বিজ্ঞাপন

পাপুলের সম্পদ অনুসন্ধানে ধীরগতি, তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ!

June 10, 2020 | 7:41 pm

শেখ জাহিদুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মানবপাচারসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে ধীর গতিতে। করোনাকালীন পরিস্থিতির কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশ্বস্ত এক সূত্র। করোনায় লকডাউন তথা সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার মাত্র তিনদিন আগে অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে পাপুলের নথি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সেই হিসেবে তার বিরুদ্ধে দুদকের চলা অনুসন্ধান প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আর এই কার্যক্রম শেষ হতে এখনও বেশ সময় লাগবে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

দুদকের নির্ভরশীল সূত্রে জানা যায়, পাপুলের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের তথ্য জানতে বিভিন্ন দফতরে এরই মধ্যে দুদক থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাপুল যে ব্যাংকের পরিচালক সেই এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। এনআরবি ব্যাংক ইতোমধ্যে পাপুলের কিছু তথ্যের কাগজপত্র দুদককে সরবরাহ করেছে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও পাপুলের বিষয়ে জানতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

করোনার কারণে ধীরগতিতে চলছে পাপুলের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ। কারণ হিসেবে দুদক বলছে, করোনার কারণে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সেজন্য তারা তথ্য পায়নি। তবে বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনুসন্ধান কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। খুব শিগগিরই তারা পাপুলের সম্পদের বিষয়ে তথ্য পাবেন বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে পাপুলের অনুসন্ধান কার্যক্রমের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনুসন্ধান চলছে। আর সেটা শেষ না হলে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলার নেই।’

এর আগে গত শনিবার (৬ জুন) সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলকে গ্রেফতার করেছে কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কুয়েতের মুশরেফ আবাসিক এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে পাপুলকে গ্রেফতারের বিষয়ে তার স্ত্রী একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা ইসলাম গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘কুয়েতের সরকারি দফতর ও সিআইডি তাকে আলোচনার জন্য ডেকে নিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

সেলিনা ইসলাম আরও বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে পাপুল কুয়েতে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি খ্যাতনামা মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও। এই কোম্পানির কুয়েতি অংশীদারও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে অন্য দেশের মতো কুয়েতেও তিন মাস ধরে লকডাউন চলছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক অভিবাসী কর্মী বেকার রয়েছে। তাদের কেউ কেউ সরকারি দফতরে অভিযোগ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে কুয়েতের সরকারি দফতর ও সিআইডি তাকে আলোচনা জন্য ডেকে নিয়েছে।’

পাপুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

মানবপাচারসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত উপায়ে শত শত কোটি টাকা অর্জন করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাপুলের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য একজন কর্মকর্তাও নিয়োগ দেন। দুদকে পাপুলের বিরুদ্ধে ১৭৪ পাতার অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এই পরিচালক বিদেশে ব্যবসার আড়ালে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। এর মধ্যে তিনি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৮০ কোটি টাকা হুন্ডি ও বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাচার করেছেন। এ টাকার মধ্যে তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি হিসাবের মাধ্যমে ১৩২ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা পাচার করেন। ইউসিবিএলের মাধ্যমে ১০ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকে ঋণ সৃষ্টি করে ১০ কোটি টাকা পাচার করেন। বাকি টাকা পাপুল তার শ্যালিকা জেসমিন প্রধান এবং জেডডব্লিউ লীলাবালি নামক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করেন। কয়েকজন ব্যাংক মালিক অর্থপাচারে পাপুলকে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, ৫০ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন পাপুল। আর স্ত্রীর নামে একই ব্যাংকের ৩০ কোটি টাকার শেয়ার কিনে অংশীদার হয়েছেন। গুলশান-১ এর ১৬ নম্বর সড়কে গাউসিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে মেয়ে ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, গুলশান-২’র পিংক সিটির পেছনে গাউসিয়া ইসলামিয়া প্রকল্পে স্ত্রীর নামে ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট, স্ত্রী ও নিজের নামে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৯১ কোটি টাকার সম্পদ আছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঢাকার ওয়েজ আর্নার্স শাখায় স্ত্রীর নামে ৫০ কোটি টাকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ও মেয়ের নামে ২০ কোটি টাকার বন্ড আছে। শ্যালিকার নামে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনে নিজে ব্যবহার করছেন। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে নিজ নামে ৪০ কোটি, মেয়ের নামে ১০ কোটি ও স্ত্রীর নামে ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে একটি ছয়তলা বাড়ি আছে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া শ্যালিকার নাম ব্যবহার করে দিগন্ত মিডিয়ার বেনামে পরিচালক ছিলেন পাপুল। ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর সঙ্গে তার বিপুল পরিমাণ ব্যবসা ছিল। মীর কাশেম আলীর ফাঁসি হওয়ার পর পাপুল তার বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ব্যাংক পরিচালক হয়েও বেআইনিভাবে ইউসিবিএল ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করে চার পরিচালক বোর্ড সভায় অনুমতি ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা ভোগ করেছেন। এই ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে পাপলু রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে পাথর সরবরাহের ব্যবসা করেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।

সারাবাংলা/এসজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন