বিজ্ঞাপন

অনুমোদন ছাড়াই অ্যান্টিবডি টেস্ট করাচ্ছে শাহাবুদ্দিন মেডিকেল!

July 12, 2020 | 9:00 am

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্তে বাংলাদেশে এখনও র‍্যাপিড টেস্ট কিটের (অ্যান্ডিবডি) অনুমোদন দেয়নি সরকার। ঔষুধ প্রশাসন অধিদফতর জানিয়েছে, ডায়াগনোসিসের জন্য র‍্যাপিড টেস্ট কিট ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু রাজধানীর শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাড়ে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ডায়াগনোসিসের জন্য রোগীদের র‍্যাপিড টেস্ট করানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে প্রতিষ্ঠানটি পিসিআর ল্যাবের জন্য অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত তারা নিজেদের মেশিন বসাতে পারেনি। অথচ হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও বাইরে থেকে যারা নমুনা পরীক্ষা করাতে আসছে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাদের পিসিআর ল্যাব আছে তারা হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও বহির্বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে নমুনা পরীক্ষার জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা ফি নিতে পারবে। এর বাইরে কোনো টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই।

শনিবার (১১ জুলাই) সরেজমিনে শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এসব চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিবেদক এদিন নিজেই রোগী সেজে যান শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুপুর ১২ টা ৫৬ মিনিটে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে কোভিড-১৯ উপসর্গ থাকা রোগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। রিসিপশনে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, আজ নমুনা পরীক্ষা সম্ভব না। তবে এখানে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে ১২ টার মধ্যে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল দুইদিনের মধ্যে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

আপনাদের কী নিজেদের পিসিআর ল্যাব আছে?- এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা জানান, ‘হ্যাঁ, আমাদের লোকেরাই নমুনা সংগ্রহ করে। আমাদের ল্যাবেই পরীক্ষা হয়ে থাকে।’ র‍্যাপিড টেস্ট করাতে চাইলে কোনো ব্যবস্থা করা যাবে কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এটা আমাদের এখানে করা হয় না।’ এ সময় তিনি হাসপাতালের মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা নূর হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। নূর হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনিও একই কথা বলেন। তবে তিনি বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় নিজেদের পিসিআর ল্যাবেই করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়।’ কিন্তু পিসিআর ল্যাব কোথায় সেটি তিনি জানাতে পারেননি।

অনুমোদন ছাড়াই অ্যান্টিবডি টেস্ট করাচ্ছে শাহাবুদ্দিন মেডিকেল!

বাসায় নমুনা সংগ্রহ করা হয় কি না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমে বাসার ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন। পরবর্তী সময়ে বলেন, ‘না বাসায় গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। র‍্যাপিড টেস্টও হাসপাতালে করা হয় না।’ কিন্তু এই প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে দেখেন হাসপাতালটিতে অ্যান্টিবডি টেস্ট করা হচ্ছে। এর জন্য রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

হাসপাতালের ভর্তি থাকা একজন রোগীর অ্যান্টিবডি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ দেখানো হয়েছে। ৮ জুলাই সংগ্রহ করা এই নমুনা পরীক্ষার ফলে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আবুল হাসনাতের সই রয়েছে। আরেকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭ জুন এই হাসপাতাল থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট করান তিনি। ওই রিপোর্টের ফলাফলেও হাসপাতালের ডা. মো. আবুল হাসনাতের সই দেখা যায়।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মনসুর আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যে নমুনা পরীক্ষা করানো হয়। তবে আমাদের পিসিআর ল্যাবের অনুমোদন থাকলেও তা আগস্টের প্রথম সপ্তাহের আগে চালু করা সম্ভব নয়।’ তবে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে নমুনা পরীক্ষা করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মনে হয় এটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কালেকশন করে নেয়।’

বাড়ি গিয়ে নয়, বরং হাসপাতালে গেলে রোগীর কাছ থেকে এমন টাকা নেওয়া হয়- এমন প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘কে বলেছে?’ কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিবেদকের কাছে সকল তথ্য-প্রমাণ আছে, যা হাসপাতালে গিয়ে নেওয়া হয়েছে- এমন কথা বলার পরে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে সহকারী পরিচালক আপনাকে ভালো বলতে পারবেন।’ আপনারা র‍্যাপিড টেস্ট করান কার অনুমতি নিয়ে?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনি এসব বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন।’

তবে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আবুল হাসনাত সবকিছুই অস্বীকার করেন। এ সময় উনাকে তথ্য-প্রমাণ আছে জানানোর পর তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি সেই তথ্য-প্রমাণসহ হাসপাতালে এসে দেখা করেন।’ এরপর একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এদিকে র‍্যাপিড টেস্ট বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক আইয়ুব হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘র‍্যাপিড টেস্ট বিষয়ে সরকার এখনও কোনো অনুমোদন দেয়নি। এক্ষেত্রে ডায়াগনোসিসের জন্য কোনো অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে না সরকার। সংক্রমণের মাত্রা বোঝার জন্য সেরো সার্ভিল্যান্স ও প্লাজমা থেরাপিসহ কিছু বিষয়ে সহায়তার জন্য র‍্যাপিড টেস্ট কিট অনুমোদনের বিষয়ে ভাবছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে। তবে এর আগে যদি কেউ র‍্যাপিড টেস্ট করে থাকে তবে তা অবৈধ এবং অনৈতিক।‘

উল্লেখ্য, ৫ জুন শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ নমুনা পরীক্ষা করানোর জন্য পিসিআর ল্যাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ল্যাবের কাজ শুরু না হওয়ার তাদের চিঠি পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সারাবাংলাকে বলেন, ‘র‍্যাপিড টেস্ট কিটের অনুমোদন দেয়নি সরকার। এভাবে যদি কেউ নমুনা পরীক্ষা করে তবে তা অনৈতিক। আর হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষার খরচ সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা আছে।’

তিনি বলেন, ‘সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৫০০ টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদি কেউ এর বেশি নিয়ে থাকে তবে সেটাও অনৈতিক। শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ পিসিআর ল্যাবের অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু এখনও তারা কাজ শুরু করেনি। এ বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। তারা উত্তরে জানিয়েছে, আগস্টের দিকে তারা পিসিআর মেশিনে নমুনা পরীক্ষা শুরু করবে। তবে করোনা পরীক্ষার জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা তারা কোনোভাবেই নিতে পারে না।’

‘শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে র‍্যাপিড টেস্ট করানো হচ্ছে। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো নজরদারি নেই কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন