বিজ্ঞাপন

নারীমুক্তি ও সমাজপ্রগতির ‘জননী সাহসিকা’

June 20, 2020 | 3:00 pm

ফারিয়া ইয়াসমিন

বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি কবি হলেও সবার কাছে আরোও একটি পরিচয় আছে- জননী সাহসিকতা। যুগে যুগে যারা নারী জাতির অগ্ৰগতির জন্য অবদান রেখেছেন তার মধ্যে সুফিয়া কামাল অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

মানবসমাজে নারী-পুরুষের প্রায় সংখ্যাসাম্য সত্ত্বেও নৃতাত্ত্বিক ও আর্থ-সামাজিক কারণে পুরুষশাসিত পরিবেশে নারী তার যোগ্য মর্যাদা ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার পায়নি। ঘরে-বাইরে নারী নানাভাবে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার। একদা এ অবস্থা ছিল বিশ্বজুড়ে। ব্যতিক্রমী চিন্তার ও কাল বিচারে অগ্রসর চেতনায় নারীকে পুড়িয়ে মারা ছিল ধর্মীয়-সামাজিক রেওয়াজ। যেমন ১৫ শতকে ফ্রান্সে জোয়ান অব আর্ক। এমন এক ভয়াবহ অবস্থা পেরিয়ে নারীকে অধিকার সচেতন করতে প্রথম কলম ধরেন মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট । যে পথ ধরে একই উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসেন মার্গারেট ফুলার, স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য নিয়ে। প্রায় একই সময়ে আবির্ভাব ইবসেনের প্রতিবাদী নায়িকা ‘নোরা’র । প্রসঙ্গত জর্জ এলিয়ট ও জর্জ সাঁদ এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের নারী স্বাধিকারের পক্ষে বক্তব্য স্মর্তব্য। আমাদের এই অঞ্চলেও নারীমুক্তি ও সমাজপ্রগতির অগ্রগণ্য ‘জননী সাহসিকা’ সুফিয়া কামাল।

আজ যদি পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো একজন বেগম রোকেয়া, একজন সুফিয়া কামালের কাজ কিন্তু সহজ ছিল না। নারীবিরোধী অচলায়তনের ভিত তখন খুবই শক্ত। কারণ, রক্ষণশীল ধর্মীয় সমাজ। ফরাসি বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও এর অভিঘাত নারী অধিকারের সুফল বয়ে আনেনি। এমনকি পারিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিনের কণ্ঠে নর-নারীর সমঅধিকারের দাবি কাজে আসেনি। এদিক থেকে বহুল প্রশংসিত ইউরোপীয় রেনেসাঁসও ব্যর্থ। প্রসঙ্গত স্মরণ করি বিশ শতকের ঘটনাবলী: ১৯০৮ সালে নারী শ্রমিকদের সংগ্রাম, ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন, ১৯১৮-এ নারী-পুরুষের বৈষম্য নিরসনে ভার্জিনিয়া উলফের আহ্বান, ১৯৪৫-এ ‘বিশ্বনারী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৯-এ সিমন দ্য ব্যুভোয়া’র নারী অধিকারের পক্ষে তির্যক সমালোচনা ও কয়েক দশকের লেখালেখি ও তৎপরতা এবং নাইরোবি, কায়রো, বেইজিং নারী সম্মেলনও (১৯৯৫) রক্ষণশীলতার অচলায়তন ভাঙতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

সমাজ ও রাজনীতি পূর্বোক্ত আলোড়িত পরিবেশে সুফিয়া কামালের কবি ও কর্মী-ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও প্রকাশ মূলত বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে। যে পরিবেশ তাঁকে গড়ে তোলে তাতে ছিল স্বাদেশিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবমৈত্রী ও শোষণমুক্ত সমাজকল্যাণের আদর্শ যা তার চেতনার পললভূমিতে গভীর ছাপ ফেলেছে। এ আদর্শিক ছাপ সুফিয়া কামাল আমৃত্যু লালন করেছেন। তার কর্মধারা তাই প্রমাণ করে। অবশ্য একথাও সত্য যে বরিশালের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিবেশে বরিশাল কন্যার স্বাদেশিকতার হাতেখড়ি। সেখানে সমাজসেবার বড় ভূমিকা, কলকাতার বিচিত্র পরিবেশে এ সবেরই বহুমাত্রিক বিকাশ। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সান্নিধ্য, তার নারীশিক্ষা ও সমাজসেবার কর্মকাণ্ড সুফিয়াকে অনুপ্রাণিত করে। হয়তো তাই আর এস. হোসেনের ধারাবাহিকতায় এস এন. হোসেনের আবির্ভাব, সময়ের ধারায় যা সুফিয়া কামালের নামে আদর্শ ও কর্মের নিশানা ঠিক করে নেয়। নারী শিক্ষাব্রতে রোকেয়ার আরেক অনুসারী শামসুন্নাহার ছিলেন সুফিয়ার পথচলার সঙ্গী। বেবী মওদুদ হয়তো ঠিকই বলেছেন, ‘এরা দু’জন রোকেয়ার মানসকন্যা’। কিন্তু সেই সঙ্গে একথাও সত্য যে সুফিয়া কামালের পরিণত কর্মের পথ ছিল আরো নানামাত্রায় প্রসারিত। নারী স্বাধিকারের মধ্যেও সেখানে দেশ, সমাজ ও রাজনীতির প্রাধান্য, প্রাথমিক উৎসকেন্দ্র কলকাতা। নানামাত্রিক কর্মের সূত্রেই কলকাতায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পাশাপাশি সমাজবাদী নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে সুফিয়া কামালের ঘনিষ্ঠতা- সে ভাবাদর্শের প্রভাব ছিল অপেক্ষাকৃত গভীর।

এই মহীয়সী নারী ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্ৰহন করেন। তার পিতা ছিলেন সৈয়দ আব্দুল বারী, মাতা সৈয়দা সাবেরা খাতুন। সুফিয়া বেগমের ৭ বছর বয়সেই তার বাবা গৃহত্যাগী হন। জীবনের শুরুটা কবি সুফিয়ার জন্য মোটেও আনন্দদায়ক ছিল না। নারীরা তখন সমাজে অনেকটা পশ্চাৎপদ ছিল। যেসময় সুফিয়ার জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হতো। কঠোর পর্দা প্রথা প্রচলন ছিল। মেয়েদের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ সুবিধা ছিল না। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামালের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হয় নি।

"আমাদের যুগে আমরা তখন খেলেছি পুতুল খেলা।
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড় কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কালের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি"
(আজিকার শিশু, কাব্যগ্ৰন্থের অংশবিশেষ)।

তখনকার দিনে রেওয়াজ ছিল খানদানি পরিবারের মেয়েরা বাড়ির বাইরে যাবে না, তাদের কাজ শুধু অন্দর মহলে। ছোট সুফিয়া এ নিয়ম মোটেও মেনে নিতে পারেনি। চার দেওয়ালের বদ্ধ ঘরের মধ্যে জীবন কাটানোর জন্য প্রস্তুত হতে চাননি তিনি। সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি তার মন। তার মাতৃকুল ছিল শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের, তাই পরিবারের ভাষা ছিল উর্দু। বাংলা ভাষার প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এমন অবস্থায় কবির প্রেরণা ছিলেন শুধুই তার মা। মামা বাড়িতে তার বড় মামার বড় গ্ৰন্থাগার ছিল, মায়ের উৎসাহে সেখান থেকে বই পড়ার সুযোগ ঘটেছিল তার।

গৃহবন্দী জীবনেই ধীরে ধীরে নিজেকে স্বশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে থাকেন কবি সুফিয়া। কবি সুফিয়া কামালের জীবনে দিক পরিবর্তনের সূচনা হয় আরেক মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে। বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণের মনোভাব, দর্শন, সাহিত্যানুরাগ ভীষণভাবে নাড়া দেয় শৈশবে সুফিয়াকে।

শৈশবের গণ্ডি পেরোতেই রক্ষণশীল পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে বিবাহ হয়। স্বামী নেহাল হোসেন সুফিয়ার জীবনে এক অপ্রত্যাশিত আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন। স্ত্রীর আগ্ৰহ দেখে তিনি তাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহ করেন। ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন তার প্রথম গল্প 'সৈনিক বধূ'। তিনি আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সংগঠনে যোগ দেন এবং নারী শিক্ষার জন্য কাজ করেন। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাহিত্য চর্চাও করতে থাকেন। তার প্রকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ২০টি।

১৯৩২ সালে স্বামী নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যু হয়। জীবনের মোড় পরিবর্তন হয়, তবুও তিনি থেমে থাকেননি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তার অবদান ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পরিবারসহ কলকাতায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িয়ে পড়েন। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ নির্বাচনে নারী সমাজকে সক্রিয় হওয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফিয়া কামাল। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার যখন নারী সম-অধিকার আন্দোলনের দাবি উপেক্ষা করতে থাকে তখনও নারী আন্দোলনের সোচ্চার মিছিলে সুফিয়া কামাল অতন্দ প্রহরীর মতো নেতৃত্ব দেন।
১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ গঠন করেন। এছাড়া তিনি মহিলা পুর্নবাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দূস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, নারী কল্যান সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে "রোকেয়া হল" নামকরণের দাবিও জানান তিনি।
স্বাধীন বাংলাদেশের নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্ৰামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্ৰাম করেছেন। প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।

সুফিয়া কামালের জীবনে ছিল অনেক চড়াই উৎরাই। তবুও তিনি থেমে থাকেননি, আন্দোলন করে গেছেন। বাংলাদেশের সমাজে নারীর বিরুদ্ধে রক্ষণশীলতা, যৌতুক, নির্যাতন, বহুবিবাহ, যথেচ্ছ তালাক, ধর্ষণ ইত্যাদি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য থেকে নারীসমাজের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন তিনি। তিনি ৫০টির বেশী পুরস্কার লাভ করেছেন।

১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর সুফিয়া কামাল মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান পান। সুফিয়া কামাল, নামটির সাথে মিশে আছে অসংখ্য আবেগ, অনুভূতি, ভালোলাগা ও ভালোবাসার সরলতা ও নারীর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করার মনোবল। তিনি শুধু কবি নন তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষক ও সংগ্ৰামী নেতৃত্ব।

১৯১১ সালের ২০ জুন আবদ্ধ এক সমাজের মধ্যে জন্মগ্ৰহণ করে তিনি নারী সমাজের জন্য সংগ্রাম করে নারীদের যে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন তা সকলের জন্য চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। কবিদের মৃত্যু নেই, তাইতো তিনি এখনো পাঠকদের মনে মিশে আছেন তার প্রতিটি চরণের মধ্যে। তার জন্মদিনে সকলে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব, এর সাথে সারাবাংলার সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কিত নয়। সারাবাংলা ডটনেট সকল মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার দায় সারাবাংলার নয়।

সারাবাংলা/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন