বিজ্ঞাপন

পিরিয়ডকে সহজ করবে মেনস্ট্রুয়াল কাপ

June 8, 2020 | 1:11 pm

মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ঋতুপাত্রের সাথে আমার পরিচয় বছর পাঁচেক এবং ব্যবহার করা শুরু করেছি মাস ছয়েক। প্রথমত, এর ব্যবহারবিধি জেনে একটা ভয় বা শঙ্কা কাজ করেছিলো এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে কোথায় পাওয়া যায় সে ব্যাপারে ধারণা ছিলো না। কর্মজীবী নারী হওয়ার কারণে পিরিয়ডকালীন সময়ে যত ঝক্কিঝামেলা সহ্য করেছি সেগুলো কমবেশি সকল কর্মজীবী নারীই সহ্য করেন বলে আমার ধারণা। তারপর একদিন অনলাইন ঘেটে অল্পসবিস্তর পড়াশোনা করে সাহস করে ব্যবহার করবার সিদ্ধান্ত নিলাম। দু'একজন বন্ধু সাহসের আগুনে ঘি দিয়েছিলেন। এরপরের অভিজ্ঞতাটুকু নিচে শেয়ার করছি।

বিজ্ঞাপন

মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ঋতুপাত্র হচ্ছে মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন, ল্যাটেক্স (একধরণের প্রাকৃতিক রাবারজাতীয় পদার্থ) কিংবা থার্মোপ্লাষ্টিক আইসোমার দিয়ে তৈরি নারীর জন্য একটি হাইজিন ডিভাইস যা দেখতে অনেকটা ঘন্টার মত কিংবা ফানেলের মত। এর একপাশে একটি লম্বাটে ছোট কাণ্ড আছে যা কাপটিকে যোনীপথে সেট করতে বা বের করতে সাহায্য করে। ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে এটা যোনীপথে সেট করা হয় যেন ঋতুস্রাবকালীন তরল এতে জমা হয়। প্রতি ৪ থেকে ১২ ঘন্টা অন্তর অন্তর এটি বের করে জমে থাকা তরলটুকু ফেলে, পানিতে ধুয়ে, পুনরায় লাগানো হয়। প্রতি ঋতুস্রাবের পরে এটি ধুয়ে পরের মাসের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষণের প্রক্রিয়া খুবই সাধারণ, পরিষ্কার পাত্রে পানি গরম করে কাপটিকে ফুটিয়ে নিতে হবে পাঁচমিনিট। এটি পরিষ্কার করতে কোন সাবান বা ডিটারজেন্ট লাগে না। স্যানিটারি প্যাড বা ট্যাম্পুনের মত এটি তরল শুষে নেয় না, বরং জমিয়ে রাখে। একটি কাপ সাধারণত আট থেকে দশ বছর ব্যবহার করা যায়। প্রতিমাসে প্যাড বা ট্যাম্পুন কেনা, ব্যবহার ও ফেলে দেয়ার চেয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারযোগ্য, নিঃসন্দেহে সুলভ এবং পরিবেশবান্ধব।

বয়স, কী পরিমান তরল নির্গত হয়, যোনীপথের আকার অনুযায়ী মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ঋতুপাত্র তিনরকম আকারে পাওয়া যায়। সাধারণত, ঋতুপাত্র স্বচ্ছ বা ট্রান্সপারেন্ট হয়। তবে বর্তমানে বেগুনি বা গোলাপি রঙের ঋতুপাত্রও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। নিজ অভিজ্ঞতায় ঋতুপাত্র ব্যবহারের যে সকল সুবিধা অনুভব করেছি সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনায় আসা যাক:

বিজ্ঞাপন

১. একটি ঋতুপাত্র দশ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। পারতপক্ষে দামি মনে হলেও ব্যবহারের সময় বিচারে নিঃসন্দেহে সুলভ। ধরুন, আপনাকে মাসে একটি করে স্যানিটারি প্যাডের প্যাকেট কিনতে হয়। দাম বিচারে ধরে নিলাম সেটা পঞ্চাশ টাকা, বছরে ছয়শ টাকা। দশবছরে ছয় হাজার টাকা। একটি ঋতুপাত্রের দাম আঠারোশ থেকে দুই হাজার টাকা যা আপনি একটানা দশবছর ব্যবহার করতে পারবেন।

২. প্রতিমাসে যে পরিমান প্যাড বা ট্যাম্পুন আপনাকে ব্যবহার করতে হয় এবং ফেলে দিতে হয়, সে হিসেবে ঋতুপাত্র বা মেন্সটুয়াল কাপ নিঃসন্দেহে পরিবেশবান্ধব! পিরিয়ডের তরলটুকু বাদে অন্যকোন আবর্জনা তৈরি হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

৩. প্যাড কিংবা ট্যাম্পুনে লিক হবার সম্ভাবনা থাকে, ঋতুপাত্র বা কাপ ইউজ করলে সেটা হবার সম্ভাবনা নেই। শুধু নির্দিষ্ট সময়ে মনে করে খুলে পরিষ্কার করতে হয়। ফলে হাঁটা, বসা, ঘুমানো বা কাজের সময় লিক হবার টেনশন করতে হবে না।

৪. প্যাড বা ট্যাম্পুনের চেয়ে এটি বেশি পরিমাণ তরল ধরে রাখতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন

৫. প্যাড বা ট্যাম্পুনে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব থাকে, এমনকি অনেক নারী ফাঙ্গাল ইনফেকশনেও ভোগেন। কিন্তু কাপ ইউজ করলে, যেহেতু রক্ত বা তরল বাইরেই আসছে না সেহেতু ভেজা ভাব হবার উপায় নাই।

৬. ঋতুপাত্র ব্যবহারে আপনাকে অন্তর্বাস পর্যন্ত পরতে হবে না। অন্তর্বাস, প্যাড ছাড়া যে নির্বিঘ্নে একটি পিরিয়ড যেতে পারে তা পাঁচবছর আগেও কল্পনা করিনি।

বিজ্ঞাপন

৭. আপনারা কী পিরিয়ডকালীন সময়ে সাঁতার কাটার কথা চিন্তা করেছেন? হ্যা, মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করে সাঁতার কাটতেও সমস্যা নেই!

৮. মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, মাঠে/ঘাটে/অফিসে কাজ করা কোনকিছুতেই পিরিয়ড বাঁধা হতে পারে না।

যেকোন জিনিস ব্যবহারের সহজ বা কঠিন দুটো দিকই থাকে। যেমন, ঋতুপাত্রটি প্রতিমাসে ব্যবহার শেষে পরিষ্কার করতে হয় শুধু পানি দিয়ে এবং গরম পানিতে ফুটিয়ে নিতে হয়। যে সকল অঞ্চলে পানির অভাব, আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা সীমিত, তাদের ক্ষেত্রে এটি পরিষ্কার করা কষ্টসাধ্য হতে পারে। আবার, পাবলিক টয়লেটে এটি পরিষ্কার করাও কষ্টসাধ্য। পাবলিক টয়লেটের ক্ষেত্রে ভেজা টিস্যু দিয়ে মুছে পুনরায় ব্যবহার করার কথা বলা হয়। আবার এটি যোনীপথে সেট করা বা ঢুকানো এবং বের করার প্রক্রিয়াটুকুও অনেকের কাছে কষ্টসাধ্য। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, ওপরের বিশাল লিস্টের সুবিধাগুলো পেতে আমি এটুকু কষ্ট করতে রাজি! তবে কোন ধরণের শারীরিক সমস্যা বা অভ্যাস যেমনঃ সিস্ট বা টিউমার থাকা, পিরিয়ডের সময়ে নানান শারীরিক সমস্যা বা আইইউডি ব্যবহার করার অভ্যাস যদি থেকে থাকে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো। ম্যান্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সতর্ক থাকার বিষয়টি হচ্ছে কাপটিকে যথাযথ উপায়ে পরিষ্কার রাখা এবং ব্যবহারের সময় নিজের হাত ভালো করে পরিষ্কার করে নেয়া।

এবার মেনস্ট্রুয়াল কাপ নিয়ে যেসকল মিথ বা কুসংস্কার তৈরি হয়েছে সেগুলোর দিকে একটু নজর দেই:

১. মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ঋতুপাত্র ব্যবহারে ভার্জিনিটি নষ্ট হয়ে যাবে
খুবই ভুল একটি ধারণা। নারীর হাইমেন হচ্ছে ফ্লেক্সিবল, ইলাস্টিক বা নমনীয় টিস্যু দিয়ে তৈরি। ফলে কাপ ঢুকালে সেটা ছিঁড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। এছাড়া খেলাধুলা, দৌড়ঝাপ, কাজকর্ম, ঘোড়ায় চড়ার মাধ্যমেও নারীর হাইমেন ছিঁড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে হাইমেন ছিঁড়ে যাবার সাথে ভার্জিনিটি নষ্ট হয়ে যাবার যে কুসংস্কার হাজার বছর ধরে পিতৃতন্ত্র নারীর ঘাড়ে দিয়ে রেখেছে সেটা থেকে বেরিয়ে আসাটা এই একবিংশ শতকে খুবই জরুরী। ভার্জিনিটি বা সতীত্ব কখনোই একটি চামড়ার পরত বা টিস্যু ছিঁড়ে যাবার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে না।

২. কাপটি যোনীপথে সেট করার পর সেটি ভেতরে কোথাও হারিয়ে যাবে এবং সার্জারী ছাড়া বের করা যাবে না
এটিও খুবই ভুল একটি ধারণা। নারীর যোনীপথ ছোট একটি পথ যার শেষপ্রান্তে আছে জরায়ু। নারীর যোনীপথ সাধারণত তিন থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা। ফলে মেনস্ট্রুয়াল কাপ হারিয়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। মোটকথা- যোনীপথের একটি মুখ, যেটি খোলা। অন্য প্রান্তে আছে জরায়ুর দেয়াল। তাই এটি হারিয়ে যাবে কোথায়?

৩. মেনস্ট্রুয়াল কাপ সেট করা থাকলে প্রাকৃতিক কাজ (প্রস্রাব বা মলত্যাগ) করা যাবে না
প্রিয় নারীগণ, আপনাদের নিজের শরীরকে চেনা খুব জরুরী। আপনার পিরিয়ডের তরল শরীরের যে পথ দিয়ে বের হয়, আপনি সে জায়গা দিয়ে কখনোই প্রাকৃতিক কাজ করেন না। দুটো পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে প্রাকৃতিক কাজ করতে কোন সমস্যা হবার কথা নয়!

৪. মেনস্ট্রুয়াল কাপ শরীরের জন্য ক্ষতিকর, ব্যথা হবে, অস্বাচ্ছন্দ্যকর
প্রথমত স্বাচ্ছন্দ্য অস্বাচ্ছন্দ্য নির্ভর করে ব্যক্তির নিজ আরামের ওপর। প্রথমদিন ব্যবহারে কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও পরবর্তীতে মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করে সাধারণত কেউ অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননা। অন্তত গবেষণা তাই বলছে। অন্যদিকে এটি নরম সিলিকন দিয়ে তৈরি, ফলে ব্যথা হবার সম্ভাবনাও কম। এবং ক্ষতিকর অবশ্যই নয়।

৫. মেনস্ট্রুয়াল কাপ প্রতিবছর ফেলে দিয়ে নতুন কিনতে হবে
না, আপনি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করেন তবে একটি মেনস্ট্রুয়াল কাপ আট থেকে দশবছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।

৬. মেনস্ট্রুয়াল কাপ একটি নতুন আবিষ্কার
এটাও ভুল ধারণা! মিডিয়ার কল্যানে কিংবা বাজারে সহজলভ্যতার দরুন আমরা এখন এর নাম শুনতে পেলেও প্রথম মেনস্ট্রুয়াল কাপ আবিষ্কার হয় ১৯৩৭ সালে। আমেরিকান নারী লিওনা চালমারস (Leona Chalmers) রাবার দিয়ে প্রথম মেনস্ট্রুয়াল কাপ তৈরি করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরে রাবারের ঘাটতি হওয়ায় এর উৎপাদন সমস্যার মুখে পড়ে। এছাড়া সে সময়ে সাধারণ পরিসরে এটা ব্যবহার এবং পরিষ্কার করার ঝামেলা নিয়ে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে।

৭. পিরিয়ডের রক্ত ক্ষতিকর এবং এটি হাতে লাগা উচিত নয়
পিরিয়ডের তরল আসলে কিছু মৃত কোষ আর রক্তের মিশ্রণ। একজন নারী গর্ভধারণ না করলে মাসে মাসে তার এই মৃত কোষ রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। ‘পিরিয়ডের রক্ত ক্ষতিকর’ এ কুসংস্কার পূর্বে মানলেও বিজ্ঞানের এ যুগে এটা প্রমাণিত যে এটি ক্ষতিকর নয়, বরং এটি খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে যাদের রক্তবাহিত রোগ যেমন এইচআইভি কিংবা এইডসের ঝুঁকি আছে তাদেরকে ভালোভাবে হাত ধুয়ে এটি ব্যবহার করতে বলা হয়।

৮. রক্ত যদি কাপে জমা থাকে তাহলে সেটা আবার জরায়ুতে ফেরত যাবে
একদমই অসম্ভব একটি বিষয়। এমনকি আপনি নিজেকে উলটো করে রাখলেও জরায়ুতে গিয়ে রক্ত জমা হবার উপায় নেই।

কর্মজীবী কিংবা ব্যস্ত নারীদের জন্য মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার একটি নিশ্চিন্ত এবং চিন্তামুক্ত একটি পদ্ধতি। একবিংশ শতকে নারীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া পিরিয়ডের চিন্তা থেকে মুক্ত করবার জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি মাইলফলক। তবে নকল পণ্য থেকে সাবধান থেকে অবশ্যই ভালো ও নিরাপদ কাপ ব্যবহার করা উচিত।

ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। নারী গর্ভধারণ করছে না বলে প্রতিমাসে কিছু তরল রক্তের সাথে বেরিয়ে আসে। যদি সে গর্ভধারণ করে তবে সেই তরলটুকুই জমে থেকে ভ্রূণকে নিরাপদে নয়টি মাস ধরে বড় হতে সাহায্য করে। এটা অপবিত্র কিছু নয়, এটা অশুচি কিছু নয়, এটা ক্ষতিকরও কিছু নয়। নারীর পিরিয়ড নিয়ে হাজার বছর ধরে নানা কুসংস্কার চালু আছে। এই তরল যদি ক্ষতিকর হয় তবে এই তরলে নয়টি মাস থেকে একটি মানবশিশু কিভাবে নিরাপদে থাকে? এ তরল যদি অপবিত্র হয় তবে পুরো মানবজন্মইতো অপবিত্র! একসময় মানুষ নিজের শরীর সম্পর্কে জানতো না বিধায় নানা কুসংস্কার, নানা মিথ চালু করেছিলো। একবিংশ শতকে এসে কিবোর্ডের এক ক্লিকে যখন আমাদের সামনে সবকিছু চলে আসছে তখন নিজের শরীরকে জানা জরুরী এবং এসকল কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা জরুরী।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন