বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামে ঈদের আগমুহূর্তে হাটে ‘মানুষ আছে, গরু নেই’

July 31, 2020 | 7:18 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চাহিদা থাকলেও ঈদুল আজহার আগেরদিন চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বাজারে কোরবানির গরুর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শেষমুহূর্তে আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে কিছু ছোট গরু বাজারে এলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কোরবানির পশুর বাজার শুরু হবার পর ক্রেতারা বিক্রেতার আশায় পথ চেয়ে থাকলেও শেষদিকে এসে বরং ক্রেতাদেরই গরুর জন্য হাহাকার করতে হচ্ছে। নগরীর বাজারগুলোতে গরু না পেয়ে অনেকেই ছুটেছেন গ্রামের বাজারে ও খামারে। এজন্য এবার শহরের চেয়ে গ্রামের বাজারে ক্রেতার ভিড় বেশি। তবে সেখানেও ক্রেতার চেয়ে গরু কম।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, প্রতিবছর কুষ্টিয়া-চাপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ কোরবানির গরু আসতো, এবার এর অর্ধেকও আসেনি। এর ফলে শেষমুহূর্তে বাজারে কোরবানির গরুর সংকট তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামে পশু কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল প্রাণিসম্পদ বিভাগ, বাজার পরিস্থিতি দেখে তারা বলছে, এবার সেই পরিমাণ পশু কোরবানি হবে না। তবে খুব বেশি হেরফেরও হবে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এবার কোরবানির গরুর চাহিদা কম হবে মনে করা হলেও শেষদিকে মানুষের আগ্রহে তেমন ঘাটতি চোখে পড়ছে না।

গত ২৩ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে সাতটি বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি স্থায়ী ও চারটি অস্থায়ী বাজার।স্থায়ী বাজারগুলো হচ্ছে- সাগরিকা পশুর বাজার, বিবিরহাট গরুর হাট ও পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। অস্থায়ী চারটি বাজার হচ্ছে- কমল মহাজন হাট পশু বাজার, সল্টগোলা গরুর বাজার ও ৪১ নম্বরওয়ার্ডে বাটারফ্লাই পার্কের দক্ষিণে টিকে গ্রুপের খালি মাঠ এবং কর্ণফুলী পশুর বাজার।

বিজ্ঞাপন

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ও বেপারিদের মতে, শুরুতে সবচেয়ে বড় পশুর বাজার সাগরিকা এবং বিবিরহাটসহ অন্যান্য বাজার মিলে লাখখানেক গরু উঠেছিল। তিন-চারদিন পর সেটা দ্বিগুণ হয়। বিক্রিও হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার থেকে এসব বাজারে গরুর পরিমাণ কমতে শুরু করে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) দুপুরে বিবিরহাটে গরু ছিল সব মিলিয়ে একশটির মতো। সাগরিকা বাজারে ছিল হাজারখানেক। গরুর সংকট দেখে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা এবং ইজারাদাররা মিলে আশপাশের জেলা-উপজেলার বাজার থেকে কিছু ছোট গরু নিয়ে আসতে সক্ষম হন। বিকেলে কয়েকটি ট্রাকে সাগরিকা বাজারে কিছু ছোট গরু আসতে দেখা গেছে। একইসময়ে বিবিরহাট ও সাগরিকা বাজারে ঘুরেও পছন্দমতো গরু না পেয়ে কিংবা বাড়তি দাম দেখে ফিরে যেতে দেখা গেছে অনেক ক্রেতাকে। শুক্রবার দুপুর থেকে নগরীর বিভিন্ন বাজারে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

নগরীর কাজির দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল আউয়াল সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রথমে সাগরিকা বাজারে যাই। সেখানে কয়েকটা ছোট গরু দেখেছি। বিবিরহাট বাজারে গেছি, সেখানে গরুই নেই। কর্ণফুলী বাজারে এসে দেখি, গরুর চেয়ে মানুষ বেশি। পটিয়া গেছি, সেখানেও গরু পাইনি। এখন চন্দনাইশের গাছবাড়িয়ায় যাচ্ছি। পাবো কি না জানি না।’

বিকেল ৫টার দিকে মীরসরাই থেকে ট্রাকে আসা কয়েকটা ছোট গরুর মধ্যে একটি ৫৩ হাজার টাকায় কেনেন নগরীর টেরিবাজার এলাকার বাসিন্দা তারেকুল হাবিব। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজারে-বাজারে দৌঁড়ানোর শক্তি নাই। সেজন্য দাম যা বলেছে, তাই দিয়ে কিনে নিয়েছি।’

সাগরিকা বাজারের ছোট গরুর বেপারি মোহাম্মদ ফজলু সারাবাংলাকে বলেন, ‘ট্রাকে করে কুমিল্লা-নোয়াখালী থেকে ১৪টি গরু এনেছিলাম। ট্রাক থেকে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে গেছে।’

চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা বেপারি আমিরুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি মাত্র পাঁচটি গরু এনেছিলাম। এগুলো তো আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। মানুষ এমনভাবে গরু কিনবে, ভাবতেও পারিনি। না হলে আরও বেশি গরু আনতাম।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেয়াজুল হক সারাবাংলাকে জানান, সাতকানিয়া, মীরসরাই এবং ফটিকছড়ি উপজেলা ও ফেনী-কুমিল্লায় যোগাযোগ করে ১০ হাজারের মতো ছোট গরু বাজারে আনতে পেরেছেন। কিন্তু হঠাৎ এত চাহিদা হবে, সেটা বেপারিরা বুঝতে পারেননি। তবে গ্রামের হাটগুলোতে প্রচুর গরু ছিল। সেখানেও লোকজনের ভিড় ছিল।

‘বিকেলে আমাদের টিম মীরসরাইয়ের আবু তোরাব বাজারে গিয়ে প্রায় ৩০০ গরু অবিক্রিত দেখতে পায়। নিজামপুর বাজারেও দেড় শতাধিক গরু দেখতে পায়। সেখান থেকে কিছু গরু ট্রাকে করে সাগরিকা বাজারে পাঠানো হয়। মীরসরাই, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি থেকে গরু পাঠানো হয়েছে সাগরিকায়। কুমিল্লা-ফেনী থেকেও গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে এত ক্রেতা, চাহিদা সামাল দেওয়া আসলেই সংকট হয়ে গেছে।’ বলেন রেয়াজুল হক

জেলা প্রাণি সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানিতে চট্টগ্রাম জেলায় পশুর চাহিদা ৭ লাখ ৩১ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলায় ৮ হাজারের মতো খামার থেকে ছয় লাখ ৮৯ হাজার ২২টি পশু আসবে ধরা হয়েছিল। এসব পশুর মধ্যে গরু চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭২টি, মহিষ ৫৭ হাজার ১৩১টি, ছাগল ও ভেড়া ১ লাখ ৬৭ হাজার ২১০টি। অবশিষ্ট ৪১ হাজারের মত গরু দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসবে বলে ধরা হয়েছিল।

তবে বাইরের জেলা থেকে ৪১ হাজারের অর্ধেক গরুও এবার বন্দরনগরীর বাজারে আসেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আর এতেই সংকট তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

রেয়াজুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চাপাইনবাবগঞ্জ-উত্তরের জেলাগুলো থেকে ৪১ হাজার গরু ধরা হয়েছিল। এসেছে ১০-১২ হাজারের মতো। করোনাভাইরাস নিয়ে শুরু থেকে যে নিগেটিভ প্রচারণা হয়েছে, বাজার বসবে কি বসবে না, লোকজনের হাতে টাকা নেই-তারা এবার কোরবানি দেবে না, এমন প্রচারণার কারণে বেপারিরা বিভ্রান্ত হয়েছেন। তারা সাহস করে গরু আনেননি। অথচ দেখা যাচ্ছে, কোরবানি দেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। এছাড়া এবারের খামারের গরু খামার থেকে বিক্রি হয়েছে। অনেকে গ্রামের গৃহস্থ পরিবারের কাছ থেকে কিনেছেন। শহরে যারা বাজার থেকে কেনার জন্য বসেছিলেন, তারাই শেষ মুহূর্তে সংকটে পড়েছেন।’

রাতভর কেনা-বেচায় গ্রামের বাজারগুলো থেকে চাহিদার কাছাকাছি যোগান দেওয়ার আশা করছেন এই কর্মকর্তা।

তবে পশু কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, এবার তার চেয়ে কম কোরবানি হবে বলে মনে করছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রেয়াজুল। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজারে মানুষের আধিক্য থাকলেও চাহিদা কিছুটা কমেছে। অনেকে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে আগে তিনটা গরু দিলে এবার ১টা বা ২টা দিচ্ছেন। অনেকে ভাগে দিচ্ছেন, আগে হয়ত এককভাবে দিতেন। সব মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই লাখখানেকের হেরফের হবে।’

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন