বিজ্ঞাপন

সবাইকে বলে দিন, আত্মহত্যা প্রবণতা একটি রোগ।। ১ম পর্ব

June 24, 2020 | 11:02 am

রাশেদ রাফি

রানী ক্লিওপেট্রা, নোবেল বিজয়ী লেখক আর্নেস্ট হ্যামিংওয়েসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছিলেন। নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আগেও আত্মহত্যা করেছিলেন হলিউড ও বলিউডের অনেক সেলিব্রিটি। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতের একই পরিবারে ঘরের সবাই মিলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি। অবাক করা আত্মহত্যার ঘটনায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। কিন্তু কেন? এর কি সমাধান নেই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জনস্বাস্থ্য ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখেছেন গবেষক রাশেদ রাফি। আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

বিজ্ঞাপন

আত্মহত্যার ইতিহাস অনেক প্রাচীণ। এ নিয়ে গবেষনাও চলছে বহুকাল ধরে। তখন থেকেই প্রশ্ন চলে আসছে যাদের তেমন কোন সমস্যা নেই, তারা কেন আত্মহত্যা করবে? এমন সব প্রশ্ন সাথে নিয়েই এখন পৃথিবীব্যাপী আত্মহত্যা চলছে আরও উদ্যমে। এমনকি পরিবারের সবাই মিলে! এই আধুনিক যুগে একটি দেশের একাধিক পরিবারের সবাই মিলে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে কেন? কী এমন কারণ আছে? খাদ্যাভাব? অর্থাভাব? ভুতের আছর? মানসিক যন্ত্রণা? নাকি অন্যকিছু? কী সেই কারণ, যার সমাধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রায় চূড়ায় উঠের আসা এই সময়ের নেই!

কিছুদিন আগে বলিউড নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা সংবাদমাধ্যমে এতটাই আলোচিত হয় যে এর রেশ এখনো কাটেনি। সাধারণ মানুষ, পুলিশ সবাই কারণ খুঁজছে। মানুষকে আনন্দ দেওয়া যার কাজ, এমনকি নিজের শেষ ছবিতে যিনি জীবনের পক্ষে ও আত্মহত্যার বিরুদ্ধে থাকা চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মামলাও হয়েছে। অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সালমান খান, করণ জোহর, সঞ্জয় লীলা বনশালীসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই ভারতেই দলবেঁধে যারা আত্মহত্যা করছে তাদের কথা কেন বলছেনা কেউ? সামাজিক উন্নয়ন গবেষণায় ঐ ঘটনাবলী কি তদপেক্ষা বেশী আলোচনার দাবী রাখেনা? কেন গত ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ঐ দেশটির ত্রিপুরা রাজ্যের পূর্ব চাঁনপুর জেলার সন্যাসীমূড়ায় দরিদ্র পরেশ তাঁতি তাঁর পরিবারের আরও তিনজনকে নিয়ে একসাথে আত্মহত্যা করলেন? অভাব এবং এনজিওর চড়াসুদের ঋনই কি আসল কারণ? আবার, এই লকডাউনে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী এত সাহায্য ঘোষনার পরও গত ২২ মে কেন ঐ রাজ্যের একই পরিবারের ছয় শ্রমিক আরও তিন শ্রমিককে নিয়ে মোট ৯ জন তেলেঙ্গানা থেকে নিজ রাজ্যে না ফিরে ওখানেরই এক কুয়ায় ঝাপ দিয়ে যন্ত্রনাদায়ক আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন? কারনটা কি শুধু বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ? এরপর এইতো সেদিন ১৯ জুন আহমেদাবাদের ভাটভা এলাকায় দুইভাই তাদের ৪ বাচ্চাসহ মোট ৬ জন ঝুলে আত্মহত্যা করল। অল্প টাকার ব্যাংক ঋন তো আসল কারণ হতে পারেনা! তবে কি সেই আসল কারণ? এর দুইবছর আগে, জুলাই ২০১৮’র ঘটনা তো সবারই জানা। দিল্লির বুরারির চন্ডাওয়াত পরিবারে যেদিন ১১ জন আত্মহত্যা করল। ঐ গণআত্মহত্যার আসল উৎস কি অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস নাকি অন্য কিছু?

বিজ্ঞাপন

এত গবেষনা-আলোচনার পরও কেন চলছেই এমনসব চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যা? সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যত আত্মহত্যা হয়েছে তাদের প্রকৃত কারণ আসলে কি? তা আমাদের অতিসত্বর জানা দরকার। এখন বলিউড নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যাকে রসদ ধরে এতসব মর্মান্তিক আত্মহত্যার খবর আমাকে যে তথ্য দিচ্ছে তা হলো- ‘আর দেরি না করে ঘরে ঘরে জানিয়ে দেওয়া দরকার যে- আত্মহত্যা প্রবণতা একটি রোগ। এই রোগটাকে যদি মানসিক রোগ বলি তবে অনেকে অন্য কিছু মনে করেন, গুরুত্ব দিতে চাননা। আর যিনি অসুস্থ তিনি তো রীতিমতো চটে যান! তাই সংক্ষেপে বলুন “এটি একটি রোগ”। আর সে রোগের চিকিৎসাও আছে। আত্মহত্যা প্রবণতা যে একটা রোগ তা প্রমান করার জন্য বছরের পর বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসা বিভাগের সাবেক শিক্ষক, সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব মেডিসিনের অধ্যাপক এমেরিটাস ডঃ ডেভিড শীহান। ডঃ ডেভিড শীহান এর ব্যাখ্যানুযায়ী আত্মহত্যা প্রবণতাকে নেহায়েৎ বিভিন্ন মানসিক রোগের উপসর্গ মনে করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কারণ, এতে করে আত্মহত্যার মতো একটি অতি বড় রোগকে গুরুত্বহীন করে দেখা হয়। আর তাই দেখা গেছে হাসপাতাল থেকে বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরেও কেউ কেউ হুট করে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে আত্মহত্যা করে বসছেন। এর কারণ হলো রোগীর আত্মহত্যা প্রবণতাকে স্বতন্ত্র রোগ ধরে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। ড. শীহানের ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করা যায় লিভার ক্যনসারের সাথে হেপাটাইটিস বি/সি এর যোগসাজশ দিয়ে। হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে যারা আক্রান্ত তারা লিভার ক্যানসারের জন্য ঝুঁকিপূর্ন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ ভাইরাসদ্বয়ের যেকোন একটি কারো শরীরে থাকলেই সে লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হবে। লিভার ক্যানসারসহ যেকোন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার মূল উপাদান হলো কারসিনোজেন বা ক্যানসার জীবানু। ঐ ভাইরাস দুটি ছাড়াও কারো লিভার যদি যেকোনভাবে কারসিনোজেন দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে সে লিভার ক্যনসারে আক্রান্ত হবে। অর্থাৎ লিভার ক্যানসার হলো একটি স্বতন্ত্র রোগ। ঠিক তেমনি- বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার প্রভৃতি মানসিক রোগ আত্মহত্যাপ্রবণ কারও জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এসব রোগ না থাকলেও কেউ আত্মহত্যা করতে পারে। কারণ, আত্মহত্যা একটি স্বতন্ত্র রোগ। তবে স্বতন্ত্র রোগ হোক বা অন্য রোগের উপসর্গ হিসেবেই হোক আত্মহত্যা প্রবণতা হলো হলো একটি প্রতিরোধসাধ্য ও চিকিৎসাসাধ্য রোগ।

বিভিন্ন পেশা, দেশ ও বয়সের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করে। পৃথিবীর বিখ্যাত লেকখকদের মধ্যে অনেকেই আত্মহত্যা করেছিলেন। ড. শীহানের মতকে সমর্থন দেওয়ার মতো প্রকৃষ্ট উদাহরন হলো যুক্তরাষ্ট্রের নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পুলিৎজারজয়ী কবি জন ব্যারিম্যান ও যুক্তরাষ্ট্রের আরেক নোবেলজয়ী লেখক এনি সেক্সটন। হেমিংওয়ে ও সেক্সটন এ দুজনকেই হাসপাতালে নিয়ে বিষন্নতার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেন। আবার হেমিংওয়ে ও জন ব্যারিম্যান এ দুজনের মধ্যে জিনগতভাবেই আত্মহত্যা প্রবণতা ছিল। হেমিংওয়ের বাবা, বোন এবং ভাই আত্মহত্যা করেছিলেন। আর জন ব্যারিম্যানের বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। এছাড়া জাপানী নোবেলজয়ী লেখক ইউসুনারী কাউবাতাও আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর কোন মানসিক রোগ ছিলনা অর্থাৎ তাঁর আত্মহত্যা প্রবণতা ছিল প্রচ্ছন্ন। ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এন্ড পাবলিক হেলথ এ গবেষক লুইস ব্রাডভিক উল্লেখ করেন যে, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এ যাবত যত আত্মহত্যা হয়েছে তার ৯০ শতাংশই হয়েছে মানসিক রোগের ফলে। বাকী ১০ শতাংশের সবাই যে রোগমুক্ত তাও না। অন্তত ড. ডেভিড শীহানের ব্যাখ্যানুযায়ী তাদের কারও কারও মধ্যে প্রচ্ছন্ন আত্মহত্যা প্রবণতা থাকতেই পারে।

জানি নায়ক সুশান্তের আত্মহত্যাকে রোগ বললে চটে উঠবেন তার ভক্তকুল। কেউ কেউ তো ফেসবুকে লিখেই দিয়েছেন, এটা তার নিজস্ব ব্যাপার, নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে যা তাকে বাধ্য করেছে এমনটা করতে। আমরাও তাই বলি, কারণতো থাকবেই। প্রতিটি রোগের পেছনে যেমন কারণ থাকে তেমনি আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্যও কোন কারণ বা উদ্দীপক লাগবে। এখন বাংলাদেশে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আত্মহত্যা বেশি হচ্ছে। ভিকারুন্নেসা স্কুলের ছাত্রী অরিত্রির আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর আমি ইত্তেফাকে লিখেছিলাম। নকল করে ধরা পড়ার অপমান, শিক্ষক কর্তৃক মা-বাবাকে অসম্মান করাসহ দশটি কারণ কি করে তিলে তিলে অরিত্রির আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছিল আমি তার বিশ্লেষণ করেছিলাম। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার কারন নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স’ এ প্রকাশিত একটা গবেষণা প্রতিবেদন স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দেখিয়েছে তা হল- উৎপীড়ক শব্দযোগে হেনস্থার স্বীকার (বুলিয়িং), গালি-গালাজ (স্কল্ডিং), প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সামনে আত্মসম্মানের হানি, যেমন- 'তুই মরলে বাঁচি', 'চলে যা', মা-বাবা/শিক্ষকগন কর্তৃক ছেলেমেয়েদেরকেকে এমন নেতিবাচক কথাবার্তা বলা ইত্যাদি। ক্লিয়ারেই এস ও তার সহযোগীগন (২০১৮) উল্লেখ করেন যে- এডভার্স চাইল্ডহুড এক্সপেরিএন্স (এইস) বা শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা আত্মহত্যা প্রবণতা ও অন্যান্য মানসিক রোগের কারণ হতে পারে।

২৪ আগস্ট, ২০১৮ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের একটা প্রতিবেদনে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের জন্য আত্মহত্যাকে মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। তাহলে প্রতীক, সৌরভ ও অরিত্রিদের আত্মহত্যার পিছনে বয়স একটা বড় কারণ ছিল। আত্মহত্যার আরও কারণের মধ্যে আছে ব্যক্তিত্বের ধরণ, দূর্বল ই-কিউ (ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কুউশ্যন্ট) ইত্যাদি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাওয়ার্ড গার্নার ই-কিউ এর ব্যখ্যায় বলেন, সহযোগি মনোভাব নিয়ে অন্যদের কথা ও আচরণের অর্থ বুঝে সফলতা আদায় করে নেওয়ার কৌশলটাই হলো ই-কিউ। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্র ও ২০১৯ সালে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র প্রতীকের আত্মহত্যার পিছনে তাদের ই-কিউ এর অভাব কাজ করেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

লেখক- জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক
Email-sea.sky.rafi@gmail.com

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন