বিজ্ঞাপন

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় গবেষণানির্ভর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ

July 30, 2020 | 2:37 am

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের মোবাইল অপারটেররা আদর্শ না মেনে নির্দিষ্ট তরঙ্গ দিয়ে অতিরিক্ত গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে। ফলে ভয়েস কল থেকে শুরু করে মোবাইল ইন্টারনেটে নিরবচ্ছিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। এজন্য মূলত দায়ী টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। প্রতিষ্ঠানটি শুধু রাজস্ব আদায়েই ব্যস্ত, গ্রাহক বা অপারেটরদের স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত নয়। এছাড়া গ্রাহক প্রতারিত হলে বিটিআরসিতে অভিযোগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নেই তেমন শাস্তিমূলক পদক্ষেপও। একই অবস্থা ব্যান্ডইউথ বা ব্রডব্রান্ড ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রেও। আর এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে গবেষণা নির্ভর পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৭ জুলাই) বিকেলে সারাবাংলা ডটনেটের নিয়মিত আয়োজন ‘সারাবাংলা ফোকাস’ অনুষ্ঠানে ‘ভার্চুয়াল যোগাযোগ সেবা কতটা নিরবচ্ছিন্ন’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সারাবাংলা ডটনেটের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট এমএকে জিলানীর সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) পরিচালক ও শুটিং স্টার লিমিটেডের সিইও দিদারুল আলম, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ও দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী। অনুষ্ঠানটি একযোগে সারাবাংলা ডটনেটের ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও বেসরকারি টেলিভিশন জিটিভিতে প্রচারিত হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

আলোচনার শুরুতে দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী বলেন, আমাদের সঙ্গে যুক্ত একজন অতিথি প্রথমেই বলেছেন লাইনটা খুব ‘ফ্লাকচুয়েট’ করছে। উনি খুব সত্য কথা বলে দিয়েছেন। গোটা বিশ্বের যে ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা সাবমেরিন ক্যাবল। এই ক্যাবল আসলে ফিজিক্যাল ক্যাবল। সেই ক্যাবল দিয়েই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যুক্ত। বর্তমানে যেটা ওয়্যারলেস হচ্ছে, সেটা খুবই সীমিত পরিসরে। এখন বুঝতে হবে, আমাদের ফিজিক্যাল নেটওয়ার্ক যদি খুব শক্তিশালী না থাকে, মোবাইল নেটওয়ার্কও সেভাবে শক্তিশালী হবে না। বাংলাদেশে ঠিক এই ভুলটিই হয়েছে। ফিজিক্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির জায়গাটি শক্তিশালী হয়নি।

বিভিন্ন রিপোর্টের তথ্য তুলে ধরে এই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, মহামারির সময়ে কিন্তু আমাদের ব্যান্ডউইথ সংকটটা হয়নি। ব্যান্ডউইথ আমরা ভালোই পেয়েছি। কিন্তু আমাদের যারা মোবাইল ইন্টারনেট সেবা দেন, তারা যাদের কাছ থেকে ব্যান্ডইউথ নেন বা আইএসপি যারা, তাদের ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা এখনো আছে। আপনি যখন ব্যান্ডউইথ নিচ্ছেন, তখন অপারেটর বলছে ৭ এমবিপিএস দিচ্ছে। কিন্তু ডাউনলোড যখন করতে যাচ্ছেন, তখন দেখছেন কম পাচ্ছেন। আপনি যখন অডিওতে কথা বলছেন তখন ফ্লাকচুয়েট করছে। জিএসএমর রিপোর্টে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ফোরজি ব্যবহারে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। নেপালে যেখেন ২৬ শতাংশ জনগণ ফোরজি ব্যবহার করছে, আমরা সেখানে ১০ শতাংশ। আমাদের স্বপ্ন অনেক বড় কিন্তু বাস্তবতার দৌড়টা কিন্তু অনেক খাটো।

তিনি বলেন, ব্রডব্যান্ড সেবা নিয়ে জরিপ হয়নি। তবে ওপেন সিগন্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, আমাদের মোবাইল নেটওয়ার্কে ফোরজি ব্যবহারে ডাউনলোড স্পিড ধীরে ধীরে কমছে। যেটা মার্চ মাসে ছিল ৯ দশমিক ২ এমবিপিএস, সেটা মে মাসে এসে হয়ে গেছে ৭ দশমিক ১ এমবিপিএস। কমলো কেন? কারণ আমাদের মোবাইল অপারেটরদের বেতার তরঙ্গ কম। স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম হচ্ছে প্রতি ৫ লাখ গ্রাহকের জন্য এক মেগাহার্জ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ থাকতে হবে। সেখানে আমাদের শীর্ষ অপারেট গ্রামীণফোনের ২০ লাখ গ্রাহকের জন্য এক মেগাহার্জ দিচ্ছে। কানেকশনটা আপনাকে নিরবচ্ছিন্ন দেবে কী করে? যদিও গ্রামীণফোন বলে তাদের কলড্রপ হয় না, তাদের ইন্টারনেটের স্পিড ভালো, কিন্তু এগুলো বাগাড়ম্বর। তারা চাইলেও ভালো সেবা দিতে পারবে না। কারণ আপনি স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে চারগুণ পিছিয়ে পড়ে আছেন। রবি ১৩ লাখ গ্রাহকের জন্য এক মেগাহার্জ, বাংলালিংক ১১ লাখ গ্রাহকের জন্য ১ মেগাহার্জ বরাদ্দ রেখেছে। টেলিটকের কথা বাদই দিলাম। কারণ তাদের তো কাস্টমারই নেই। বড় তিনটি অপারেটর গুণগত সেবা দেওয়ার জন্য প্রথম যে শর্ত, সেটি করতেই তারা ব্যর্থ হয়েছে।

রাশেদ মেহেদী আরও বলেন, আমাদের এখানে যখন কোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেখানে উপযুক্ত গবেষণা হয়নি। কোন সেবাটিকে আমরা কোন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো সেটা হয়নি। যখন গোটা বিশ্ব থ্রিজিতে চলে গেছে, আমরা অনেক পরে এসেছি। ফোরজির ক্ষেত্রেও একই রকম হয়েছে। মোবাইল অপারেটরগুলোকে থ্রিজিতে বিনিয়োগের মাত্র দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই ফোরজিতে চলে যেতে হয়েছে। তারা কিন্তু থ্রিজি’র যে বিনিয়োগ, সেটার ব্যবসাই করতে পারেনি। ফলে ওই শিক্ষা নিয়ে তারা ফোরজিতে আর বেশি বিনিয়োগ করছে না।

বিটিআরসি’র প্রসঙ্গ টেনে রাশেদ মেহেদী বলেন, বিটিআরসি  মোবাইল অপারেটরের স্বার্থও দেখছে না, গ্রাহকের স্বার্থও দেখছে না। বিটিআরসি শুধু নিজের স্বার্থই দেখছে। বিটিআরসির প্রধান কাজ হচ্ছে টেলিকম সার্ভিসকে রেগুলেট করা। সে দেখবে মোবাইল অপারেটগুলো ঠিকভাবে সেবা দিচ্ছে কি না, তাদের ব্যবসার পরিবেশ আছে কি না, তারা ঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে কি না। আর আমরা গ্রাহকরা কোয়ালিটি অব সার্ভিস পাচ্ছি কি না। এগুলো হচ্ছে বিটিআরসির কাজ। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বিটিআরসি সেই কাজগুলো করে না। বিটিআরসির সাফল্যের গল্প হচ্ছে আমরা এত হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এনেছি। সেটা তরঙ্গের দাম বাড়িয়েই হোক, লাইসেন্সের দাম বাড়িয়েই হোক কিংবা অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স দিয়েই হোক। তারা রেগুলেটর থেকে রেভিনিউ কালেক্টর হয়ে গেছে।

বেসিস পরিচালক দিদারুল আলম বলেন, আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি। আপনি যখন বড় ধরনের স্বপ্ন দেখেন, তখন তা বাস্তবায়ন করতে যা প্রয়োজন তা যদি ঠিকমতো কাজ না করে তাহলে স্বপ্নই ভেস্তে যাবে। তথ্যপ্রযুক্তির যে বিকাশের কথা আমরা ভাবছি, তা বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই আমাদের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ থাকতে হবে। ইন্টারনেটের গতি থাকতে হবে। সরকার ও বেসিসের পক্ষ থেকে কাজ চলছে। কানেক্টিভিটি নিয়ে আমাদের অনেক কাজ করার আছে। কারণ কানেক্টিভিটি এখন মেজর কনসার্ন হয়ে গেছে। কারণ আমি নিজেই কিশোরগঞ্জ থেকে এখন ভুক্তভোগী। টার্গেটের সঙ্গে যে মাইলস্টোন, সেটি আমাদের সেট করতে হবে। যেটি অপরিহার্য সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগেও ইন্টারনেট বা ডিজিটাল শব্দটি এমন ছিল না। আর এগুলো কিন্তু রাতারাতি হবে না। নেপালের অপারেটররা যতটা সচেতন, আমাদের এখানের অপারেটরা গ্রাহক স্বার্থের ক্ষেত্রে ততটা সচেতন নয়। এর কারণ হচ্ছে আমাদের এখানকার জনসংখ্যা। ‘আমি যা দেখি তুমি তা দেখ কি না’— এই বিষয়টি থাকতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় জায়গাটি হচ্ছে কানেক্টিভিটি। একে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে দেখা হচ্ছে, টেলকো অপারেটরগুলো হয়তো সেভাবে দেখছে না। সার্ভিস ডেলিভারির ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা আছে। কিশোরগঞ্জের কথাই যদি বলি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এখানে ছিলেন এবং আছেন। তারপরও শহর থেকে এক-দুই কিলোমিটার বাইরে গেলেই আর কানেক্টিভিটি থাকে না। এটি কিন্তু খুবই দুঃখ পাওয়ার মতো বিষয়।

বেসিসের এই পরিচালক বলেন, কোনো এলাকায় কতো জনগোষ্ঠী একসঙ্গে ইন্টারনেট চালায়, সেটা প্রোপার অ্যানালাইসি করে ওই এলাকায় কত মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দ প্রয়োজন, সেখানে ইন্টারনেটের গতি কতটা দেওয়া দরকার— এগুলোর ডিটেইল ম্যাপিং করে দেওয়া হলে হয়তো আমরা আরও নির্বিঘ্ন ইন্টারনেট সেবা পেতাম। বিটিআরসি এটা করতে পারলে ভালো হয়। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দুর্বলতা আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি। সব জায়গা থেকে সব পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। সব পলিসি যে বাস্তবায়ন হবে বা শতভাগ বাস্তবায়ন হবে, তা নয়। তবে আমাদের পলিসি রিসার্চ খুবই দুর্বল। আমাদের পলিসি বেজড রিসার্চ নিয়ে কাজ করতে হবে। রিসার্চ বেজড পলিসি নিয়ে কাজ করতে হবে।

ক্যাব ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ইন্টারনেটের গতি বা এ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরেও অনেক সমস্যা আছে। বিদ্যুৎ অনেক জায়গায় সমস্যা করছে। করোনার কারণ অ্যাকসেসরিজের দাম বেড়ে গেছে। সব জায়গা অনলাইন হচ্ছে। গ্রামে যারা আছে, তারা কিন্তু শহরের সুবিধা পাচ্ছে না। ইন্টারনেটের যে দাম, একজন সাধারণ গ্রাহক কিন্তু তা দিয়ে সেই সেবা পাচ্ছে না। এই যে এখন পুরো দেশের কার্যক্রম অনলাইনে চলে গেছে, এখন ইন্টারনেট যদি ফ্লাকচুয়েট করে, তাহলে মানুষ কাজ করবে কিভাবে?

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মনোবৃত্তি অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ। মোবাইল অপারেটরগুলো যে ধরনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, বাস্তবে তা হচ্ছে না। অফারের নামে প্রতারণা চলছে। একটা বড় ফাঁকি রয়েছে। বিটিআরসি অনেক উদ্যোগের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তা দেখছি না। আমাদের মনে হয় বিটিআরসির কাজ শুধু অপারেটরদের পক্ষেই। আমরা ভেবেছিলাম বিটিআরসি ভোক্তাকেও দেখবে, অপারেটরকেও দেখবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি মিলছে না। উনারা সবসময় ব্যবসায়ীদের কথাই চিন্তা করে থাকে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা বলেন, বিটিআরসিতে একটি বড় ফান্ড পড়ে আছে। আমরা বলেছিলাম ওই ফান্ডের অর্থ দিয়ে ভোক্তাদের সচেতন করা হোক। আরও বেশি মেসেজ দেওয়া হোক, প্রশিক্ষক দেওয়া হোক। কিন্তু সেটি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বিটিআরসিকে আমরা রেগুলেটরি বডি হিসাবে দেখতে চাই। তারা অপারেটরগুলোর ব্যবসা দেখবে, একইসঙ্গে ভোক্তাদের স্বার্থও দেখবে। মোবাইল অপারেটর বা আইএসপি সার্ভিস যারা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। হয়রানি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগের কথা কিন্তু আমরা অনেকবার বলেছি। কিন্তু রেসপন্স আসেনি। এখন কোনো আইএসপি’র বিরুদ্ধে বা মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে আপনি কোনো অভিযোগ আনতে পারবেন না। ভোক্তা অধিকার এমন সুযোগ তৈরি করেছিল। পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গুণগত সেবা না পেলে আমাকে তো অভিযোগ করার জায়গা দিতে হবে। সেই জায়গা তৈরি না হলে সমস্যার উত্তরণ ঘটবে না।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন