বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানের পর এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে দুদক

July 6, 2020 | 10:17 am

শেখ জাহিদুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি সারাবাংলার সঙ্গে এক আলাপকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এসব কথা জানান।

বিজ্ঞাপন

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের অনুসন্ধান এখনও শেষ হয়নি, চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানের পরই আমরা জানতে পারব তিনি দোষী নাকি নির্দোষ। আর তখনই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যা আপনারা জানতে পারবেন।’

পাপুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা যদি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করি, তাহলে আইনি যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে সেগুলো অনুসরণ করেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। যেহেতু আমরা তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করিনি তাই এখনই ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়। তবে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা মামলা করার পর এই আলোচনাগুলো কাজে দেবে। তবে যদি কেউ দোষী বা দুর্নীতিবাজ হয়ে থাকে তাকে কমিশন ছাড় দেবে না।’

বিজ্ঞাপন

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ৩০ জুন কমিশনের পক্ষ থেকে জয়েন স্টোক, কক্সবাজার সাব রেজিস্টার অফিস ও সিলেট সাব রেজিস্টার অফিসে চিঠি দিয়ে পাপুলের বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর আগে ২১ জুন কমিশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়ে পাপুল এবং তার কোম্পানির যাবতীয় ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ (লেনদেন স্থগিত) করতে দুদকের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়।

এরও আগে, নির্বাচন কমিশনেকে চিঠি দিয়ে পাপুলের যাবতীয় তথ্য চায় কমিশন। এছাড়া তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংককেও চিঠি দিয়েছে দুদক। ফলে দুদকের অনুসন্ধান টিম পাপুলের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে কাজ করে যাচ্ছে। যার মধ্যে অনেক তথ্য দুদকের হাতে এসে পৌঁছেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত উপায়ে শত শত কোটি টাকা অর্জন করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য একজন কর্মকর্তাও নিয়োগ দেন। দুদকে পাপুলের বিরুদ্ধে ১৭৪ পাতার অভিযোগ জমা দেওয়া হয়।

সেই অভিযোগে বলা হয়, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এই পরিচালক বিদেশে ব্যবসার আড়ালে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। এর মধ্যে তিনি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৮০ কোটি টাকা হুন্ডি ও বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাচার করেছেন। এ টাকার মধ্যে তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি হিসাবের মাধ্যমে ১৩২ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা পাচার করেন। ইউসিবিএলের মাধ্যমে ১০ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকে ঋণ সৃষ্টি করে ১০ কোটি টাকা পাচার করেন। বাকি টাকা পাপুল তার শ্যালিকা জেসমিন প্রধান এবং জেডডব্লিউ লীলাবালি নামক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করেন। কয়েকজন ব্যাংক মালিক অর্থপাচারে পাপুলকে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, ৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন পাপুল। আর স্ত্রীর নামে একই ব্যাংকের ৩০ কোটি টাকার শেয়ার কিনে অংশীদার হয়েছেন। গুলশান-১ এর ১৬ নম্বর সড়কে গাউসিয়া ডেভেলপমেন্টের প্রকল্পে মেয়ে ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, গুলশান-২ এর পিংক সিটির পেছনে গাউসিয়া ইসলামিয়া প্রকল্পে স্ত্রীর নামে ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট, স্ত্রী ও নিজের নামে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৯১ কোটি টাকার সম্পদ আছে।

এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঢাকার ওয়েজ আর্নার্স শাখায় স্ত্রীর নামে ৫০ কোটি টাকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ও মেয়ের নামে ২০ কোটি টাকার বন্ড আছে। শ্যালিকার নামে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনে নিজে ব্যবহার করছেন। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে নিজ নামে ৪০ কোটি, মেয়ের নামে ১০ কোটি ও স্ত্রীর নামে ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে একটি ছয় তলা বাড়ি আছে। এছাড়া শ্যালিকার নাম ব্যবহার করে দিগন্ত মিডিয়ার বেনামে পরিচালক ছিলেন পাপুল। ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর সঙ্গে তার বিপুল পরিমাণ ব্যবসা ছিল। মীর কাশেম আলীর ফাঁসি হওয়ার পর পাপুল তার বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ব্যাংক পরিচালক হয়েও বেআইনিভাবে ইউসিবিএল ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করে সুবিধা ভোগ করেছেন। এই ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে পাপলু রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে পাথর সরবরাহের ব্যবসা করেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।

এদিকে অর্থ ও মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার হওয়া সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুল ও তার মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির হিসাব জব্দ করেছে কুয়েত সরকার। এর মধ্যে মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পাঁচ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার বা বাংলাদেশি টাকায় ১৩৭ কোটি ৮৮ লাখ ৮৩ টাকা রয়েছে বলে কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বরাতে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য পাপুলকে গত ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের কুয়েতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিও রয়েছে। পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ এনেছে কুয়েতি প্রসিকিউশন।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন ১৭ জুন মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েত পুলিশের হাতে গ্রেফতার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের ৪ সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখাকে (এসবি) চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সারাবাংলা/এসজে/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন