বিজ্ঞাপন

৬ মেগা প্রকল্পে মে পর্যন্ত খরচ ৩৪ শতাংশ, অগ্রগতিও ‘সন্তোষজনক’ নয়

July 7, 2020 | 11:28 pm

জোসনা জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে থাকা ছয় মেগা প্রকল্পে গত কয়েক বছরে ব্যয় হয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা, যা প্রকল্পগুলোর মোট খরচের ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। তবে এখন পর্যন্ত পদ্মাসেতু ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কেবল ভৌত অগ্রগতিই নয়, প্রকল্পগুলোতে বরাদেরদর তুলনায়ও ব্যয় হয়েছে কম। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ঋণ সংক্রান্ত জটিলতা ও ভূমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়ার কারণে অগ্রগতি সন্তোষজনক হয়নি বলে মত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, সবশেষ করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি আরও ধীর করে দিয়েছে। করোনার ধাক্কায় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রকল্পগুলোর কোনোটিতেই বরাদ্দ অর্থের অর্ধেকও খরচ হয়নি। চলমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত মেয়াদে শেষ হবে কি না— তা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অগ্রাধিকারে থাকা মেগা প্রকল্পগুলো হলো— পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ, মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছাকাছি ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত সিংগেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। ছয়টি প্রকল্পের মোট খরচ ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রথম শুরু হয় পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্প— ২০০৯ সালে। এরপর ২০১০ সালে দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেল লাইন নির্মাণ, ২০১২ সালে মেট্রোরেল, ২০১৪ সালে মাতারবাড়ী বিদুৎকেন্দ্র, ২০১৬ সালে পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ স্থাপন এবং একই বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। অথচ এখন পর্যন্ত সবগুলো প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৮৯ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় প্রকল্প মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি।

শুরু থেকে গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর ক্রমপুঞ্জিত এ ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ফাস্ট ট্র্যাক অগ্রগতি প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে সবশেষ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত অর্থ খরচের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) বরাদ্দের অনেক কম অর্থ খরচ হয়েছে মে মাস পর্যন্ত। এই সময়ে (অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত) প্রকল্পগুলোর জন্য ৩০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অথচ এই সময়ে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫৬ দশমিক ৫২ শতাংশ— ১৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে গত অর্থবছরের ১১ মাসে কেবল মাতারবাড়ী বিদুৎকেন্দ্রে বরাদ্দের প্রায় শতভাগ অর্থ ব্যয় হয়েছে। আর দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেল লাইন নির্মাণে ব্যয় করা গেছে ৮০ শতাংশ। বাকি চার প্রকল্পের গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ব্যয় ছিল অর্থবছরের বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। প্রকল্পগুলোর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিও হয়নি।

করোনাতেও প্রকল্প এগিয়ে নিতে নির্দেশনা

বিজ্ঞাপন

তবে গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফাস্ট ট্র্যাক মনিটরিং টাস্কফোর্সের সভায় প্রকল্পগুলোর গতি বাড়াকে নানা উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারের লক্ষ্য, প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করা। সে জন্য চলমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

টাস্কফোর্সের সভা থেকে করোনা পরিস্থিতিতেও মেগা প্রকল্পগুলোতে কাজ এগিয়ে নিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর সর্বোচ্চ ‍গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারীর সঙ্গে ‍যুক্ত কনসালট্যান্ট, টেকনিশয়ান ও শ্রমিকসহ অন্যান্য সবাই যেন করোনা সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন, সেজন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দু’টি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের কাজ শেষও হয়েছে। মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের কোভিড পরীক্ষা করে  আইসোলেশন শেষে কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে  শ্রমিকদের নিয়ে অনেকগুলো গ্রুপ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে সবাই সক্রিয়ভাবে কাজে যোগ দিলে প্রকল্পগুলো পূর্ণ গতি ফিরে পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

কোন প্রকল্পের অগ্রগতি কতটুকু (২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত)

ফাস্ট ট্র্যাক অগ্রগতি প্রতিবেদনে অগ্রাধিকার পাওয়া ছয় প্রকল্পের গত মে মাস পর্যন্ত ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরের বরাদ্দের কতটুকু খরচ হয়েছে, উঠে এসে সে তথ্যও। প্রকল্পগুলো নিয়ে মন্তব্যও করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। গত অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল চার হাজার ১৫ কোটি টাকা। মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে দুই হাজার ৮৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের শুরু থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল সেতু নির্মাণ কাজ হয়েছে ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। নদী শাসন কাজ ৭২ শতাংশ। তবে জুন প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরীক্ষণ প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, প্রকল্পটি নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ নাও হতে পারে।

মেট্রোরেল

প্রকল্পের মোট খরচ ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। ২০১২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল চার হাজার ৩২৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। মে মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৩২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। শুরু থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ৯ হাজার ৯২৯ কোটি  ৯২ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন শতভাগ,পূর্ত কাজ ৬৮ শতাংশ, উত্তরা নর্থ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৯টি স্টেশনের নির্মাণ কাজ ৭১ দশমিক ০৯ শতাংশ, আগারগাঁও থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত সাতটি স্টেশনের কাজ ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সাতটি স্টেশনের কাজ ৪৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, রেল কোচ ও ডিপো ইক্যুপমেন্ট ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশের জন্য সোস্যাল সার্ভে চলছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য। গত অর্থবছরের আরএডিতে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে সাত হাজার ৮৭৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। শুরু থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ২৮ হাজার ৩২৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ২৫ দশমিক ০৪ শতাংশ। ১২টি ওয়ার্কিং ডক্যুমেন্টেশন প্যাকেজ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। প্রতিটির জন্য মাইলস্টোন অ্যাসিভমেন্ট সার্টিফিকেট সই হয়েছে।

মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্টা সুপার বিদুৎকেন্দ্র

প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ২২৫ কোটি টাকা, মে মাস পর্যন্ত ব্যয় তিন হাজার ২০১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই প্রকল্পটিতে গত অর্থবছরে বরাদ্দ হওয়া অর্থ অনেকটাই ব্যয় করা হয়েছে। শুরু থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ২৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আর্থিক ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ

প্রকল্প ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে। গত অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ২৯৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মে মাস পর্যন্ত খরচ মাত্র ২৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে ছয় মেগা প্রকল্পের মধ্যে এটিতেই সবচেয়ে কম খরচ হয়েছে। শুরু থেকে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ১২ হাজার ২৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ৩০ দশমিক ৫২ শতাংশ।

দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেল লাইন নির্মাণ

প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের লক্ষ্য ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে। আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। মে মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯০৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত অর্থবছরে এই প্রকল্পটিতেও ব্যয় হয়েছে সিংহভাগ অর্থ। তবে প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় চার হাজার ৮০৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে ১০ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৩৯ শতাংশ।

মেগা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক জৈষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অবশ্যই প্রকল্পগুলোর গতি শ্লথ হয়েছে। তবে গতি বাড়াতে একটি সুনিদিষ্ট কর্মকৌশল তৈরি করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক কিছুই নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। মেগা প্রকল্পগুলোকে নিয়েও নতুন ভাবনার সময় এসেছে।

সারাবাংলা/জেজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন