বিজ্ঞাপন

করোনাকালের রোজনামচা (শেষ পর্ব)

July 17, 2020 | 12:35 pm

মঈনুল আহসান সাবের

এ গল্প এখানেও শেষ হয়ে যেতে পারে। তাদের কথা না থাকার মধ্য দিয়ে। তারা আছে, কিন্তু তাদের কথা নেই। কথা না থাকার কথা বলতে বলতে তারা ঘুমোতে যাবে, পরদিন সকালে উঠবে, টিভি দেখবে, দুপুরে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করবে, বিকালে ঘরের ভেতর পায়চারি করবে, কখনো বারান্দায় দাঁড়াবে- ঐ যে, ফুটপাতের ঐ জায়গাটায় কালাম সাহেব বসে ছিলেন, না?
ঐযে, ওখানেই।...বাদ দাও, কী হবে এসব কথায়...।
গল্প এভাবে শেষ হতে পারে, কিংবা অন্যভাবেও। রমিজ হোসেন হয়ত একদিন বলল, নুসরাত, একটা বলব। তুমি সিরিয়াসলি নিও। আমার গলাটা দুদিন হলো ব্যথা করছে। দু'তিন দিন হলো জ্বর জ্বরও আছে।
তোমার মনের ভুল। ভাবছ এরকম।
না। সেজন্যই তোমাকে বললাম সিরিয়াসলি নিতে।
জ্বর আর গলা ব্যথা হলেই করোনা না।
না, তা না। কিন্তু...।
তা ছাড়া তোমার করোনা হবেই বা কেন। বাইরে যা যাওয়ার আমিই যাই...।
ঐ যে একদিন, এক বিকালে, খুব অস্থির লাগছিল, বাসায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, একটু হেঁটে আসি একটু হেঁটে আসি বলে তোমার অনুমতি নিয়ে সামনের পার্কে গেলাম না হাঁটতে...।
মাস্ক পরে গিয়েছিলে।
গ্লাভস ছিল না হাতে। আমি সিঁড়ির রেলিং ধরে নেমেছিলাম। অদ্ভুত দ্যাখো, আমি কিন্তু রেলিং না ধরেই নামতে পারি, কিন্তু সেদিন হঠাৎ মনে হলো শরীর ভারি... তারপর পার্কে নিয়ে সেই ঠেলে খোলা... ঠিক মনে নেই সবকিছু...।
গ্লাভস পরা জরুরি। মাস্কের চেয়ে বেশি।... আমিও যে কেন খেয়াল করলাম না। তবে রমিজ তোমার কিছু হয়নি। মনের ব্যাপার...। জ্বর নেমেছে?
জ্বর আছে। একশর মতো।
জ্বর নানা কারণে থাকতে পারে। বাদ দাও। ... টেস্ট করাবে?
টেস্ট? সাতদিন ঘুরতে হবে, আর সাতদিন পরও রেজাল্ট পাওয়া যাবে না... আমার ইচ্ছা ছিল গণস্বাস্থ্যের কিটটা এলে এমনিতেই একবার টেস্ট করাবো...।
অনুমতি দিল না...।
আরে ওরা ধরো পাঁচ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে টেস্ট, তিনশ টাকার কিটে টেস্ট যে করাবে, ওদের থাকবে কিছু?
ঐ যে, হু, ওরাও নাকি অনুমতি দেয়নি।
দেয়নি। হু’র প্রধান কাজগুলোর একটা হচ্ছে বড় বড় ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ দেখা।
কত কী যে দুনিয়ায়...! শোনো, তোমার কিছু হয়েছে, এ ব্যাপারটাই মাথায় রেখো না।
রমিজ হোসেন মাথা দোলালো।
চ্যানেল বদলাও। ঐ যে রিমোট। একাত্তর দেখতে ইচ্ছে করে না। বড় বেশি দালালি করে।
বদলাচ্ছি।... তুমি কি একটু সরে বসবে?
কেন! ...তোমার কিছু হলে তখন দেখা যাবে।

বিজ্ঞাপন

নুসরাত হোসেন এমন বললো বটে, তবে ভোররাতেই সে উঠে চাদর বিছিয়ে ড্রয়িংরুমে শুলো। রমিজ হোসেন সকালে উঠে তাকে ঘরে না দেখে, বারান্দা বা রান্নাঘরেও না পেয়ে খুবই অবাক হল। তাকে না বলে কোথায় গেল নুসরাত! রমিজ আবার রান্নাঘরে গেল, আবার বারান্দায়। তারপর কেন সে নুসরাতকে ফোন করছে না, কেন এই সামান্য ব্যাপারটা মাথায় আসছে না, এসব ভেবে রমিজ লজ্জা বোধ করলো ও নুসরাতকে ফোন করলো। প্রথমবার ফোন ধরলো না নুসরাত, দ্বিতীয়বার ধরলো- উঠেছ?
কিন্তু তুমি কোথায়? কী আশ্চর্য! তুমি কোথায়?
আমি ড্রয়িংরুমে।... হ্যা, ড্রয়িংরুমে।... না, তুমি আসবে না এদিকে।
কী যে করোনা! কী করে বুঝলে তোমার কিছু হয়েছে!
সিম্পটমগুলো তো জানি...।
ছাই জানো। তাছাড়া কিছু যদি হয়েই থাকে তুমি থাকবে এখানে, আমি ড্রয়িংরুমে।
না, এটাই ঠিক আছে। একটা বাড়তি তোষক ছিল, ওটা বিছিয়ে নিয়েছি। গেস্ট বাথরুমও কাছেই আছে।... রমিজ...।
তোমার আসলে কিছুই হয়নি। বলো।
ভাত রান্না করতে পারবে না?
পারবো।
ডিম? মামলেট?
পারবো।
আপাতত এই খেতে হবে আমাদের।
অসুবিধা নেই।... আমি আসছি তোমার কাছে।
যদি আসো, দরজা পর্যন্ত আসবে। ভেতরে ঢুকবে না।
এগোতে এগোতে রমিজ বললো- আমার ধারণা বিকেল নাগাদ তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে, অর্থাৎ তোমার সন্দেহ কেটে যাবে। তোমার করোনা হওয়ার কোনই কারণ নেই।
রমিজ ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল, নুসরাত হোসেন তাকে অনুমতি না দিয়ে ধমকাল। সে বলল- আর এক পাও না, এক পা-ও না, ওখানেই দাঁড়াও। দরজার কাছে।
রমিজ দরজার কাছে দাঁড়াল, বারকয়েক নুসরাতের দিকে তাকাল, বারকয়েক এদিকওদিক, তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করল- কষ্ট হচ্ছে?
নুসরাত মাথা নাড়ল- না অস্বস্তি। ... শোনো, তুমি খাবার ঐ দরজার কাছে রেখে যাবে। আমি নিয়ে নেব। একটা জগ আর একটা গ্লাস রাখবে। জগ শেষ হয়ে গেলে ধরবে না। অন্যকিছুতে পানি এনে ভরে দেবে। আর প্লেট আমি বাথরুমে ধুয়ে নেব। তুমি ওখানে সাবান, ব্লিচিং পাউডার আর স্যানিটাইজার রেখে এসো।
রমিজ হোসেন জিজ্ঞেস করল- তোমার কি কষ্ট হচ্ছে?
বলেছি না। ... হচ্ছে। একটু। ভয়ও হচ্ছে।
মনের জোরটা নাকি খুব দরকার, নুসরাত।... খুব দরকার।
আমার মনের জোর আছে।
একবার টেস্ট করাবে?
না। রিকশায় করে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘোরার ইচ্ছা আমার নেই। ভর্তিও হতে চাই না। তাছাড়া আমরা বের হলে এখানকার লোকজন টের পেয়ে যাবে। তখন কী হবে, তুমি জানো। ... তুমি যাও, নাস্তা বানিয়ে খেয়ে নাও।
সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, তারপর রমিজের একটু বিশ্রাম- এভাবে বিকাল পার হলো। সন্ধ্যার আগে রমিজ যখন চা বানিয়ে চার আর দুটো বিস্কিট নুসরাতের দরজার কাছে রেখে আসতে গেল, নুসরাত বলল- খুব বেশি চাপ পড়ে গেছে, না? তোমার এতসবে অভ্যাস নেই।
আরে না, এসব হচ্ছে খুচরা কাজ। ... তোমার জ্বর কেমন?
একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে।
মেপেছ?
ইচ্ছে করছে না। ... মাপব পরে।
জ্বর কি হঠাৎ করে আসে?
হু। সর্দি সর্দি একটা ভাব হয়।
ঘরে একটাই থার্মোমিটার, না?
রমিজ...!
আহা। একটু মেপে দেখতাম।... ঘুম থেকে...।
মাথা থেকে এসব চিন্তা সরাও। আমার হয়েছে, তাই অনেককিছুই মনে হবে তোমার।... গা গরম অনেকসময় এমনিতেও হয়।
সেসব আমি জানি। কথা হচ্ছে, তোমার হলে আমারও কেন হতে পারবে না? আমরা এতদিন একসঙ্গেই ছিলাম...।
তার মানে আমার কাছ থেকে তোমার হয়েছে?
আহা। আমি কি তা বুঝিয়েছি। তোমার কাছ থেকে আমার কেন হবে! ঐ যে, ডিপার্ট্মেন্ত স্টোরে অর্ডার ছিল সপ্তাহের বাজারের, ডেলিভারি বয় মালপত্র সামলাতে পারছিল না, দরজার কাছে সব এলোমেলো করে ফেলেছিল... হয়তো ওই ডেলিভারি বয়ই ক্যারিয়ার ছিল...।
নুসরাত রমিজের দিক থেকে মুখ সরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাল।
ঐ থার্মোমিটারটাই দাও। আমি ভালোভাবে স্যানিটাইজ করে নিচ্ছি। তারপর আবার স্যানিটাইজ করে তোমাকে দেব। জ্বরটা দেখতে হবে নিয়মিত কত। অন্যান্য উপসর্গগুলোও মাথায় রেখে। আর হ্যা, মনের জোরটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই মনের জোরেই মানুষ বাসায় থেকে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ... থার্মোমিটারটা দাও।...সবসময় শুয়ে থেকো না, একটু বসে থাকা, হাঁটাচলা, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ...।
তুমি এখান থেকে যাও, প্লিজ। না হলে অদ্ভুত কথা বলা বন্ধ করো। আমি ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ কী জানি? জীবনে করেছি?

তাদের চার- পাঁচদিন পার হয়ে গেল। জ্বর কমল না, কাশি হলো, নাক ভেজা থাকল সবসময়, আর গলায় প্রবল অস্বস্তি ও কখনো শ্বাশকষ্ট। তারা একসঙ্গে থাকতে আরম্ভ করেছে। এঘরে-ওঘরে হাঁটাহাঁটি করছে।
মাঝেমাঝে, তারা অ্যানিম্যাল প্রোটিন খাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
এক বিকালে, তারা যখন পাশাপাশি হাঁটছিল, রমিজ হোসেন বলল- যতক্ষন শ্বাস ততক্ষন আশ।
সামান্য হাসল নুসরাত- তাই। ... আমার শ্বাসকষ্টটা বেড়েছে।
একটু ইতস্তত করল রমিজ- হুম আমারও। মাঝে মাঝে মনে হয় এই কষ্ট সামাল দেওয়া যাবে না।
যাবে না হয়তো।
নুসরাতের দিকে একপলক তাকায় রমিজ- না গেলে না যাবে না।... অনেকদিন হলো না এই পৃথিবীতে?
হলো।
তাছাড়া, ধরো, আরও কিছুদিন নাহয় বেঁচেই থাকলাম। কী আর হবে?
জানি না।
আমিও না।
ওষুধ শেষ হয়ে যাবে আজ। আনতে হবে।
ওষুধ, না?
ওষুধ। বাজারও করা দরকার।
দরকার? সত্যিই দরকার? হয়তো দেখা গেল দরকার না।
ওষুধের দোকান থেকে জানিয়েছে, তাদের ওখানে এত ভিড়, কেউই দোকান বন্ধ করার সময় ছাড়া বের হতে পারবে না। তবে ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে বাজার নিয়ে একজন চলে এলো দুপুরের আগে। দরজার বেল বাজল, সে ছেলে ফোনও করল। রমিজ আগেই ঠিক করে রেখেছিল, সে দরজা খুলবে না। হাতে গ্লাভস পরে টাকাগুলো একটা খামের ভেতর রেখে দরজার নিচ দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেবে আর ডেলিভারি বয়কে বলবে বাজার দরজার কাছে রেখে যেতে, পরে সে নিয়ে নেবে। ডেলিভারি বয় ফোন করে তার উপস্থিতি জানালে, রমিজ প্রথমে বিল জেনে নিল। তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে, কিছু টাকা সে আগেই ইস্ত্রি করে রেখেছিল, সেখান থেকে বিলের অংশ গ্লাভস পরা হাতে খামে ঢুকিয়ে খামটা ইস্ত্রি করল, তারপর বাইরের দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল- তুমি আছ?
আছি।... চাবি কই স্যার?
শন, আমি বিল দরজার নিচ দিয়ে দিয়ে দিচ্ছি, তুমি বাজার বাইরে রেখে চলে যাও।
জি।... স্যার, দরজায় তালা কেন! বাজার নিবেন কেমনে?
কোন দরজায়?
এই যে এই দরজায়। বাজার নাহয় পরে নিবেন, কিন্তু বাইরে থেকে তালা দিছেন ক্যামনে!... স্যার সমস্যা কী?
রমিজ হোসেন বললেন- তুমি যাও। এখনই যাও।
স্যার সমস্যা কী? করোনা নাকি? বিল্ডিং এর লোকজন তালা দিছে? এইটা অন্যায়। আমি পুলিশরে ফোন দিব।
রমিজ হোসেন আবার বললেন- তুমি যাও, যাও এখান থেকে।
দরজায় কান রাখলে বোজা গেল ছেলেটা নেমে যাচ্ছে। নিশ্চিত হয়ে রমিজ নুসরাতের দিকে ফিরল- আমাদের কে তালা দিল, নুসরাত?
নুসরাত হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকল।
কিন্তু বুঝল কীভাবে! ... দাঁড়াও দাঁড়াও, সেদিন কেয়াটেকার এসেছিল না? ভেতরে ঢুকে ইলেক্ট্রিক বিল নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিল। সম্ভবত ওটা ছিল বাড়িওয়ালার চাল। বিভিন্ন বাসায় পাঠিয়েছিল কেয়ারটেকারকে। আমরা ঢুকতে দিইনি জেদাজিদি সত্ত্বেও। তখন সন্দেহ করে দরজায় তালা দিয়েছে।
নুসরাত বলল- আমরা তাহলে বের হতে পারব না?

বিজ্ঞাপন

তারা একবার ঠিক করল দরজায় দুজন মিলে অনেকক্ষন ধরে লাথি মারবে। শিলপাটার শিল আর হাতুড়ি এনে দরজা ভাঙবে, একবার ভাবল বারান্দায় গিয়ে চেঁচাবে, এবং এরকম আরো কিছু। তাঁর একটিও অবশ্য শেষ পর্যন্ত করা হলো না। রমিজ বলল- মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কী করে!
মানুষ এমনই। মাঝেমাঝেই আমরা বলি না- মানুষ কীভাবে পারল।... মানুষ পারে।
তারা আমাদের জিজ্ঞেস করতে পারত।
কিংবা বলতে পারত, আপনারা বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
আহা নুসরাত, বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বললে আমরা কোথায় যেতাম!
তাহলে পুলিশে খবর দিত...।
পুলিশ তখন পুরো বাড়ি লকডাউন করে দিত।
করে কী হোতো!... আমরা তো একবারও বাইরে যাইনি। ঘরের মধ্যে থেকেছি। মাঝেমধ্যে শুধু বারান্দায় বসেছি। বারান্দা থেকে নিশ্চয় উড়ে উড়ে করোনা কারো বাসায় যাবে না।
না, করোনা উড়ে উড়ে যায় না।
এখন মনে হচ্ছে, করোনা উড়ে উড়ে বাড়িঅলার বাসায় যাক।
এভাবে বলে না। ... বাড়িঅলাই করেছে?
আর কে?... কিংবা এ বাড়ির সবাই মিলে।
করল। একবারও ভাবল না...।
ভেবে এটাই যুক্তিসঙ্গত মনে করেছে।
আমরা কিছু করব না?
কী।... ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ছেলেটা বলল পুলিশে খবর দেবে...।
দেবে?

নুসরাত বলল- ছেলেটা পুলিশে খবর দেয়নি।
জানতাম দেবে না।... কিংবা দিতেও পারে, পুলিশ কতদিক সামলাবে!
আমরা নিজেরাই কিন্তু পুলিশে খবর দিতে পারি। নাম্বার আছে, মনে পড়ল।
রমিজ মাথা ঝাঁকাল- পারি। কিন্তু নুসরাত, পুলিশ এসে কী করবে? ধরো, হাসপাতালে নিয়ে গেল আমাদের। তোমাকে এক হাসপাতালে, আমাকে আরেক। তারপর ভাবো। আমরা কিছুই জানলাম না কে কোথায়, এমনকি এক হাসপাতালে থাকলেও না। কে কোথায় কেমন আছি, জানব না। কে বাঁচলাম কে মারা গেলাম জানলাম। ধরো, তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে, কোথায় ফিরবে? ফিরলে এখানে। তারপর? ঢুকতে দিল না। কিংবা দিল। তারপর?
এমন অবস্থা তোমারও হতে পারে। তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে...।
তারপর?
জানি না।
তোমার কবর কোথায় সেটাও কে জানাবে না।
কবর কোথায় জেনে কী হবে? আসলেই, বলো, জেনে কী হবে!
ধরলাম, কিছু হবে না। কিন্তু আমরা এমনিতেই একা। এরমধ্যে কেউ না থাকলে, যে থাকবে, সে কীভাবে থাকবে?
তুমি পারবে না?
আমার যে কী কষ্ট হচ্ছে, গলার কাছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে মাঝেমধ্যেই। আমার আর সময় নাই, জানি।
সে আমিও জানি, রমিজ।... কিন্তু তাই বলে আমাদের তালা দিয়ে রাখবে?
এটা অন্যায়, খুবই অন্যায়। হঠাৎ ইচ্ছে করে ওদের বলি, দরজায় তালা দিয়ে রাখলেও মারা যাব, ভাই, না দিয়ে রাখলেও। দরজা বরং খুলে দিন, খোলা দরজায় মরি।

নুসরাত...।
নুসরাত উত্তর দিল না।
নুসরাত...।
নুসরাতের উত্তর পাওয়া গেল না।
নু...। রমিজ পাশ ফিরে, পাশ ফিরতে সময় লাগল তার। নুসরাত আছ? নাকি আমার আগ চলে গেলে?
নুসরাত দম নেওয়ার চেষ্টা করল- সময় ফুরিয়েছে...।
আমারও। হয়তো আজই।...কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা বলারও ইচ্ছা হচ্ছে খুব।
বলো।
দরজা তালা দিল আমাদের। আমরা মেনে নিলাম।... হইচই করলাম না।... তোমার কাছে নাম্বার ছিল। কিন্তু পুলিশে খবর... দিলাম না। ... অনেকে হয়ত বলবেন আমাদের অভিমান। ... বলুক। কিন্তু বাড়িঅলা... ঠিকই শাস্তি পাবে...।
নুসরাত তাকানোর চেষ্টা করল। পারল না।
ভাবো- আমরা মরে পড়ে থাকব।
হুম...।
একসময় না... একসময়... তালা তো খুলবেই, না?... কী দেখবে?... দেখবে... আমরা মরে পোঁচে আছি... গন্ধ ছড়াচ্ছি... নুসরাত... বাড়িঅলার কী অবস্থা হবে তখন?
কী অবস্থা... রমিজ?
তার বাড়িতে দুই করোনা রোগীর পচা লাশ... কে আসবে... কে... সরাবে লাশ?
কে?
কেউ না।
ও।
বাড়িঅলার মাথায়... বাজ পড়বে।... তার অবস্থা ভেবে... আমার হাসি পাচ্ছে।... নুসরাত, বাড়িঅলার কথা ভেবে... হাসবে একটু?
হয়তো রমিজ ও নুসরাত হাসবে। কিন্তু তাদের হাসি ঠিক হাসির মতো দেখাবে বা শোনাবে না।

আরও পড়ুন,

করোনাকালের রোজনামচা (পর্ব: ০৪)

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন