বিজ্ঞাপন

বিদেশি বিনিয়োগসহ ৪ বিষয়ে জোর দিতে পরামর্শ ব্রিটিশ দূতের

July 7, 2020 | 9:54 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চলমান করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) আঘাত মোকাবিলা করে সমানের দিকে এগুতে হলে বিদেশি বিনিয়োগে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট সি ডিকসন। এর জন্য ব্যবসাবান্ধব সহজ পরিবেশ তৈরি ছাড়াও সামষ্টিক অর্থনীতি, দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তৈরি পোশাক খাতে উদ্ভাবনী দক্ষতা তৈরিতে মনোযোগী হওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি অর্থনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির বর্তমান স্থীতিশীলতা সামনের দিনগুলোর জন্য বৃহত্তর পরিসরে স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে। ব্যবসায়ের সূচকগুলো এখনো ভালো অবস্থানে আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর জোর দিলে এবং সঠিকভাবে অথনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করলে চলমান দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন হবে না।

মঙ্গলবার (৭ জুন) বহুজাতিক ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ এবং বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক বোদ্ধারা এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট সি ডিকসন, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামিল। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান।

এইচএসবিসির এশিয়ান অর্থনেতিক গবেষণা সেলের যৌথ প্রধান ফ্রেদেরিক নিউম্যান ‘কোভিড-১৯ এবং বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব’ শীর্ষক মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট সি ডিকসন বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার উদীমান টাইগার। অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশটি যখন খুব ভালো করছে ঠিক তখনই করোনার আক্রমণ শুরু হল, যা শুধু বাংলাদেশই নয় পুরো পৃথিবীর অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুঃখজনক ঘটনা। তারপরও বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা রয়েছে তাতে চলমান বা করোনার আঘাত কাটিয়ে ওঠার মতো শক্তি দেশটির রয়েছে। আমার মতে করোনার আঘাত কাটিয়ে আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে সরকারের উচিত চারটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া।

ডিকসন বলেন, সমানের দিকে এগুতে হলে বিদেশি বিনিয়োগে জোর দিতে হবে। তাই সবার আগে বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে শতভাগ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসার করার জন্য যে নিয়ম বা যে সকল সনদ সংগ্রহ করতে হয়, এসব বিষয়গুলোকে আরও সহজ করতে হবে। সহজভাবে ব্যবসা করার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম, এই সূচকের আরও উন্নতি ঘটাতে হবে। অবস্থার উন্নতি ঘটাতে বাংলাদেশ সরকারকে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের ভালো রিজার্ভ আছে। তাই সামষ্টিক অর্থনীতিতে পদ্ধতিগতভাবে মূলধনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা একটি দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উল্লেখ করে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বলেন, এ কারণে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। দেশীয় ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডকে স্বচ্ছতার সাথে শক্তিশালী করতে হবে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নাগরিকদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগান ঠিক রাখতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান খাত পোশাক খাতের ওপর করোনার আক্রমণে ঝড় বয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত ডিকসন। তিনি বলেন, তবে হতাশ না হয়ে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি রাখে। কেননা বাংলাদেশে এই খাতের দক্ষ কর্মী রয়েছে। তাই তৈরি পোশাক খাতকে এখন উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবনী দক্ষতা দেখাতে হবে। যেমন পিপিই (ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী) বা এই ধরনের পণ্য বাংলাদেশ খুব ভালোমানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে, সেই সুযোগ দেশটির রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামিল বলেন, চলমান দুর্যোগ মোকাবিলা করতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নির্দেশে প্রনোদণা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। টেকসই বিনিয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খুব শিগগিরই ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা হচ্ছে, যেন দ্রুত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক সেবা পাওয়া যায়। করোনার পর ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া হবে, যেন তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর জোর দিচ্ছি। এই বিষয়ে আমরা এখনো কাজ করছি, যাতে করে এই খাতটি সহজেই চলমান ঝুঁকি মোকাবিলা করে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারে।

এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনলাইন কার্যক্রমে জোর দিতে হবে। থেমে থাকা যাবে না। অনলাইনে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিপণী বিতান বা মার্কেট বা কেনাকাটা সবখানেই অনলাইনকে গুরুত্ব দিতে হবে। চলমান পরিস্থিতিতে খরচ কমাতে হবে, কিন্তু স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।’

এইচএসবিসি’র এশিয়ান অর্থনেতিক গবেষণা সেলের যৌথ প্রধান ফ্রেদেরিক নিউম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত এখনো উজ্জ্বল। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর জোর দিলে এবং সঠিকভাবে অথনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করলে চলমান দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো ব্যাপার না। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও কর্মীদের চাকরি ছাঁটাই চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে কমমূল্যে শ্রমিক পাওয়া যায়, যা বড় একটি ইতিবাচক দিক। অন্যদিকে, চীন অনেক উৎপাদন খাত থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তিসহ আরও মেগা আকারের নতুন উৎপাদন শিল্পের দিতে মনযোগ দিচ্ছে। ভিয়েতনাম আবার ওই খাতগুলোকে নিজেদের পক্ষে এনে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করছে। যে কারণে এই দুর্যোগেও ভিয়েতনামকে তেমন সমস্যা পোহাতে হচ্ছে না। তাই বাংলাদেশকও যদি ভিয়েতনামের মতো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শক্তিশালী হতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। বিদেশি বিনেয়াগ যেন নিশ্চিত হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিবাচক দিক হচ্ছে যে মূল্যস্ফীতির বর্তমান স্থিতিশীলতা সামনের দিনগুলোর জন্য বৃহত্তর পরিসরে স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ের সূচকগুলো এখনও ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু সরকারি নীতি বিষয়ক অর্থনৈতিক সূচক নির্ধারণ (রেপো রেট) বাস্তবতার সঙ্গে যায়নি।’

সারাবাংলা/জেআইএল/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন