বিজ্ঞাপন

সবাইকে বলে দিন, আত্মহত্যা প্রবণতা একটি রোগ।। ২য় পর্ব

June 29, 2020 | 3:08 pm

রাশেদ রাফি

রানী ক্লিওপেট্রা, নোবেল বিজয়ী লেখক আর্নেস্ট হ্যামিংওয়েসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছিলেন। নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের আগেও আত্মহত্যা করেছিলেন হলিউড ও বলিউডের অনেক সেলিব্রিটি। ২০১৮ সাল থেকে ভারতে একই পরিবারে সবাই মিলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে কয়েকটা। অবাক করা আত্মহত্যার ঘটনায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। কিন্তু কেন? এর কি সমাধান নেই? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জনস্বাস্থ্য ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষন থেকে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখেছেন গবেষক রাশেদ রাফি। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।

বিজ্ঞাপন

সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দেওয়ার পেছনে থাকে ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, অনিয়ন্ত্রিত অহম, আত্মসম্মানের অভাব, সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে উদ্ভুত মানসিক চাপ ইত্যাদি। বলিউড তারকা সুশান্ত বিষন্নতা রোগে ভুগছিলেন যা বিভিন্ন পত্রিকায় এসেছে। তিনি বিষন্নতার জন্য চিকিৎসা হয়তো করিয়েছিলেন কিন্তু আত্মহত্যা নিরোধের কোন স্বতন্ত্র চিকিৎসা করাননি। এর আগেও অনেক বলিউড তারকা আত্মহত্যা করেছিলেন যারা আত্মহত্যা প্রবণতার চিকিৎসা করাননি। এদের মধ্যে বলিউডের হার্টথ্রব শ্রীদেবী (নিশ্চিত না), দিব্যা ভারতী, পারভীন ববি, সিল্ক স্মিতা, জিয়া খান, অর্চনা পান্ডে, কুলজিৎ রনধাওয়া, কুলি ছবির পরিচালক মনমোহন দেশাই প্রভৃতি তারকার নাম অনেকেই জানেন।

ষাটের দশকের হলিউড সম্রাজ্ঞী মেরিলিন মনরোর আত্মহত্যা প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছিল সম্পর্কের আকর্ষন-আকর্ষন দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত মানসিক চাপ। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সাথে তার নতুন সম্পর্কের কথা কানাঘুষা হওয়ার পূর্বেও তার দুবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। ত্রিশের দশকে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রস আলেকজান্ডার ১৯৩৭ সালে সমকামিতার অভিযোগের বদনাম, ক্যারিয়ারে ধ্বস প্রভৃরতি চাপে উদ্দীপিত হয়ে আত্মহত্যা করেন। হলিউডের আরেক তারকা চারবারের অস্কার নমিনি চার্লস বয়ার ১৯৭৮ সালে ৭৮ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তার মতো রবিন উইলিয়ামসও পরিণত বয়সে পৌঁছে ৬৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কুস্তিগীর ক্রিস বেনোয়েট তার স্ত্রী ও সাত বছরের বাচ্চাকে মেরে একযোগে আত্মহত্য করেন। আমেরিকান মডেল তারকা স্টিফেনি এডামস (অনুর্ধ্ব-৩০ কোটিপতি) ২০১৮ সালে তার সাত বছরের শিশুপুত্রকে সাথে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। এভাবে বিশ্বখ্যাত আরো অনেক সংগীত শিল্পী, অভিনয় শিল্পী বিভিন্ন কারণের উস্কানিতে আত্মহত্যা করেন। যথার্থ চিকিৎসা পাননি বলে আত্মহত্যা করাকে তারা যৌক্তিক মনে করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এবার আসি রাজনৈতিক আত্মহত্যার কথায়। প্রাগৈতিহাসিক কালের রাণী ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে অনেক রাষ্ট্রনায়ক আত্মহত্যা করেছিলেন অনিয়ন্ত্রিত অহম, অপরাধবোধ, আত্মসম্মানরক্ষা ইত্যাদি কারণে। এ যাবৎ আধুনিক বিশ্বের সাতজন রাষ্ট্রনায়ক আত্মহত্যা করেন। ১৮৯১ সালে চিলির ১১তম প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৭৩ সালে ২৮তম প্রেসিডেন্ট আত্মহত্যা করেন অনিয়ন্ত্রিত অহমের চাপে ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট জর্মান বুশ্চ ছিলেন অহমের দাস। এই অহমই তার মধ্যে আত্মহত্যার বীজ বপন করেছিল। জার্মানীর প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলারের আত্মহত্যার পেছনেও ছিল অহম ও ব্যর্থতার চাপ। সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদগন বেশী পরিচিত হওয়াতে তাদের সুনামের কমতি বা অপমান দ্রুত চাউর হয়ে যায় যা অনেকেই সহ্য করতে পারেননা। তবে সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যার পেছনে ই-কিউ এর অভাবও দায়ী থাকে। এই লকডাউনের সময়ে সুশান্ত সিং এর আত্মহত্যার পেছনে যদি তার সাতটি ছবির কাজ চলে যাওয়াটা দায়ী হয়ে থাকে তবে তা তার ই-কিউ এর অভাব বলেই ধরা হবে। এতসব কারণ মাথায় নিয়েও আত্মহত্যা করেন না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী, সেলিব্রিটি, রাজনীতিবিদ বা সাধারণ মানুষ। এর কারণ হলো তাদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা নামক রোগটির বীজ উপ্ত না হওয়া।

তাহলে জানা দরকার- আত্মহত্যার বীজ কিভাবে মস্তিষ্কে উপ্ত হয়? উল্লিখিত কারণগুলোর চাপে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি যখন নিজের অস্তিস্তকে অযথার্থ ভাবতে শুরু করে এবং অসহায় বোধ করতে থাকে, তখন নিজেকে রক্ষার উপায় হিসেবে মাথায় আসে আত্মহত্যার বীজ। আত্মহত্যা কখনো কখনো ভাইরাস বা ছোঁয়াচে রোগের মতো কাজ করে। ১৭৭৮ সালে জার্মাণ উপন্যাসিক গ্যাটের “সরৌজ অফ ইয়াং ওয়েরথার” প্রকাশ পায়। উপন্যাসের নায়ক তরুন ওয়েরথার আত্মহত্যা করেছিল বলে তাকে অনুস্মরণ করে পাঠকদের মধ্যে আত্মহত্যা বেড়ে যায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘রেল লাইনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা’র খবর পত্রিকায় ছাপানোর পর ঐ খবরের অনুকরনে আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বহুবার। এরপর, গত কয়েকবছর ধরে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘ব্লু হোয়েল অনলাইন সুইসাইড গেম’ এর কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। এমন ঘটনাগুলো আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষদেরকে উৎসাহিত করে যা ভাইরাস বা ছোঁয়াচে রোগের মতো কাজ করে। নায়ক সুশান্ত সিং এর প্রাক্তন ম্যানেজার দিশার আত্মহত্যা তাকে আত্মহত্যার প্রতি উৎসাহ যোগানোর কাজ করে থাকতে পারে। তবে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো যাদের মধ্যে জীনগতভাবেই আত্মহত্যার বীজ থাকে তারা ঠুনকো কারনেও আত্মহত্যা করতে পারে। যেমন, বাংলাদেশের ঝিনাইদহ ও ভারতের মহারাষ্ট্রের বিদর্ভে অহেতুক কারণেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ‘আত্মবিনাশী আচরণ’। ১৯৬৯ সালে ‘বৃটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে মনোগবেষক ক্রেইটমেন ও তাঁর সহযোগীগণ ‘প্যারাসুইসাইড’ নামক ধারনাটি পরিচিত করান যার মানে হলো ‘আত্মবিনাশী আচরণ’ যা আত্মহত্যার পূর্ববর্তী আচরণের উপর গুরুত্ব প্রদায়ক। ২০১৯ সালে কলেজ ছাত্র সৌরভ আত্মহত্যার পূর্বে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল- ‘সেই পুষ্পে এখনো সৌরভ ছড়ায়নি, হয়তো আর ছড়াবেওনা; ‘বিদায়’’ এইসব লিখে। আর তার বন্ধুরা জানিয়েছে যে আত্মহত্যার পূর্বের কয়েকদিন ধরেই সৌরভকে চুপচাপ থাকতে দেখা গেছে। এর সবই ছিল ক্রেইটমেন এর দেওয়া আত্মহত্যাজনিত আচরণের আওতাভূক্ত।

এবার আসি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কথায়। সুশান্ত সিং এর মতো সেলিব্রিটিদেরকে আত্মহত্যা করা থেকে রক্ষা করতে পারে তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগন। তাদের মধ্যে প্যারাসুইসাইড বা আত্মহত্যাজনিত কথাবার্তা/আচরণ দেখলেই উচিত হলো তাদেরকে আন্তরিকভাবে সময় দেওয়া এবং চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নেওয়া। অরিত্রি-সৌরভ-প্রতীকের মতো শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার জন্য মা-বাবা এবং শিক্ষক উভয় পক্ষেরই উচিত ছেলেমেয়েদের বয়স, ব্যাক্তিত্যের ধরন ও আচরণ বুঝে তাদের সাথে মেপে মেপে কথাবার্তা বলা। পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার ঠিক একমাস আগেই তাদের মধ্যে ‘পাশ এবং ফেল’ এ উভয় ফলাফলের প্রতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর মানসিকতা তৈরী করতে হবে। অন্যদের সাথে তুলনা দিয়ে অপমানজনক কথা বলা বন্ধ করে ইতিবাচকভাবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী করে তুলতে হবে। সেইসাথে তাদের ই-কিউ বিষয়ক যোগ্যতা বাড়িয়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বয়সে যারা বড় তাদের ই-কিউ বৃদ্ধির ব্যাপারে বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের লোকজন উদ্যোগী হয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হবেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদেরকে আত্মহত্যাপ্রবণ হওয়া থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে আছে এনএইচএস, নাইস, এনএসপিসিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রে আছে এইচএইচএস, সিডিসি ও এএসিএপির মতো সংস্থাসমূহ। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও রয়েছে গাইডলাইন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বে ৮ লাখ লোক আত্মহত্যা করে। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে আত্মহত্যা একটি অন্যতম কারণ হওয়ায় গতবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- “আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন”। তাছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১0 সেপ্টেম্বরকে বিশেষভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে এবং কমিউনিটির লোকদেরকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে জড়িত হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এখন আমাদের উচিত আশু পদক্ষেপ হিসেবে দেশের সব স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা শ্রেণি/বিভাগে কাউন্সেলিং সাইকোলোজিস্ট নিয়োগ দেওয়া যারা শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষক ও অভিভাবকদের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক স্থাপনে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের কোন মানসিক সমস্যা থাকবে বা আত্মহত্যা প্রবণতা ধরা পড়বে তাদেরকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে গেলে তারা হীনমন্যতায় ভুগতে পারে। এসব বিষয় খেয়াল রেখে একজন দক্ষ মনোচিকিৎসক শিক্ষার্থীদেরকে রাগ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রন, বিষন্নতা, হীনমন্যতা, অপমানবোধ, ওসিডি’র বিভিন্ন লক্ষণ যেমন- এক কাজ বারবার করা, অযথার্থ অপরাধবোধ, প্রভৃতি সমস্যা সমাধানে যথার্থ প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিবেন। একইভাবে, পরিবার ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার প্রভৃতি মানসিক রোগ ও রোগীদের প্রতি বন্ধুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং এসব রোগ প্রতিরোধে মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে। কারো মধ্যে কোন আত্মবিনাশী কথাবার্তা বা আচরণ দেখলেই বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের উচিত হবে তার মতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তার খেয়াল রাখা এবং প্রয়োজনে ডাক্তার দেখানো। আত্মহত্যার পূর্বে ভূক্তভুগী ব্যাক্তি ভুলের ধোঁয়াশায় পড়ে মনে করতে থাকেন যে- পৃথিবীতে বেচে থাকার জন্য একে একে সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য, এ পর্যন্ত আসার পিছনে কোন সামাজিক কারণও থাকতে পারে, যেমন- পরীক্ষার ফল, ঋন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিকভাবে হয়রানি, অসম্মান ইত্যাদি। এসব সামাজিক কারণ আত্মহত্যা প্রবণ ব্যাক্তিকে উদ্দীপিত করে থাকলে তা সমাধানে রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত উদ্যোগ নিয়ে তাকে বেঁচে থাকার হাজারো আলোকিত রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া। সেইসাথে সরকারের উচিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা।

রোগতত্ত্বের বিচারে আত্মহত্যা একটি স্বতন্ত্র রোগ। কারণ ১৫-১৬ শতাংশ রোগি জীনগতভাবেই আক্রান্ত হয়। তাছাড়া, আত্মহত্যার রোগিদের মস্তিষ্কের গঠন আলাদা এবং স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলোর মধ্যেও রয়েছে তারতম্য। এই লেখার প্রথম পর্বেও এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, বিশেষজ্ঞদের উচিত ড. ডেভিড শিহানের গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে আত্মহত্যা প্রবণতাকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীর জন্য ব্রিফ ইন্টারভেনশন এন্ড কন্ট্যাক্ট (বিআইসি) নামক স্বতন্ত্র চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছে যা ইতোমধ্যে কার্যকর বলে প্রমানিত হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, পাবনা মানসিক হাসপাতালসহ দেশের সব হাসপাতালে আত্মহত্যা প্রবণতাকে স্বতন্ত্র মানসিক রোগ হিসেবে ধরে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করতে হবে। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যাক্তিদের সহায়তা করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৯৯৯ এর মতো গোপন হেল্প লাইন থাকা দরকার যেখানে তারা তাদের মনের কথা খুলে বলতে পারবেন।

নামটা মনে নেই, কোন এক বৃটিশ কবি আত্মহত্যার আগে লিখে গিয়েছিলেন –“আমার মতো এমন নরম মনের মানুষের জন্য এ কঠিন পৃথিবী নয়”। তাঁর ধারণা ভুল। পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন অসংখ্য ফুল ফোটে, অগণিত পাখি গান গায়, সমুদ্র-নদীরা সৌন্দর্যের বান তোলে, নীলাকাশে সূর্য হাসে, রাতে চাঁদ-তারারা আলো দেয় আপন মনে। এইসব সৌন্দর্য সাধারণত স্বার্থপর, চালিয়াত বা ঠকবাজ মানুষদের জন্য নয়; ঐ কবির মতো নরম মনের মানুষদের জন্য।

কি করেন? এমন প্রশ্নবাণে বার বার দগ্ধ হয়ে জনৈক বেকার যুবক আত্মহত্যা করেছিল। কি বোকা তাইনা! জবাব দেওয়ার মতো কত কি-ই-না আছে! বলে দেবে খাই-দাই-ঘুমাই, বই পড়ি, আকাশ দেখি, মানুষ দেখি, সমাজ দেখি আর বড় বড় চাকরির স্বপ্ন দেখি।

১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ ওভারকোটের পকেটভর্তি নুড়ি পাথর নিয়ে খরস্রোতা ওউজ নদীর গভীরের দিকে হাটতে হাটতে তলিয়ে যান বিখ্যাত বৃটিশ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ। শুনতে খুব রোমান্টিক মনে হলেও তাঁর আত্মহত্যার উস্কানিতে মিশে ছিল বিষন্নতা ও ওসিডি’র যন্ত্রনাময় বিষ। পৃথিবীতে কত কিছুইনা রয়ে গেছে! হাজারো জিনিসের মধ্যে শুধু একটা জিনিস পাইনি বলেই কি বিষন্ন হয়ে মরে যেতে হবে? আরো নয় হাজার নয়শো নিরানব্বইটা জিনিস না দেখেই!

১৯৪৭ সালের পহেলা মে আমেরিকান তরুণী এভিলিন ম্যাকহেল নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের ৮৬ তলা থেকে জাতিসংঘের একটা লিমুজিন গাড়ির ওপর পড়ে আত্মহত্যা করেন। অনেকে বলেন এভিলিন ওভাবে আত্মহত্যা করেছিলেন হিরোইজম দেখানোর জন্য। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে এভিলিনসহ এসময়ের ‘ব্লু-হোয়েল সুইসাইড গেম’ এর সকল আত্মহত্যাকারী যারা হিরোইজম দেখানোর জন্য আত্মহত্যা করেছিল তারা মারাত্মক ভুল করেছে। হিরোইজম দেখানোর জন্য পৃথিবীতে পড়ে আছে ছোট-বড় অনেক কাজ। পৃথিবীকে আরও সহজ, সুখী ও শান্তিময় করে গড়ে তোলার জন্য পৃথিবী প্রতিদিন কোটি কোটি লোক নিয়োগ দিতে চায়। আত্মহত্যা করার আগে আমাদের উচিত উপলদ্ধির চোখ দিয়ে পৃথিবীর ঐ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে দেখা।

লেখক- জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক

Email-sea.sky.rafi@gmail.com

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন