বিজ্ঞাপন

করোনা ও বন্যায় ভিন্ন মাত্রার ঈদুল আজহা

August 1, 2020 | 12:00 am

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বৈশ্বিক মহামারি ‘নভেল করোনাভাইরাস’ ও জাতীয় দুর্যোগ ‘বন্যা’র মধ্যে বাঙালি জাতির দুয়ারে পবিত্র ঈদুল আজহা হাজির হয়েছে ভিন্ন মাত্রায়। মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ এ ধর্মীয় উৎসব যখন সমাগত, ঠিক তখন করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন প্রাণ যাচ্ছে হাজারও মানুষের, আক্রান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। করোনাভাইরাসের এমন সঙ্গীন পরিস্থিতির মধ্যেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে বন্যা।

বিজ্ঞাপন

করোনার প্রভাব ঈদ পালনের অনুষঙ্গগুলোর ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। উৎসবের সেই রোশনাই, বর্ণচ্ছ্বটা ম্রিয়মাণ। কেননা, সারাদেশে এই মুহূর্তে ২ লাখ ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত। এই ভাইরাস এরই মধ্যে কেড়ে নিয়েছে ৩ হাজার ১১১ জন মানুষের প্রাণ। অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, মহানন্দা, তিস্তা, ধরলা নদীর অববাহিকায় প্রায় ৩৪টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছে কয়েক কোটি নাগরিক।

এমন বাস্তবতায় দেশের সব মানুষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঈদুল আজহা পালন করতে পারছে— এমনটি নয়। তবুও সবকিছু একেবারে থেমে যায়নি। বন্যামুক্ত এলাকা এবং করোনার ছোবল থেকে এখন পর্যন্ত যারা মুক্ত আছেন, তারা সীমিত পরিসরে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ পশু কোরবানি। এই কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ১৬টি স্থানে গরু-ছাগলের হাট বসানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেখানে গিয়ে সাধ্য অনুযায়ী পছন্দের পশু কিনছেন রাজধানীবাসী।

বিজ্ঞাপন

এদিকে দুই দুইটি দুর্যোগ মাথায় করে আসা ঈদুল আজহায় দেশবাসীকে সাহস জোগাতে, শুভেচ্ছা জানাতে রেকর্ড করা ফোন কল পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই সে অডিও বার্তা বেজে উঠছে নাগরিকদের ফোন। ওপ্রান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ, ‘আসসালামু আলাইকুম, আমি শেখ হাসিনা। বছর ঘুরে আবার পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে এসেছে। আমি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমি আশা করছি করোনাভাইরাস মহামারির সব অন্ধকার কাটিয়ে ঈদুল আজহা সবার মাঝে আনন্দ বয়ে আনবে।’

শরিয়া অনুযায়ী, প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর সাধ্য ও পছন্দ অনুযায়ী পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। আরবি আজহা ও কোরবান— উভয় শব্দের অর্থই উৎসর্গ। কোরবানি শব্দের উৎত্তিগত অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নিজেকে বিসর্জন, নৈকট্য লাভের চেষ্টা, অতিশয় নিকটবর্তী হওয়া প্রভৃতি।

বিজ্ঞাপন

সুরা হজে বলা হয়েছে, ‘এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।’ আল্লাহর বান্দারা কে কতটুকু ত্যাগ ও খোদাভীতির পরিচয় দিতে প্রস্তুত এবং আল্লাহপাকের নির্দেশ পালন করেন, তিনি তা-ই প্রত্যক্ষ করেন কেবল। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে (মুসনাদে আহমদ)। আল কোরআনের সুরা কাউসারে বলা হয়েছে, ‘অতএব, তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’ সুরা হজে বলা হয়েছে, ‘কোরবানি করার পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।’

বিজ্ঞাপন

জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যেকোনো একদিন কোরবানি করা যায়। কোরবানি করা পশুর তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-মিসকিন, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার বিধান আছে। আবার পুরোটাও বিলিয়ে দেওয়া যায়। এদিকে ৯ জিলহজ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পাঠ করা ওয়াজিব। তালবিয়াহ হলো, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, প্রত্যেক জাতির বাৎসরিক আনন্দের দিন আছে। এই দিনে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করে, একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে। ঈদ মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসব।

বিজ্ঞাপন

দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছেন।

এদিকে, প্রতিবছর সারাদেশে ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও এ বছর ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহাতেও মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে বলেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী দেশের প্রধান ঈদ জামাত জাতীয় ঈদগাহের পরিবর্তে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ঈদের নামাজ পড়বেন সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনের দরবার হলে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঈদের পর কোলাকুলি করতেও নিরুৎসাহিত করেছে। মসজিদে ঈদের নামাজ আয়োজনেও যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা স্বাস্থ্যবিধি জারি করা হয়েছে কোরবানির জন্যও। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কোরবানির জন্য পৃথক স্থান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন