বিজ্ঞাপন

‘করোনাকালে ভেঙে যাচ্ছে নারীর মনোবল’

July 28, 2020 | 12:19 am

রোকেয়া সরণি ডেস্ক

যুগ যুগ ধরেই চলছে নারীর যুদ্ধ। যুদ্ধ করেই নারী আজ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। সেই যুদ্ধ এই করোনাকালে কী রূপ ধারণ করল? তা কি কমেছে—নাকি বেড়ে গেছে বহুগুণে। এমন সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয় সারাবাংলা লাইটহাউজের সাম্প্রতিক আলোচনায়।

বিজ্ঞাপন

রোববার (২৬ জুলাই) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘করোনাকালে নারীর যুদ্ধ’। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. মেখলা সরকার। সঞ্চালনায় শবনম আযীম।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শবনম আযীম বলেন, ‘করোনাকালে নারীর কাজের চাপ বেড়েছে বহুগুণ। কর্মজীবী নারীকে ঘর ও বাইরে দুইই সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অফিস সামলানোর পাশাপাশি ঘরের প্রতিটি সদস্যের দেখাশোনাও তাকেই করতে হয়। এভাবে কি নারী নিজের জন্য সময় বের করতে পারছেন? তার মানসিক অবস্থাই বা কেমন। হোম অফিসের কারণে আট ঘণ্টার থেকে অনেক বেশি অর্থাৎ আট থেকে ১২ ঘণ্টা অফিস করতে হচ্ছে। সারাক্ষণ এই যে অনলাইনে থাকা এতে কি নারীর কাজের চাপ বাড়ছে না?

বিজ্ঞাপন

ডক্টর মেখলা সরকার বলেন, ‘এই অতিমারিতে মানুষের উদ্বিগ্নতা অনেক বেড়েছে, কমে গেছে ধৈর্য। ফলে একে অন্যের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা কমে গেছে। করোনার কারণে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে বেড়েছে রাগ এবং হতাশা। এই হতাশার প্রকাশ আমরা কোনো না কোনোভাবে করছি। যার শিকার হচ্ছে তুলনামূলক দুর্বল নারী এবং শিশু। তাদের ওপর সহিংসতাও বেড়ে গেছে এই কারণে।’

‘সবাই অর্থনৈতিক সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছি। ঘরে নারীর কাজ বেড়েছে দ্বিগুণ। বেড়েছে শ্রম বৈষম্য। নারীকে একইসঙ্গে ঘর ও বাইরের কাজ সামলাতে হচ্ছে। পরিবারের সবার দেখাশোনা, তাদেরকে ভালো রাখা, সন্তানের পড়াশোনা, বাইরে থেকে কেউ আসলে তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাসহ সবই করতে হচ্ছে নারীকে একা হাতে। এভাবে নারীর নিজের জন্য কোনো সময় নেই’—বলেন মেখলা সরকার।

কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল মানুষ, নারীরা। তারাই শ্রম দিয়ে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করেছে ও বাংলাদেশকে দারিদ্র সীমা থেকে উঠিয়ে এনেছে। কিন্তু এখন করোনার কারণে নারীরা সবচেয়ে বেশি চাকরি হারাচ্ছে ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হতে শুরু করেছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে শুরু করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবসময়ই নারীর ওপরেই পড়ে ঘর সামলানোর দায়িত্ব। এমনকি কর্মজীবী নারীকেও বাইরে পাশাপাশি ঘরের কাজ সামলাতে হয়। নারীর কাজের কোনো সময় বিভাজন নেই। কর্মজীবী হোন, কি গৃহিণী তাদের সবাইকেই ঘরের কাজ একা হাতে সামলাতে হয়। এভাবে সে নিজেকে সময় দিতে পারছে না। না পারছে ঠিকমত বিশ্রাম নিতে। এভাবে কী নারীর মানসিক স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ছে না?’

মেখলা সরকার বলেন, ‘পরিবারে নারীর ব্যক্তিগত সময়ের বিষয়ে আমরা যত্নশীল নই, তাই তারা সাফোকেট হচ্ছেন। নারী স্ট্রেস রিলিফের সুযোগ পাচ্ছেন না। বাইরে গেলে মানুষের স্ট্রেস রিলিফ হয়। একজন কর্মজীবী নারীকে সারাক্ষণ ঘরে থাকতে হয়, তাই তিনি সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। টানা কাজের ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপ কমানোর জন্য কাজের প্রশংসা এবং স্বীকারোক্তি প্রয়োজন হয়। তা না পেলে নারী নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। এভাবে কমে যাচ্ছে তার কাজের গতি। বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে তার মানসিক স্বাস্থ্যে। সাধারণত স্ট্রেস রিলিফ না করলে অথবা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিচিতি না পেলে নারীর জন্য একই গতিতে কাজ করে যাওয়া মুশকিল।’

রিয়াজুল হক বলেন, ‘এখন পরিস্থিতিই এমন যে, ঘরে ও বাইরে একই গতিতে কাজ করার ফলে নারীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার ঘরে-বাইরে অনেক বেশি কাজ করেও নারীর মূল্যায়ন কম, মর্যাদা কম। বলতে গেলে নারীর ২৪ ঘণ্টাই কর্মঘণ্টা। সে কোন ফাঁকে একটু ঘুমিয়ে নেয়, তাও দেখা যায় না। নারীর এসব কাজের চাপের প্রভাব সন্তানদের ওপর পড়ে।

এই যে এত চাপ। এসব সামলাতে করোনাকালে নারী কিভাবে নিজের যত্ন নেবেন?

এ প্রশ্নের জবাবে রিয়াজুল হক বলেন, ‘সমাজ নারীদেরকে দুর্বল এবং অবলা ভাবতে শেখায়। এভাবে তাদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়। কিন্তু নারীরা প্রতিবাদ করতে পারে এবং তাদেরকে প্রতিবাদ করতে শেখাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে নারীরা। কিন্তু সেই নারীদেরকেই আমরা এখনো দুর্বল হিসেবে দেখি। সমাজ তাদের দুর্বল বলে বলে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য করছে। পরিবারে ছেলে সন্তানের মতামতের গুরত্ব দেওয়া হলেও মায়ের কথাও অনেক সময় শোনা হয় না। এভাবে পরিবার তো বটেই সমাজেরও নানা পর্যায়ে নারীরা কথা বলার সুযোগ পান না। রাষ্ট্র ও সমাজের উচ্চ পর্যায়ে নারী থাকার পরেও তারা পাচ্ছে না।’

‘নারীর যোগ্যতা কোনো অংশেই কম না। তাদেরকে ঘরে বাইরে সব জায়গায় কথা বলতে দিতে হবে নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ে আনতে হবে। মানুষ হিসেবে নারীর মূল্যায়ন করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর মতামতের গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’

এই বিষয়ে মেখলা সরকার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেয়েদেরকে গড়ে তোলা হয় মাতৃত্ব এবং মা কত মহান তা বলে। তাদের শেখানো হয় নারীরা কত সহনশীল, নারীরা সব পারে এসব বলে। তাই নারীরা পারুক বা না পারুক, নিজেকে মহান দেখাতে সবকিছু নিজের কাঁধে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে নারীকে নিজেকে বের হতে হবে এবং অন্য নারীদের জন্য এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিতে হবে। সারাদিনে ১০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা হলেও নিজের জন্য সময় বের করতে হবে। সেই সময়ে নিজের ভালো লাগার কাজ করতে হবে। বই পড়া, টিভি দেখা, পছন্দের কারও সঙ্গে কথা বলা, অথবা গান শোনা অথবা চুপচাপ বসে থাকা- এমন কিছু করা যাবে।’

‘পরিবারের অন্য সদস্যদের ভালো রাখতে চাইলেও তার ভালো থাকা জরুরি। মহৎ হওয়ার লোভ সামলাতে হবে। সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকে দায়িত্ব নিতে শেখাতে হবে এবং পরিবারের অন্যরা যেন তাদের কাজটি ঠিকঠাকমতো করে নারীর ওপর চাপ কমায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

এছাড়া তিনি বলেন, ‘ঘরবাড়ি অত্যন্ত গোছানো, রান্নাঘর তকতকে রাখতে হবে, এমন চাপ নেওয়া যাবে না। যে যতটুকু পারে ততটুকুই করতে হবে। এসব চাপ নিলে মানসিক সমস্যা বাড়বে। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা ঝগড়া করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। ঠান্ডা মাথায় সুন্দর করে সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হবে।’

সারাবাংলা/আরএফ/এমআই

বিজ্ঞাপন

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন