বিজ্ঞাপন

সফটওয়্যার ডেভেলপার থেকে ঘি-মাখনের ব্যবসায়ী!

July 24, 2020 | 1:22 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আনিকা ফাহমিদা। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নিয়ে পড়ালেখা করেছেন। পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার। সারাদিন কম্পিউটারের স্ক্রিনে নানারকম প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের খটোমটো কোডিং-ডিকোডিংয়েই সময় কাটছিল। ইন্টার্নশিপের জন্য স্কলারশিপও মিলেছিল ভারতের হিমাচলে, আইআইটিতে। চাকরি ছেড়ে বিদেশ-বিভূঁইয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে শরীর মানিয়ে নিতে পারেনি। ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ততদিনে করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্ব। থাকতে হলো ঘরে বসে। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত ঘরে বসে থাকেননি আনিকা। পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার হলেও পারিবারিকভাবে ছিল ব্যবসার ঐতিহ্য। সেটাকেই বেছে নিলেন করোনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবিকার লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে, তবে সময়ের সঙ্গে আধুনিকতায় মিলিয়ে। ‘মুসলিম ঘৃত ভাণ্ডার’ নামে অনলাইনে শুরু করলেন ব্যবসা। সফল তাতেও। সফটওয়্যার প্রকৌশলী আনিকা তাই এখন ঘি-দই-মাখনের ব্যবসায়ী!

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিডিওএসএন) একটি প্ল্যাটফর্ম ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেবো’। এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে ১৭ জুলাই শুরু হয়েছে ই-উদ্যোক্তা হাট। সেই ‘হাটে’ই নিজের পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছেন আনিকা। সেই সুবাদেই জানা গেল আনিকার সফটওয়্যার ডেভেলাপার থেকে ঘি-মাখনের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প।

বিজ্ঞাপন

আনিকার নিজ মুখে শুনি তিনি কী বলেন— ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবরে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি অনার্স শেষ করি। রেজাল্টের আগেই একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে ‘সফটওয়্যার ডেভেলপার’ পদে যোগ দিয়েছিলাম। দু’বছর পর দেশের স্বনামধন্য একটি কোম্পানিতে ছয় মাস ফ্রি ইন্টার্নশিপ শেষে চাকরি হয় ‘জুনিয়র সফটওয়্যার ডেভেলপার’ পদে। একবছরেরও ১ বেশি সময় চাকরি করি। হঠাৎ করে আমাদের সবার স্যালারি আটকে যায়। স্যালারি না পেলেও চাকরি করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে জানতে পারলাম, ‘স্বনামধন্য’ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে একটি প্রতারক কোম্পানি।

আনিকা বলেন, ওখানে ফ্রি ইন্টার্নদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিজেরা টাকা ইনকাম করে। কিন্তু কর্মীদের বেতন দেয় না। সবকিছু জানার পর প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে চার মাসের স্যালারি বাকি রেখেই গত বছরের মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেই। তবে, চাকরি করতে করতেই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি শুরু করে তা সফলভাবে শেষও করেছিলাম। কিন্তু চাকরির এই ধোঁকাবাজির ঘটনায় নতুন করে চাকরির জন্য পরিবার সহসাই আর সাপোর্ট দেয়নি।

অবশ্য এরপর আনিকাকে তেমন একটা সময় বসে থাকতে হয়নি। ভারতের হিমাচলে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মানডি (আইআইটি মানডি)’তে থাকা-খাওয়াসহ ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পান ইন্টার্ন করার জন্য। সেখানেই পিএইচডি করার ইচ্ছে নিয়ে ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর হিমাচলে পাড়ি জমান। কিন্তু বিধি বাম। ইন্টার্নশিপের শেষভাগে গিয়ে হিমাচলের প্রচণ্ড ঠান্ডা আর মানডি’র পাহাড়ি রাস্তায় চলাচলের ফলে মোশন সিকনেস আর উচ্চ রক্তচাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন আনিকা। এর মধ্যে শুরু হয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। শেষ পর্যন্ত ইন্টার্নশিপ শেষ করার আগেই ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

এদিকে, দেশে আসার কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। চাকরি বা অন্য কিছু করার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই ‘সাধারণ ‍ছুটি’র ঘোষণায় ঘরে বসে পড়তে হয়। আনিকা বলেন, করোনার এই সময়ে নতুন চাকরি পাওয়া আর নতুন কিছু শুরু করা অনেক কঠিন ছিল। তবে লেখাপড়া করে বেকারত্বকে মেনে নেওয়ার মতো মানসিক শক্তি বা ইচ্ছা কখনোই ছিল না। তাই সবসময় ভাবছিলাম কী করা যায়।

আনিকার বাবা-ভাই সবাই ব্যবসায়ী। পূর্বপুরুষের সবাইও ব্যবসায়ী ছিলেন। পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যেও ব্যবসা করার প্রবণতার কারণেই কেউ তেমন একটা পড়ালেখাও করেননি। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান আনিকাই স্বজনদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্য রক্তেই ছিল। তাই সফটওয়্যার ডেভেলপার হয়েও যখন করোনার কারণে ঘরে বসে থাকতে হচ্ছিল, তখন তিনি ব্যবসাকেই বেছে নিলেন এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে।

আনিকা বলেন, নিজের শেখা বাস্তবিক জ্ঞান আর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আর আমাদের পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্য অনুসরণ করেই অনলাইনে ‘মুসলিম ঘৃত ভাণ্ডার’ চালু করি। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আমার উদ্যোগ শুরু করি এ বছরের এপ্রিলে। তবে আমাদের পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে কিন্তু এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটা আমার মা, ছোট বোন আর আমার মিলিত উদ্যোগ।

মায়ের সমর্থনের কথা বারবার উল্লেখ করেন আনিকা। বলেন, আমাদের ছোটবেলায় আমার মা বুটিকসহ হাতে তৈরি নানা পণ্যের ব্যবসা করতেন। তখন তো অনলাইন ছিল না, অফলাইনেই করতেন। এখন মায়ের সেই আগের শক্তি নেই। কিন্তু তার স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছাটা ছিল বরাবরই। করোনায় আমার বেকারত্বের সময়ে মা’ই আমাদের বাসা থেকেই কিছু করার পরামর্শ দেন। প্রাথমিকভাবে ঘি, মাখন, দই বানানোর জন্য দুধের ক্রিম আর দুধ কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। পরিবারের অন্য কেউ বাধা দেয়নি, বরং মানসিকভাবে সমর্থনই দিয়েছেন। রোজার ঈদের পর কাজের সুবিধার্থে একজন কর্মীও নিয়োগ দিয়েছি আমরা। আর এই মাসেই আমাদের পণ্য তৈরির জন্য দুধের ক্রিমের চাহিদা মেটাতে আর ফ্যাট ফ্রি টক দইয়ের দুধ ভেঙে ক্রিম আলাদা করার জন্য একটা হাতে চালানোর উপযোগী মেশিনও কিনেছি।

বিপণনের জন্য পণ্য তৈরি করলেও সেগুলোর মানে কোনো ধরনের আপস করেন না আনিকা। ‘যেসব পণ্য আমরা গ্রাহকের হাতে তুলে দেই, সেই একই পণ্য বাসায় বাচ্চাসহ আমরা নিজেরাও খাই। আমাদের পণ্যগুলোর মধ্যে গাওয়া ঘি, মাখন আর টক দইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি,’— বলেন তিনি।

আনিকা জানালেন পণ্য উৎপাদন ও অর্ডার নিয়ে সমস্যা না হলেও সরবরাহ নিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে। ঘি সময় নিয়ে সরবরাহ করা যায় বলে এর অর্ডারে সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু টক দই ও মাখন ইনস্ট্যান্ট ডেলিভারি দিতে হয়। কিন্তু এরকম ইনস্ট্যান্ট ডেলিভারি করার মতো কুরিয়ার না পাওয়ার কারণে এসব পণ্যের অনেক অর্ডার ক্যানসেল করে দিতে হচ্ছে তাকে। তিনি বলেন, শুধু ঢাকার মধ্যে আমার এলাকার আশপাশের ৮ থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কখনো নিজেরাই, আবার কখনো পরিচিত বাইক রাইডার আর সাইকেলে এক বন্ধুর মাধ্যমে পার্সেল পাঠাই। এছাড়া, ডেলিভারির স্থানের ওপরে নির্ভর করে আমরা গ্রাহকদের জন্য কখনো ডেলিভারি চার্জ হাফ ফ্রি, কখনো ফুল ফ্রি করে দিয়েছি।

নতুন আরও পণ্য এই ব্যবসায় যোগ করতে চান আনিকা। আর ‘গাওয়া ঘি’কে করতে চান সিগনেচার পণ্য, সেটি বাজারজাত করতে চান বাজারের অন্য সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে। আর প্রধান লক্ষ্য, সব পণ্যেরই গুণগত মান ধরে রেখে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া। আনিকা বলেন, মুসলিত ঘৃত ভাণ্ডারকে দেশীয় ও মানসম্মত পণ্যের একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আজীবন খাঁটি পণ্যটিই গ্রাহকদের সরবরাহ করতে চাই। এই লক্ষ্যের পথে এগিয়ে যেতে পারলে কেবল আমার নিজের নয়, ছোট বোনটাকেও চাকরি-বাকরি নিয়ে ভাবতে হবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার মা যে স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন, তার সেই স্বপ্নটাও পূরণ হবে।

পারিবারিক ব্যবসার যে ঐতিহ্য রক্তে মিশে আছে, তার সঙ্গে প্রকৌশলীর মেধা ও মনন আনিকাকে লক্ষ্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে নিশ্চয়।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন