বিজ্ঞাপন

৩৭ জেলার সার্কিট হাউজ ভবন সম্প্রসারণের কাজে সময় বাড়ছে একবছর

June 30, 2020 | 8:19 am

জোসনা জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সার্কিট হাউজগুলোর কর্মপরিধি বেড়েছে। সে কারণেই দেশের ৩৭টি জেলার সার্কিট হাউজের সম্প্রসারণে দুই বছর আগে প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। দুই বছর মেয়াদে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হলেও প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়নি নির্ধারিত সময়ে। ফলে আরও অন্তত একবছর সময় বাড়ছে এই প্রকল্পের। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বেশকিছু ‍দুর্বলতা উঠে এসেছে। বলা হচ্ছে, পুরনো কাঠামোর ওপর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করায় সার্কিট হাউজ ভবনগুলো ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) দ্বিতীয় খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্কিট হাউজ ভবনগুলোর নকশা ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো। নির্মাণের সময় ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি করা হয়নি। এর মধ্যেই সার্কিট হাউজগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনের সূত্র ধরে পুরনো ভবনগুলোই ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে এই অবকাঠামোগুলোর জন্য ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

‘বাংলাদেশের ৩৭টি জেলায় সার্কিট হাউজের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের সময় এসব ভবনের আলমারি ও ঝাড়বাতিসহ অন্যান্য আসবাবপত্র যেন না পড়ে যায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সেগুলোকে শক্তভাবে দেয়ালের সঙ্গে আটকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া সংকটময় মুহূর্ত মোকাবিলার জন্য স্টাফদের নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়ার ব্যবস্থা করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সারঞ্জম সরবরাহ করতে হবে। প্রতিবেদনের খসড়াটি চলে এসেছে সারাবাংলার হাতে।

বিজ্ঞাপন

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, দেশের সার্কিট হাউজগুলো সম্পর্কিত প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪০ দশমিক ১৬ শতাংশ। প্রকল্পটির আরও কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। সবশেষ করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই প্রকল্পটির দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করেছে আইএমইডি।

ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও গণপূর্ত অধিদফতরের তত্ত্বাধায়ক প্রকৌশলী মাহবুব হাসান সারাবাংলাকে বলেন, যেসব ভবনের ভারবহন সক্ষমতা আছে, সেগুলোকে প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। আমাদের বিশেজ্ঞরা যাচাই-বাছাই করে করেছেন। কোভিড-১৯-এর কারণে জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই জুন মাসে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই একবছর অর্থাৎ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ছে।

প্রকল্পভুক্ত জেলাগুলো হচ্ছে— ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, শেরপুর, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ।

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ সার্কিট  হাউজেই পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সরকারি সফরে বিভিন্ন বেসরকারি হোটেলে নিরাপত্তাহীনভাবে রাত্রিযাপন করতে হয়েছে। এই স্থান সংকুলান করতে গিয়েই সার্কিট হাউজগুলোর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সার্কিট হাউজ ভবনগুলোর বেশিরভাগই তিন তলা ভিতের হওয়ায় প্রতিটি ভবনকেই কমপক্ষে এক তলা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এ অবস্থায় সার্কিট হাউজগুলোর মধ্য থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত ৩৭টি ভবনকে উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের জন্য নির্বাচন করা হয়।

২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য হাতে নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ১৭০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদফতর। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে সুপারস্ট্রাকচার নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ বিদ্যুতায়ন ও পানি সরবরাহ, আসবাবপত্র ও আরবরিকালচারের কাজ।

আইএমইডি’র সচিব আবুল মনসুর মো. ফায়জুল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, চলতি মাসেই খসড়া প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যেন ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করতে পারে। এছাড়া পরবর্তী সময়ে নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ কাজে লাগানো যেতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইএমইডির নিজস্ব জনবল দিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলেও অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, যেন নিরপেক্ষভাবে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে।

সার্বিক অগ্রগতি
আইএমইডির  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চ মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৯ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৪০ দশমিক ১৬ শতাংশ। শরীয়তপুর, পিরোজপুর ও হবিগঞ্জে সার্কিট হাউজের ভিত্তি ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের উপযুক্ত না হওয়ায় সেখানে কাজ করা যাচ্ছে না। একটি জেলায় কাজের অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ, শতকরা ৬০ থেকে ৬৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে ১৪টি জেলায়, ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে ১০টি জেলায় এবং ৯টি জেলায় কাজ হয়েছে শতকরা ৮০ ভাগ।

পরিদর্শনের সময় প্রকিউরমেন্টের তথ্য পর্যালোচনা  করে দেখা গেছে, সব সার্কিট হাউজের ক্ষেত্রেই দরপত্র আহ্বান করতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি লেগেছে। ১১টির ক্ষেত্রে মাত্র দু’টিতে নির্ধারিত সময়ে চুক্তি করা সম্ভব হয়েছে। তিনটির ক্ষেত্রে চুক্তির সময়সীমা ডিপিপির সময়সীমার মধ্যেই ছিল। বাস্তবে প্রতিটির ক্ষেত্রেই কাজ শেষ করতে সময় বেশি লেগেছে। গত মার্চ মাস পর্যন্ত কোনো সার্কিট হাউজের কাজই শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে ভিআইপি মেহমানদের অবস্থান ও অতিবৃষ্টির কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হয়েছে।

সরেজমিন পর্যক্ষেণ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরাজগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে আগের কাঠামো দুর্বল থাকায় বেশ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। কয়েকটি স্থানে চিলেকোঠার পাশে স্টোর রুম করা হয়নি। ছাদেও প্যারাপেটের উচ্চতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ওভারহেড ট্যাংকের উচ্চতাও কম। জলছাদেও গ্রাউন্ডিংয়ের ফিনিশিং কাজে ত্রুটি আছে। পয়ঃনিস্কাশনের এক্সিট পাইপের উচ্চতা কম। এছাড়া নতুন লাগানো বিদেশি স্যানিটারি ফিটিংস কাজে দক্ষ মিস্ত্রির দুষ্প্রাপ্যতা আছে। ফলে ভবিষ্যতে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা হতে পারে।

প্রকল্পের দুর্বল দিক
আইএমইডি বলছে, পিএসবি ও পিআইসি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত  না হওয়া প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিক। এছাড়া, প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন যথাযথ ছক অনুসরণ করে তৈরি না করা; প্রকল্প তৈরির সময় ভবনের টাইপ ও ফাউন্ডেশন সঠিকভাবে যাচাই না করা; নির্মাণ কাজে চুক্তি অতিরিক্ত সময় লাগা; আগের পুরাতন কাঠামোর ওপর নতুন কাঠামো নির্মাণ করায় নতুন কাঠামোর সম্পূর্ণ উপযোগিতা না পাওয়া; ভিভিআইপি ও ভিআইপি অতিথিদের গাড়িচালক ও দেহরক্ষীদের জন্য আলাদা সংস্থান না রাখা এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থায় ক্রুটি।

সবল দিক
সার্কিট হাউজের সম্প্রসারণ প্রকল্পে নতুন ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন না হওয়াকে প্রকল্পের সবল বা ভালো দিক বলে অভিহিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন না হওয়া; স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি কাজের নিয়মিত তদারকি; প্রকল্পের ব্যয় না বাড়া; এবং ই-জিপি পদ্ধতিতে ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

প্রকল্পের ঝুঁকি
প্রতিবেদনে প্রকল্পের পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ না হতে পারে। এছাড়া আগের কাঠামোর ডিজাইন ভূমিকম্প সহনীয় না হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে এবং জরুরি বহির্গমন পথ না থাকায় সংকট মুহূর্তে জানমালের ক্ষতি হতে পারে। নবনির্মিত নামাজঘর ও ব্যায়ামাগার অব্যবহৃত থাকতে পারে। এছাড়া স্থাপন করা বিদেশি যন্ত্রপাতি ও স্যানিটারি ফিটিংসগুলো স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ মিস্ত্রির অভাবে নিয়মিত মেরামতের অভাবে বিকল হয়ে থাকতে পারে।

সারাবাংলা/জেজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন