বিজ্ঞাপন

পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ‘অসম্ভব’: ঝুঁকি শতভাগ

July 8, 2020 | 4:33 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের হারে এখনো ঊর্ধ্বগতি থামেনি। করোনায় মৃত্যুর পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতেও ঈদুল আজহা সামনে রেখে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে’ পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্তে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সে স্বাস্থ্যবিধি তৈরিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োগ বলতে গেলে অসম্ভব। সেক্ষেত্রে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে’ পশুর হাট বসানো হলেও দেশে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, মে মাসের শেষ ১৬ দিনে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭শ মানুষের শরীরে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। অন্যদিকে, ২৫ মে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ পর থেকে প্রতিদিন সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা গড়ে তিন হাজার পেরিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশুর হাট ও কোরবানি ঘিরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে ঈদুল আজহা পরবর্তী সময়েও করোনা সংক্রমণের এমন উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন- করোনায় অনলাইনে জমে উঠবে পশুর হাট

বিজ্ঞাপন

ঈদুল আজহা সামনে রেখে গত ২৫ জুন পশুর হাট ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানি ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি পর্যালোচনা বিষয়ক এক অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনেই এ বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর হাট বসবে। সবশেষ তথ্য বলছে, সেই স্বাস্থ্যবিধি তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

জানতে চাইলে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট বসানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাংলাদেশে কোরবানির পশুর হাট বসানো সম্ভব না। তাছাড়া গত ঈদে (ঈদুল ফিতর) মানুষের অবাধ চলাচলে কারণে সংক্রমণ বেড়েছে। এই ঈদে সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ গরুর হাটই তো শেষ কথা নয়। দেখা যায় কোরবানি দেওয়ার সময়েও পাঁচ থেকে ১০ জন লোককে কাছাকাছি থেকে কাজ করতে হয়। এরপর আছে বিতরণ। তার ওপর এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নিম্ন আয়ের মানুষরা কিন্তু সেদিন অল্প কিছু মাংস পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারেন। ঈদে শহর-গ্রামের মধ্যে মানুষের যাতায়াতও বাড়বে। সব মিলিয়ে দেশে যখন সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী, তখন ঈদুল আজহা ও পশুর হাটের কারণে সংক্রমণের হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছেই।

আরও পড়ুন- আজকের কার্টুন: পশুর হাটে মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, কোরবানির ঈদ মানেই বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। এই ঈদ উপলক্ষে পশুর হাট বসা মানেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। কারণ এখানে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ গবাদি পশু বেচাকেনায় যুক্ত থাকেন কয়েক লাখ খামারি-ব্যবসায়ী। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে চলাচল করেন। হাটে গরু কিনতে যান দুই থেকে তিন কোটি মানুষ। সুতরাং দেখা গেল, ক্রেতারা বিভিন্ন স্থান থেকে সংক্রমণ নিয়ে হাটে আসতে পারেন। খামারি বা গরু ব্যবসায়ী হয়তো সেই সংক্রমণ নিয়ে গ্রামে ফিরে যাবেন। বিক্রেতাদের কাছ থেকেও ক্রেতাদের মধ্যে ছড়াতে পারে। আসলে পুরো বিষয়টিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তো হাট বসানোর কথা বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. বেনজির বলেন, গরু-ছাগলের হাট কিন্তু কঠিন জায়গা। এখানে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। সুতরাং তাদের পক্ষে আসলে স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটুকু সম্ভব, সেটা বিবেচনা করার বিষয়। সেখানে চিৎকার, হৈ চৈ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কিছু হবে। এ সময়ে আসলে ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকবে অনেক বেশি। কেবল বিক্রির সময়েই এভাবে তিন থেকে চার কোটি মানুষ বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ঢুকে পড়বেন। পশু কোরবানির ক্ষেত্রেও একই কথা, স্বাস্থ্যবিধি মানা কি সম্ভব হবে?

আরও পড়ুন- ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসবে কোরবানির পশুর হাট’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, আক্রান্তের হার আগে যেসব এলাকায় কম ছিল, সেসব এলাকায় কিন্তু সংক্রমণ বাড়ছে। কারণ গত ঈদে আমরা আসলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। খুলনা বিভাগ, রংপুর বিভাগ, রাজশাহী বিভাগে ওই ঈদের আগ পর্যন্তও সংক্রমণ যথেষ্ট কম ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বলে এসব এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে। সিলেটেও আক্রান্ত বাড়ছে। এর অর্থ— রোজার ঈদের আগে আমাদের যেসব অনাক্রান্ত এলাকা ছিল, সেসব এলাকা আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ চক্রে ঢুকছি। সেটার লক্ষণই এখন প্রকাশ পাচ্ছে। তাই কোরবানির বাস্তবতা মেনে নিলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যার অভাব অভাব প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামও পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের যে সক্ষমতা, তাতে পশুর হাট বসিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, অন্তত সেসব এলাকায় তো পশুর হাট কোনোভাবেই বসানো যাবে না। কম সংক্রমিত এলাকাগুলোর জন্যও পশুর হাট ঝুঁকি তৈরি করবে। আসলে গরু-ছাগলের হাটে সবার পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।

আরও পড়ুন- ‘পশুর হাট সংক্রমণের হার আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা রয়েছে’

এক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা করেও যদি পশুর হাট পরিচালনা করা যায়, সেটি কিছুটা হলেও সংক্রমণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হলে বলে মনে করছেন অধ্যাপক ডা. নজরুল। তা না করতে পারলে ঈদুল ফিতরের পর যেভাবে সংক্রমণ বেড়েছে, ঈদুল আজহার পর তার চেয়েও বেশি গতিতে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তার। তাই সংশ্লিষ্টরা অনেক ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করছেন এই বিশেষজ্ঞ।

পশুর হাটের বিকল্প কী?

পশুর হাটের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বললেও কোরবানির বিপক্ষে নন কেউই। স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করে কিভাবে বিকল্প উপায়ে কোরবানির ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়টিই খুঁজে দেখতে বলছেন তারা। এ ক্ষেত্রে একটি খসড়া ধারণার কথাও জানালেন বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।

তিনি বলেন, যারা হজ করতে যান, তাদের কিন্তু কোরবানির এক ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। আমি নিজেও হজ করেছি। হজের সময় কোরবানিও দিতে হয়। সেটি কিন্তু নিজেকে দিতে হয় না। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে কোরবানি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কোনো ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে কি না, সেটি ভেবে দেখা যায়। কারণ ইফা’র বড় একটি নেটওয়ার্ক আছে সারাদেশে। ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা জমা নেওয়া সম্ভব। আর ইফা’র মাধ্যমে ইমামদের নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রশাসনের সহযোগিতায় পুরো ব্যবস্থাপনাটি করা সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস।

আরও পড়ুন- আগে পশুর হাট ইজারা, স্বাস্থ্যবিধির সিদ্ধান্ত পরে

অধ্যাপক ডা. কামরুল আরও বলেন, ইফার সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে কমিটি করে দিতে পারলে তারাই খামারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পশু কেনা, নির্দিষ্ট স্থানে নিযুক্ত জনবল দিয়ে কোরবানি দেওয়া ও বাড়ি বাড়ি মাংস পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করা সম্ভব। তাছাড়া এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি করা যাবে বলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। আবার এখনো অনেক গ্রামেই সমাজে কোরবানি দেওয়া হয়। তারাও কিন্তু গ্রামের জন্য এরকমই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় কোরবানি দেয়। তবে সেখানে গ্রামের সবার অংশগ্রহণটা বিভিন্ন মাত্রায় থাকে। ওই মডেলটিও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট জনবলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলেই কিন্তু সংক্রমণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে কোরবানি বা পশুর হাটের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যবিধি নয়, বরং বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য অধ্যাপক ডা. কামরলের। ক্ষেত্রে অনলাইনে কেনাবেচাকেও উৎসাহিত করার পক্ষে মত এই চিকিৎসকের।

আরও পড়ুন-

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোরবানি পশুর হাট বসবে না: আতিকুল

পশুর হাটে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের না যাওয়ার অনুরোধ মেয়র তাপসের

হিলিতে অনলাইন কোরবানি পশুর হাট চালু, স্বস্তি ক্রেতা-বিক্রেতার

বয়স্ক-শিশু-অসুস্থদের পশুর হাটে না যাওয়ার আহ্বান মেয়র আতিকের

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন