বিজ্ঞাপন

করোনা মোকাবিলায় সমন্বয়হীনতা: পথ দেখাচ্ছে মাঠ পর্যায়ের উদ্যোগ

July 5, 2020 | 9:13 pm

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দ ‘সমন্বয়হীনতা’। সমন্বয়হীনতার বিষয়টি এতটাই প্রকট যে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও সমন্বয় বাড়াতে তাগিদ দিতে হয়েছে। এই সমন্বয়হীনতার সমস্যা সমাধানে নানা ধরনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে গ্রুপ ফর ইনোভেটিভ পাবলিক সার্ভিস ডেলিভেরি অ্যানালাইসিস (গিপসেডা) মনে করছে, মাঠ পর্যায়ে এমন বেশকিছু উদ্যোগ দেখা গেছে, যেগুলো করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্র থেকে প্রান্ত— সবার জন্য হতে পারে অনুসরণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই ‘ওয়ার্কিং গ্রুপে’র এ সংক্রান্ত এক গবেষণার সূত্র ধরে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সারাবাংলার অ্যাক্টিং নিউজ এডিটর তরিকুর রহমান সজীব

বিজ্ঞাপন

প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলেও নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনো ‘পিক’ পায়ইনি। চার মাসেও কেন নিয়ন্ত্রণ করা গেল না করোনা সংক্রমণকে? এ আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো ‘সমন্বয়হীনতা’। করোনা মোকাবিলার সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও বিভাগ, বিশেষত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিবিড়ভাবে কাজ করার কথা, ঠিক তখনই যেন এই সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। অথচ করোনাভাইরাসের মতো বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে কেবল সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমন্বিত উদ্যোগে কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে কোভিড সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। এপ্রিলের শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলেন, কোভিড মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কমিটির তিনি সভাপতি হলেও কমিটির সিদ্ধান্তের কথা তিনিই জানেন না!

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- জোনিং, লকডাউন, ম্যাপিং নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা

সবশেষ জোনভিত্তিক এলাকা ভাগ করা, রেড জোনের ম্যাপিং এবং রেড জোন এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা যায় সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত রূপ। একদিকে কোভিড মোকাবিলা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কারিগরি কমিটির বৈঠকের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে ‘রেড জোন’ চিহ্নিত এলাকার নাম প্রকাশিত হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এ ধরনের কোনো তালিকার কথা জানেই না।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে লকডাউন বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্থানীয় সরকার যখন বলছে তারা কিছুই জানে না, তখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় লকডাউন বাস্তবায়ন! জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।

কোভিড মোকাবিলায় বেসরকারি সংস্থা বা সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্তি দূরের কথা, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই এমন সমন্বয়হীনতার বিষয়টি প্রকট। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কোভিড মোকাবিলায় সমন্বয়হীনতার সমাধান কিভাবে আসতে পারে, তা নিয়ে কাজ শুরু করে গ্রুপ ফর ইনোভেটিভ পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি অ্যানালাইসিস (গিপসেডা)। এটি মূলত একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাবি ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান। তার সঙ্গে বিভাগের এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থী এই গবেষণায় যুক্ত আছেন।

আরও পড়ুন- করোনার সংক্রমণ শনাক্ত-চিকিৎসা নিয়ে বিশৃঙ্খল চট্টগ্রাম

ড. শাহান সারাবাংলাকে বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর কিভাবে কাজ করে থাকে, সেগুলো নিয়েই মূলত আমরা কাজ করে থাকি। এ ক্ষেত্রে সরকারি সেবায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবন কিভাবে জনসেবায় পরিণত হয়, সেগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পরও আমরা সরকারি সেবায় এমন কিছু উদ্ভাবন দেখেছি, যেগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পাওয়া গেছে। আমাদের মনে হয়েছে, এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমন্বয়হীনতার সমাধান পাওয়া সম্ভব।

গিপসেডা বলছে, সমন্বয়হীনতার সমস্যা বিশ্বের প্রায় সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। বিশেষ করে বহুমাত্রিক সমস্য মোকাবিলায় এটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। এর মধ্যে অনেক দেশই প্রয়োজনীয় চর্চার মাধ্যমে এই সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে উঠেছে। বহুমাত্রিক সমস্যাগুলোর ক্ষেতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন অন্যদের কর্মপরিধি ও সক্ষমতায় বিবেচনায় না নিয়ে কেবল নিজেদের মতো করে কাজ করে চলে, তখনই সমন্বয়নহীনতা প্রকট হয়ে ওঠে।

পথ দেখাচ্ছে মাঠ পর্যায়ের উদ্যোগ

গিপসেডা’র গবেষণা বলছে, মাঠ পর্যায়ে গৃহীত ও বাস্তবায়িত বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ চিহ্নিত করা গেছে, যেখানে স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। এসব এলাকায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতিও অন্য এলাকাগুলোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো।

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের ‘ডাক্তারের সুরক্ষা কার্ট’ উদ্যোগটির কথা তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সুরক্ষা কার্ট বা চেম্বারটি চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেন তারা নিজেদের সুরক্ষার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে রোগীদের সেবা দিতে পারেন। এই উদ্যোগটি কালিহাতী ইউএনও অফিস ও সরকারের একজন সিনিয়র সহকারী সচিব এই উদ্যোগটিতে নেতৃত্ব দিলেও এটি কার্যকর করা হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক ও নির্বাচিত কর্মকর্তাদের। এই উদ্যোগে একটি সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং সবাই ‘অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানো’র সাধারণ লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছিলেন। চমৎকার এই উদ্যোগে মানুষ উপকৃত হওয়ায় পরে এটি চাঁদপুর, নড়াইল এবং অন্যান্য এলাকাতেও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন- রেড জোন ‘চিহ্নিত’, বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ও নওগাঁর পোরশা উপজেলার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, এই দুই উপজেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও এনজিও’র সঙ্গে ইউএনও অফিস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। মির্জাগঞ্জে দেখা যায়, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকারি কর্মকর্তাদের উপকারভোগী শনাক্তকরণে সহায়তা করেছেন এবং পোরশায় প্রশাসন স্থানীয়দের প্রয়োজন অনুধাবন করতে ও তাদের সাহায্য করার উপায় খুঁজতে এনজিওদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন কার্যকর করতে চাইলে মাঠ প্রশাসনের এই অভিজ্ঞতা সাধারণ নাগরিকদের সাহায্য করতে যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছে গিপসেডা।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’ অব্যাহত রাখতে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইডিসিআর) ব্যর্থ হলেও নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’য়ের উদ্যোগের সাফল্যের কথাও উঠে এসেছে গবেষণায়। অর্থাৎ কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, জেলা বা উপজেলা প্রশাসনকে দায়িত্ব দিলে ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’ আরও বেশি কার্যকর হতে পারে।

ড. আসিফ শাহান সারাবাংলাকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের ২২টি উদ্যোগকে শনাক্ত করেছি। এর মধ্যে ১৩টি উদ্যোগ নিশ্চিতভাবে উদ্ভাবনী উদ্যোগ, যেগুলোতে সমন্বয়ের চমৎকার প্রয়োগ দেখা গেছে। বাকি ৯টি উদ্যোগ নিয়ে আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদের গবেষণা চলমান। আরও নানা উদ্যোগের তথ্য আমরা পর্যালোচনা করব। উদ্যোগগুলো কেন ও কিভাবে সফল হলো, তার তথ্য সংকলন করব। উদ্যোগগুলোর মধ্যে কোন বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলোকে আমরা চিহ্নিত করব।

এই গবেষক আরও বলেন, আমরা মনে করছি, এসব উদ্যোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা এমন একটি গাইডলাইন তৈরি করতে পারব, যেটি করোনাভাইরাসের মতো বহুমাত্রিক সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে তুলে ধরতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি, মাঠ পর্যায়ের উদ্যোগগুলোই আমাদের আলো দেখাচ্ছে।

আরও পড়ুন- রেড জোন, ইয়েলো ও গ্রিন জোন ‘হবে’ যেসব এলাকা

গিপসেডার সুপারিশ

স্থানীয় পর্যায়ে গৃহীত বিভিন্ন সফল উদ্যোগ বিশ্লেষণ করে গিপসেডা’র পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে চারটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিষয়গুলো হলো—

প্রথমত, বহুমাত্রিক সংকট সমাধান একক কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, নির্বাচিত কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজের মতো সব প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের একসঙ্গে কাজ করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সবার একটি সম্মিলিত লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে হবে এবং এর গুরুত্ব বিষয়ে তারা একমত হবেন।

তৃতীয়ত, নেটওয়ার্কে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দক্ষতা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের বিশেষায়িত দক্ষতা বিবেচনায় নিয়েই কর্তব্য ও দায়িত্ব ভাগ করতে হবে।

চতুর্থত, নেটওয়ার্কের যুক্ত প্রত্যেককে অবদান রাখতে হবে এবং সবাই মিলে ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নিতে হবে।

ড. শাহান বলেন, আমাদের গবেষণা এখনো চলমান। গত তিন মাসে আমরা যে ২২টি উদ্যোগ পেয়েছি, এগুলোর বিশ্লেষণ শেষ হলে আমরা হয়তো আরও কিছু উদ্যোগ পাব। সেগুলোও বিশ্লেষণ করা হবে। এসব উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার যারা আছেন, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব। এর মাধ্যমে আমরা সমন্বয়হীনতার সমস্যা কাটিয়ে ওঠার মতো একটি গাইডলাইন খুঁজে পাব বলে আশাবাদী।

আরও পড়ুন-

রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোন নির্ধারণ হবে যেভাবে

রেড, ইয়োলো, গ্রিন: কোন জোনে কী কী করা যাবে?

জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর সায়, বাস্তবায়নে প্রশাসন

সারাদেশে রেড জোন চিহ্নিত করে শুরু হচ্ছে ‘কঠোর লকডাউন’

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন