বিজ্ঞাপন

‘নিউ নরমাল’ এই ঈদে

August 1, 2020 | 9:55 pm

রাজনীন ফারজানা

হুট করে ল্যাপটপটা বিগড়ে গেল। এদিকে সারাদেশে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর আওতায় চলছে ডিউটি। বাধ্য হয়ে ছুটতে হলো কম্পিউটার সার্ভিসিংয়ের দোকানে। ঈদের আগের দিন। সবচেয়ে কাছাকাছি প্রগতি সরণির সুবাস্তু শপিং কমপ্লেক্স, গন্তব্য সেখানেই। মার্কেটের দুই দিকের গেটের একদিকে প্রবেশ, একদিকে বের হওয়ার রাস্তা। রোজার ঈদের আগে আগে প্রবেশ দরজায় একটি ‘জীবাণুনাশক কক্ষ’ ছিল। সেখান দিয়ে হেঁটে গেলে মোবাইল আড়াল না করলে বিপদ। কারণ, জীবাণুমুক্ত কতটুকু হচ্ছে তা নিশ্চিত না হলেও চারদিক থেকে ব্লিচিং মিশ্রিত পানি এসে ভিজিয়ে দেবে— এটুকু নিশ্চিত। রোজার ঈদের পরেও ‘জীবাণুনাশক কক্ষ’ ছিল বহাল তবিয়তে। কিন্তু এবার গিয়ে দেখি সেই কক্ষ উধাও। আবার যে প্রবেশদ্বার এতদিন শুধুমাত্র ঢোকার জন্য ছিল, সেটির একদিকে আবার দড়ি বেঁধে বের হওয়ার আলাদা পথ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গেট দিয়ে ঢোকার মুখে সাদা কভারঅল আর চশমা পরা এক ব্যক্তি হাতে পিস্তলের মতো দেখতে একটি থার্মোমিটার নিয়ে সবার তাপমাত্রা পরীক্ষা করছেন। যেহেতু এই যন্ত্র আমার কর্মস্থলে একটি আছে, তাই আমি এর সঙ্গে পরিচিত আগে থেকেই। শপিংমলের এই প্রবেশপথে সেই থার্মোমিটার চলন্ত পথিকের কপালের কাছাকাছি তাক করা হচ্ছে। রিডিং ওঠার আগেই দর্শনার্থী কাঁচের দরজা দিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছেন। ক্রেতাদেরও আগ্রহ নেই শরীরের তাপমাত্রা জানার, নিরাপত্তাকর্মীরও আগ্রহ নেই সঠিকভাবে তাপমাত্রা পরিমাপের। খালি কপালের সামনে ওই যন্ত্রটি একবার ধরার আনুষ্ঠানিকতা মাত্র!

আমার সামনের বোরখা পরা নারী পার হয়ে গেলেন হাঁটতে হাঁটতেই। গেটের নারী নিরাপত্তারক্ষী তার গায়ে একটা বোতল থেকে কিছুটা ব্লিচিং মেশানো পানি ছিটিয়ে দিলেন। সেটি দেখে আমি সাবধান হয়ে গেলাম। অকারণে জামার কোমরের একদিকে বা এক পাশের হাতে কয়েক ফোঁটা ব্লিচিং মিশ্রিত পানি নিয়ে ঘোরার কোনো মানে হয় না। আমি দ্রুত গেট পার হতে চেষ্টা করলাম। আরেক ক্রেতার দিকে থার্মোমিটার তাক করা সেই নিরাপত্তাকর্মী ছুটে এলেন দৌড়ে ছুটে এলেন আমার দিকে, ভাবখানা এমন যেন দাগী আসামি পালিয়ে যাচ্ছে লকআপ থেকে! তো তিনি ছুটে আসতে আসতেই এন্ট্রি গেটের এত কাছে চলে গেছি যে থার্মোমিটারটা ঠিকঠাক কপালে তাক করতে পারলেন না। স্বাভাবিকভাবেই কোনো রিডিংও উঠলো না। সেই জন্যই কি না চট করে ব্লিচিং পাউডার মেশানো পানির ঝাপটা ছুঁড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমিও ছুটতে থাকলেও ঠিক এড়াতে পারলাম না, জামার একদিকে কয়েক ফোঁটা ব্লিচিং মেশানো পানি নিয়ে ঢুকে গেলাম মার্কেটে।

ঈদের আগের দিন যেমন ভিড় থাকার কথা, তেমন না হলেও ভালোই ভিড়। বাচ্চা, বুড়ো, নারী, পুরুষ, তরুণ-তরুণী— ক্রেতার অভাব নেই। কারও কারও কোলে কয়েক মাসের বাচ্চাও দেখা গেল। এত ক্রেতার ভিড় দেখে লিফটে ওঠার সাহস করলাম না, এস্কেলেটর দিয়েই উঠলাম পাঁচ তলা পর্যন্ত। সেখানে শুধুই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের দোকান। সেখানেও অল্পবিস্তর ভিড়বাট্টা আছে বৈকি। লোকজন স্পিকার, মোবাইল, চার্জার ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার— এমন নানা পণ্য কিনছে। ল্যাপটপের নিরীক্ষা শেষে আমাকেও একটা কিবোর্ড কিনতে হলো। এরপর মার্কেট ঘুরে ঘুরে দেখলাম মানুষ কী কিনছে। কসমেটিকস, পোশাক, মেহেদি, গয়না, ব্লেন্ডার, থালাবাটি, চাদর-পর্দা-পাপোষসহ ঘরের নানা জিনিস কিনছে বেশি। ঢুঁ মারলাম সোনার গয়নার দোকানেও। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, বিশ্বের ইতিহাসে সোনার সর্বোচ্চ দামের এই সময়েও অল্পবিস্তর কেনাবেচা চলছে।

বিজ্ঞাপন

ঈদের আগের দিন একটা মার্কেটের পরিবেশ দিয়ে আসলে সামগ্রিক অবস্থা বোঝা যাবে না। কিন্তু যেটা বুঝলাম মানুষ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদ পালন করছে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কেউ খুব একটা চিন্তিত নয়। গত সপ্তাহে আড়ং গেলাম আগে থেকে বুকিং দিয়ে। সেখানে ক্রেতা কম হলেও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অত সচেতন বলে মনে হয়নি। এমনকি গেটেও তাপমাত্রা মাপছে, কিন্তু বলছে না কত। কাউকে ফেরাচ্ছে বলেও দেখিনি বা শুনিনি। গর্ভবতী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ ঘুরেফিরে শপিং করছে। দুই মাস আগেও মানুষের চোখেমুখে যে আতঙ্ক ছিল, তা যেন হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে।

করোনাভাইরাস— যাকে কেউ লিখছেন ‘করোনা মহামারি’, কেউ লিখছেন ‘মহামারি করোনা’। যতবার ‘মহামারি করোনা’ লেখা এডিট করতে যাই, আমি পড়ি ‘মহামতি করোনা’। সে করোনা মহামারি হোক কি মহামতি হোক— প্রায় পাঁচ মাস পরে এসে করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ যেন গুরুত্ব হারাচ্ছে দেশে। এর জন্য কে দায়ী, সেই বিচার করার চেষ্টা করব না। কিন্তু এই যে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না, এর ফলে কী দাঁড়াচ্ছে? আগে মৃত্যু সংবাদ শুনতাম দূরের লোকের। এখন নিজের ঘরে এসে হানা দিতে শুরু করেছে। এই চার মাসেই নিজ পরিবারের সদস্যসহ করোনায় মারা গেলেন অনেক পরিচিত মানুষ।

এমনই বাস্তবতায় এলো ঈদুল আজহা, যাকে আমরা কোরবানির ঈদ বলি। আজও সারাদেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২১ জন। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৯৯ জন, সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ১১৭ জন। আর গত সাত দিনে মারা গেছেন ২৫৮ জন, মোট আক্রান্ত ১৮ হাজার ৬৮২ জন, সুস্থ হয়েছেন ১৪ হাজার ১৬৩। অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহে নতুন করে ‘অ্যাকটিভ কেস’ বেড়েছে ৪ হাজার ২৬১টি। এছাড়াও আমরা নানা মাধ্যমে জানতে পারছি, অনেকেই আছেন যারা অ্যাসিম্পটমেটিক, অর্থাৎ করোনায় আক্রান্ত হলে লক্ষণ প্রকাশিত নয়। এসব মানুষ নির্ধিদ্বায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আসছেন অনেকের সংস্পর্শে। এই সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, তারা আক্রান্ত হলেও অসুস্থ হয়ে পড়বেন না হয়তো, কিন্তু  কো-মর্বিড রোগী ও বয়স্ক যারা আছেন, তাদের জন্য নিশ্চয় তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি।

বিজ্ঞাপন

এখন অনেকেই বলবেন, মৃত্যুহার এত কম, তবুও কেন করোনার ভয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে বা চলাচল সীমিত করতে হবে বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে? স্বাস্থ্যবিধি আসলে এই জন্য মেনে চলতে হবে যেন দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে করোনার কারণে একজন ক্যানসার সাইভারভারকে সঙ্গিহীন হয়ে যেতে না হয়, যেন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে হাই-ফ্লো অক্সিজেনের অভাবে পঞ্চাশোর্ধ্ব মাকে না হারায় একমাত্র সন্তান, যেন সত্তরোর্ধ্ব সুস্থ-সাবলীল মাকে গভীর রাতে হার্ট অ্যাটাকে হারাতে না হয় কোনো সন্তানের। সব থেকে বড় কথা— এই করোনা মহামারির কারণে সামাজিক দূরত্ব মানতে গিয়ে শারীরিক যে দূরত্ব, তা যেন আর দীর্ঘস্থায়ী না হয়। চিকিৎসক দম্পতি যেন নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে পারেন। সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেন তাদের মানসিক অশান্তিতে ভুগতে না হয়। সারাক্ষণ আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে ভুগতে না হয় যেন স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যাংকার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, প্রশাসনসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষদের।

ঈদের দিন আমরা আনন্দ উদযাপন করলেও যেন ভুলে না যাই তাদের কথা, স্বজন হারানোর বেদনায় ঈদ আসেনি যেসব পরিবারে। ভুলে না যাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিজ নিজ দায়িত্বের কথা। আমাদের লক্ষ্য হোক, মৃত্যুর মিছিল যেন ২১ থেকে কমতে কমতে শূন্যতে নেমে আসে।

কোরবানির ঈদের অন্যতম তাৎপর্য পশু কোরবানির মাধ্যমে মনের পশুত্বকে বধ করা। আমরা যেন সেই শিক্ষার কথা ভুলে না যাই। গত কয়েকদিন করোনা মহামারি ঘিরে স্বাস্থ্যখাতে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে— আমরা আসলে মনের পশুকে কুরবানি দিতে খুব একটা প্রস্তুত নই। করোনাভাইরাস পরীক্ষায় ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়া রিজেন্ট ও জেকেজির দুর্নীতির চিত্র উঠে আসার পর এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা আটক হয়েছেন— এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু তাদের এসব কার্যক্রমে যারা সহায়তা দিয়েছেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তারা কিন্তু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে! আমাদের প্রত্যাশা— তাদেরও চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং সাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়— কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিদিনের বুলেটিন। এক ফেসবুক বন্ধু সম্প্রতি এমন একটি পোস্ট, জানতে চেয়েছেন— কারা কারা এই বুলেটিন দেখে। কেবল আমি আর অন্য একজন তার পোস্টের উত্তরে জানালাম, দেখি। বাকিরা এই বুলেটিন নিয়ে হাসাহাসি করছে এবং বুলেটিন যে রোজ দেখায়, তা জানেও না! এই একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না। কিন্তু দেশের অত্যন্ত অল্পসংখ্যক মানুষও যদি প্রতিদিনের আক্রান্ত ও মৃত্যু সংবাদকে এভাবে হেলাফেলা করতে থাকে, তবে কর্তৃপক্ষের উচিৎ সতর্কতা বাড়িয়ে দেওয়া। আমরা চাই না, দেশে করোনার কারণে আর একটি মৃত্যুও হোক। সবাইকে ‘নিউ নরমাল’ ঈদের শুভেচ্ছা।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন