বিজ্ঞাপন

কাঁচা চামড়ার বাজার: মৌসুমি ব্যবসায়ী আউট, নিয়ন্ত্রণে আড়তদাররা

August 1, 2020 | 7:38 pm

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: গতবছর সংগ্রহ করা কোরবানির পশুর চামড়ার প্রত্যাশিত দর না পেয়ে প্রায় লাখখানেক চামড়া সড়কে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ‘লোকসানের ভয়ে’ এবার আর ‘একদিনের চামড়া ব্যবসায়ীরা’ চামড়ার বাজারমুখো হননি। ফলে চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার বাজার এবার পুরোপুরিই আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি পাড়া-মহল্লা থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহও করেছেন আড়তদারদের প্রতিনিধিরাই। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার বাজার নিয়ে প্রতিবছরের ‘চার হাত চক্র’ এবার ভেঙে গেল।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (১ আগস্ট) কোরবানির পর দুপুর ১২টা থেকে নগরীর চৌমুহনী কর্ণফুলী বাজারের সামনে কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে, প্রতিবছর যেখানে কাঁচা চামড়ার বড় বাজার বসে। বেচা-কেনাও চলে দেদারসে।

তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। হাতেগোণা মাত্র ২০-২৫ জন কাঁচা চামড়ার ক্রেতা চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছেন। মাঝে মাঝে মিনিট্রাক-ভ্যানগাড়িতে চামড়া আসছে। ক্রেতা মানে আড়তদারদের প্রতিনিধিরা সেই চামড়া কিনে তুলে দিচ্ছেন ট্রাকে। চলে যাচ্ছে আতুরার ডিপোতে কাঁচা চামড়ার আড়তে। আগের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা-হাঁকডাক নেই। চামড়ার ছড়াছড়িও নেই।

কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীদের মতে, এবার কোরবানি কম হয়েছে। তাই চামড়ার পরিমাণও কম। আর পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সের তরুণ-যুবক যারা একদিনের ব্যবসায়ী হয়ে চামড়া কিনে চৌমুহনীতে বিক্রি করতে আসতেন, তাদের মধ্যে এবার চামড়া সংগ্রহের আগ্রহ নেই। এজন্য বাজারে ভিড়ও নেই।

বিজ্ঞাপন

সরকার এবার ট্যানারি মালিকদের জন্য ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ২৮ থেকে ৩২ টাকা দাম নির্ধারণ করেছে। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১০ থেকে ১২ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

চৌমুহনী বাজারের সামনে গরুর চামড়া প্রতি পিস ১৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪ শ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে না। সেগুলো অনেকটা বিনামূল্যেই দিয়ে দিচ্ছেন সংগ্রহকারীরা।

আড়তদারের প্রতিনিধি হিসেবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী মোহাম্মদ নাঈম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বড় চামড়া আমরা সাড়ে ৩ শ টাকা দরেই কিনছি। তবে কিছু চামড়ার দাম ৪ শ টাকা পর্যন্ত দিয়েছি। সর্বনিম্ন দেড়শ টাকায়ও কিনেছি।’

বিজ্ঞাপন

রবিউল ইসলাম বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৯টি বড় এবং ২টি ছোট গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছোট গরুর চামড়া ৩৮০ টাকায় এবং বড় গরুর চামড়া ৪৫০ টাকায় বিক্রির জন্য দাম দিয়েছি। আমি নিজেই পোস্তারপাড় এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে এনেছি।’

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না থাকায় এবার চামড়ার দর নিয়ে তেমন সমস্যা নেই জানান নাঈম ও রবিউল।

চট্টগ্রামে কোরবানির কাঁচা চামড়ার বাজার প্রতিবছর ‘চার হাত চক্রে’ নিয়ন্ত্রিত হতো। কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগ্রহকারীরা কাঁচা চামড়া সরাসরি আড়তদারের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। মূলত চার হাত ঘুরে কাঁচা চামড়া যায় আড়তে। প্রথমে কোরবানি দাতাদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন স্থানীয় বিভিন্ন পেশার লোকজন যাদের সাধারণত ‘একদিনের চামড়া ব্যবসায়ী’ বলা হয়। তাদের সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া জমা হয় খুচরা বিক্রির বড় আসর নগরীর চৌমুহনী এলাকায় কর্ণফুলী মার্কেটের সামনে। খুচরা বাজার থেকে সেই চামড়া কিনে নেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছ থেকে কিনে নেন আড়তদারের প্রতিনিধিরা। সেখান থেকে আড়তদার হয়ে কাঁচা চামড়া যায় নগরীর আতুরার ডিপোর মূল আড়েতে।

বিজ্ঞাপন

তবে এবার বাজার শুধু কাঁচা চামড়ার আড়তদার এবং তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণেই আছে বলে জানালেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির এডহক কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব আলমের হয়ে সংগ্রহকারী মো. আলম সওদাগর।

আলম সওদাগর সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবছর এক লাখ চামড়া রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছে। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা না বুঝে বাড়তি দামে চামড়া কিনে লস দিয়েছে। সেজন্য এবার অনেকেই আর সেই ব্যবসা করতে আসেনি। এলাকার যেসব ছেলে আগে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে আসত তারা এবার আসেনি। আর এবার চামড়ার দর নির্ধারণ হয়েছে গতবারের চেয়ে অর্ধেক। এই দামে চামড়া নিয়ে এলে গাড়িভাড়াও উঠবে না। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না থাকায় বাজার একমুখী হয়ে গেছে। এখন আড়তদার ছাড়া কেউ নেই। দাম ওঠানামা নেই।’

আলম সওদাগরের কর্মচারি মনুলাল বড়ুয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবছর ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে চেয়েছি। কিন্তু এলাকায়-এলাকায় কিছু গ্যাঞ্জাম পার্টি থাকে। সেয়ানা ছেলেরা চামড়া বিক্রি করেনি। হাজার-১২০০ টাকা দাম ধরে বসেছিল। শেষপর্যন্ত চামড়া রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছে। সেজন্য এবার গ্যাঞ্জাম পার্টির উৎপাত নেই।’

বিজ্ঞাপন

চৌমুহনীর স্থানীয় বাসিন্দা কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী মো. আইয়ূব সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার কোরবানি কম হয়েছে। লকডাউনের কারণে মানুষের হাতে টাকাপয়সা নেই। আগে আমরা ৩-৪ হাজার পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহ করেছি। এবারও সেই পরিমাণ করছি। কিন্তু বাজার থেকে তো অনেক ব্যবসায়ী আউট হয়ে গেছে। বলতে গেলে উপজেলা থেকে কোনো চামড়া আসেনি। দাম পাবে না ভেবে অনেকে চামড়া মাদরাসায় দান করে দিয়েছে।’

কর্ণফুলী মার্কেটের সাবেক সভাপতি মো. ইয়াছিনের প্রতিনিধি হিসেবে চামড়া সংগ্রহকারী মো. রাসেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবার আমরা ৮-১০ হাজার কাঁচা চামড়া কিনেছিলাম। এবার অর্ধেকও কিনতে পারিনি। বড় গরুর চামড়া কম। ছোট গরুর চামড়া বেশি। আর ছাগলের চামড়া ফ্রি দিয়ে চলে যাচ্ছে। এই চামড়া কেউ কিনছে না।’

মোহাম্মদ নাঈম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার চামড়ার দাম সবচেয়ে কম। কারণ ইয়াং ছেলেরা যারা প্রতিবছর পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে আসে তারা এবার নাই। যারা পুরাতন চামড়া ব্যবসায়ী আছে তারা আড়তদারের প্রতিনিধি হয়ে চামড়া সংগ্রহ করছেন এবং কিনছেন। কমিশনের বিনিময়ে তারা এই কাজ করছেন। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন আড়তদাররাই।’

আলম সওদাগরের মতে, কোরবানির চামড়া খুব বেশি কম হবে না। চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় এবং উপজেলায় কিছু কিছু চামড়া নিজেরাই লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করছে। আবার কিছু চামড়া সরাসরি আতুরার ডিপোতে আড়তে চলে গেছে।

চট্টগ্রামের আড়তদাররা জানিয়েছেন, এবছর চট্টগ্রাম থেকে চার লাখ গরু, এক লাখ ছাগল, ১৫ হাজার মহিষ ও ১৫ হাজার ভেড়ার চামড়া সংগ্রহের টার্গেট করেছেন তারা।

তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে গরু-ছাগল মিলিয়ে ১ লাখের মতো চামড়া কম সংগ্রহ হতে পারে বলে মনে করছেন আড়তদার সমিতির আহ্বায়ক মাহবুব আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘চামড়া কিছুটা কম হলেও ভালোই সংগ্রহ হচ্ছে। দামও ঠিক আছে। অনেকে চামড়া নিজ নিজ এলাকায় লবণ দিয়ে রাখছেন। সেগুলো পরে আড়তে আসবে।’

নগরীর আতুরার ডিপোতে চট্টগ্রামের বৃহত্তম কাঁচা চামড়ার আড়তে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেখানে কাঁচা চামড়া কেনার পাশাপাশি চলছে প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ।

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন