। অনেক কারখানায় এখনও বেতন বোনাস বকেয়া রয়েছে। সামনে বাজেট থাকায় তারা নতুন করে হয়তো সরকারের কাছ থেকে অর্থ সহয়তা চায়। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- এক্ষেত্রে কোনো সহয়তা দেওয়া হলে তা যেন সরাসরি শ্রমিককে দেওয়া হয়। কারণ মালিকপক্ষ এবারও ৬০ শতাংশ বেতন দিয়েছে।’

এদিকে, পোশাক খাতে করোনা আক্রান্ত শ্রমিকদের সংখ্যা কম হওয়ার যুক্তি তুলে ধরে বৃহস্পতিবার ওই অনুষ্ঠানে রুবানা হক বলেন, ‘আমাদের আসলে একটা সুবিধা আছে। কারণ আমাদের আসলেই ফিগারসগুলো কম। যেটি আমরা আশা করেছিলাম, খুবই চিন্তায় ছিলাম, কী হবে। সেই তুলনায় আসলে কিন্তু একেবারেই কম। কারণ আপনারা বুঝতে পারছেন, মিডিয়া থেকেও অনেকেই বলছেন, যত ভেবেছিলাম তত হয়নি। কারণ একটি। কারণ এক হলো ওরা রেজিলিয়েন্ট আমাদের চেয়ে, আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমি মনে করি গরিব মানুষের এক ধরনের শক্তি থাকে। দারিদ্র্যের আলাদা একটি শক্তি আছে কিন্তু। তারা জানে তার চাকরি চলে গেলে বা চাকরি না থাকলে কী করবে। কাজেই সে লড়তে জানে এবং সে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সাবধানী। আমরা কিন্তু মধ্যবিত্ত ও বড় লোক পরিবারের অনেকেই কিন্তু এখনই রেস্টুরেন্টে যাওয়া শুরু করে দিয়েছি। আমাদের শ্রমিক কিন্তু এটি করছেন না। যার জন্যে সংক্রমণটি এমনিও কম। কারণ তারা অন্তত পক্ষে সচেতন যে এটি হবে না এবং তারা অসুস্থ হবেন না। কারণ সমস্ত কিছু কিন্তু তাদের এটার ওপর নির্ভর করে।’

বিজিএমইএ সভাপতির এসব বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। শ্রমিক নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়েছে বিজিএমইএ। একাধিক সংগঠনের পক্ষে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি এবং ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল এর সাবেক মহাসচিব মো. তৌহিদুর রহমান সংবাদ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বৈশ্বিক করোনা মহামারির কারণে পোশাক শিল্প এবং শ্রমিক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছেন। কিছু কিছু ফ্যাক্টরিতে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিতসহ নতুন ক্রয়াদেশ প্রদান থেকে বিরত রয়েছেন। যে কারণে কাজ না থাকার প্রেক্ষাপটে শ্রমিকের ছাঁটাইয়ের মত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে কিন্তু বিজিএমইএ এর মত একটি দায়িত্বশীল মালিক সংগঠনের সভাপতি শ্রমিক ছাঁটাই হবে এহেন বক্তব্য অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বটে।’

আরও পড়ুন: চলতি মাস থেকে গার্মেন্টে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবে

এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হলে জাতীয় দুর্যোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কনফেডারেশন অব লেবার (বিসিএল) নামের একটি সংগঠন। তারাও বিজিএমইএ’র এই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিজিএমইএর সিনিয়র সহ সভাপতি ফয়সাল সামাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘উনি কিন্তু ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেননি। আর ছাটাই কিন্তু মালিকের অধিকার। ছাঁটাই হবে কি হবে না এটা ফ্যাক্টরি ও ব্যবসার ওপরে নির্ভর করবে। অনেক ফ্যাক্টরিতে কিন্তু কাজ ছিল না, তারপরেও বেতন দিতে হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে আমরা প্রণোদনা পেয়েছি, যেটি কিন্তু লোন। এপ্রিল মে জুনে অর্ডার কম। করোনার কারণে সরকার প্রণোদনা দিয়েছে। আমরা শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়েও বেতন দিচ্ছি। জুলাই থেকে কিন্তু অর্ডার আরও কম। ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ অর্ডার আছে। ফলে সরকার প্রণোদনা দিলেও আমরা কিন্তু আর লায়এবিলিটি বহন করতে পারব না।’

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘কেউ কখনো ইচ্ছে করে ছাঁটাই করে না। মালিকরা শেষ দিন পর্যন্ত শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তার শ্রমিকদের ধরে রাখার চেষ্টা করেন। অনেক মালিক তার ফ্যাক্টরির মালপত্র বিক্রি করেও শ্রমিকের বেতন দিয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই কোনো কিছু পাওয়ার জন্যে তিনি এমন মন্তব্য করেছে বলে আমি মনে করি না। বরং বর্তমান পরিস্থিতির কারণেই হয়ত তিনি এ মন্তব্য করেছেন। আর সরকার কিন্তু আমাদের প্রণোদনা দেয়নি। দিয়েছে ঋণ।’

আর বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী সারাবাংলাকে বলেন, ‘শ্রমিক নেতারা নতুন করে প্রণোদনা পাওয়ার বিষয়ে যা বলছেন তা ভিত্তিহীন। এসব কথার কোনো যুক্তি নেই। আর উনি (বিজিএমইএ সভাপতি) কিন্তু সরাসরি ছাঁটাইয়ের কথা বলেননি। উনি বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ওয়ার্ল্ড মার্কেটে কাজ কমে যাওয়া ও অর্ডার কমে যাওয়ার কথা বলেছেন। আর মালিকরা শেষ পর্যন্ত তার শ্রমিক ধরে রাখতে চায়।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন