বিজ্ঞাপন

৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ‘প্রথম স্বীকৃতি’ সুজনের

August 4, 2020 | 5:59 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ১৯৭০ সালে যখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রলীগে। রাজনীতিতে ওই পথচলা শুরু খোরশেদ আলম সুজনের। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পথপরিক্রমায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের আসনেও বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ফেরানোর সংগ্রামে ভূমিকা ছিল তার। নব্বইয়ের দশকে দেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের পর যুক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে, ছিলেন প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভাবশিষ্য। গভীর রাজনৈতিক জ্ঞানের কারণে আওয়ামী লীগের তাত্ত্বিক নেতা হিসেবেও পরিচিতি ছিল তার।

বিজ্ঞাপন

কখনো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে, কখনো নাগরিক সংকট সমাধানের দাবিতে বারবার রাজপথই ঠিকানা হয়েছে সুজনের। তিন বার সংসদ সদস্য পদে এবং দুইবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন। তবু দমে যাননি। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সুজনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক নিযুক্ত করেছে। সুজনের ভাষায়, ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম স্বীকৃতি।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে খোরশেদ আলম সুজনকে চসিক প্রশাসক ঘোষণার পর নগরীর উত্তর কাট্টলীর সরু গলির নিভৃত বাড়িটির চিরচেনা পরিবেশ পাল্টে গেছে। ক্ষমতার রাজনীতির নানা হাতছানিকে দূরে ঠেলে যারা আপাদমস্তক রাজনীতিক সুজনের সঙ্গে ছিলেন, তাদের উচ্ছ্বাসে মুখর সেই বাড়িটি। যদিও শোকের মাস হওয়ায় খোরশেদ আলম সুজন বারবার নিষেধ করছিলেন কোনো ধরনের স্লোগান কিংবা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস না দেখানোর জন্য। কারও ফুল-মিষ্টিও গ্রহণ করেননি।

৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ‘প্রথম স্বীকৃতি’ সুজনের

বিজ্ঞাপন

ব্যস্ততার ফাঁকেই সারাবাংলার সঙ্গে কথা হয় সুজনের। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর মনের মধ্যে একটা ইচ্ছা থাকে— এমপি-মন্ত্রী হয়ে কিংবা প্রশাসনিক যেকোনো পদে থেকে জনগণের সেবা করবে। আমিও একজন রাজনৈতিক কর্মী। ৫০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। আমার মনেও অবশ্যই এই বাসনা আছে। ৫০ বছর পর আমি প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছি। এই মূল্যায়নের সম্মান রাখার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব।’

আবেগাপ্লুত হয়ে সুজন বলেন, ‘আমাকে যে স্বীকৃতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। যারা আমার মতো স্কুলজীবন থেকে রাজপথে হেঁটে, মানুষের সঙ্গে থেকে, জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে রাজনীতি করেছেন, যারা বিভিন্ন কারণে হতাশায় পড়েছিলেন, আমি মনে করি তাদের মনোবল ফিরে আসবে এবং দৃঢ় হবে।’

জানা যায়, স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি সৈনিকদের সেবা দেন সুজন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কলেজ ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে চট্টগ্রামে প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন। সত্তরের দশকের শেষ ভাগে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একাংশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদবিরোধী কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হয়ে ঢাকায় আন্দোলন সংগঠিত করেন এবং দুই বার কারাবরণও করেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

আমলা নয়, চসিকের দায়িত্ব থাকছে রাজনৈতিক ব্যক্তির হাতেই!

১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য উপকমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধে অংশ নেন সুজন। বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের সংকটসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে সামাজিক সংগঠন গড়ে সবসময় সোচ্চার তিনি। নাগরিক উদ্যোগ নামে একটি সংগঠন গড়ে সেই আন্দোলন এখনো অব্যাহত রেখেছেন তিনি। পিডিবি অফিসে তালা দেওয়া, খাটিয়া মিছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ‘পিঠ প্রদর্শন’সহ ব্যতিক্রমী বিভিন্ন কর্মসূচির পালন করে বারবার আলোচনায় আসেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পরে তার বদলে ব্যবসায়ী নেতা এম এ লতিফকে দেওয়া হয় মনোনয়ন। এরপর আরও দু’বার মনোনয়ন চেয়ে তিনি ব্যর্থ হন। ২০১৫ সালে এবং ২০২০ সালে দুইবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মনোনয়ন চেয়েও পাননি তিনি। ব্যক্তিজীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ের পিতা সুজনের স্ত্রী নগরীর একটি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক।

চসিকে দুর্নীতি বন্ধ করতে চান সুজন

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) চসিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেবেন খোরশেদ আলম সুজন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কাজ কী হবে— জানতে চাইলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কিছু রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রথম কাজ হবে এগুলোকে ঠিক করা। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে যে দুর্নীতি আছে, সেটাকে আমি বন্ধ করার চেষ্টা করব। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরও স্বাস্থ্যসম্মত করার চেষ্টা করব।’

বিজ্ঞাপন

৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ‘প্রথম স্বীকৃতি’ সুজনের

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নীতি অনুসরণ করবেন বলেও জানিয়েছেন সুজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়াত নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, পরবর্তী মেয়রদের অযত্ন-অবহেলায় সেই ধারাবাহিকতা না থাকায় এই খাতটি নষ্ট হয়ে গেছে। আমি চেষ্টা করব সেটাকে পুনরুজ্জীবীত করার জন্য। শিক্ষা ব্যবস্থা মহিউদ্দিন ভাই যেভাবে চেয়েছিলেন, আমিও সেভাবে পরিচালনা করব। এই শহরকে একটি মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করব।’

নাগরিক সংকট সমাধানে এলাকায়-এলাকায় ঘুরে যেভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করতেন, এখনও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন বলে জানিয়েছেন সুজন। তিনি বলেন, ‘যেখানেই নাগরিক দুর্ভোগের খবর পেয়েছি, আমি সেখানে গেছি। আমি প্রত্যেক এলাকায় গেছি, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে গেছি। আমি এই কাজের মধ্যেই থাকব। ওয়ার্কিং আওয়ারে আমি যেখানেই নাগরিক দুর্ভোগের খবর পাব, সেখানে ছুটে যাব এবং সমাধানের চেষ্টা করব।’

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত পরিষদের দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে ৫ আগস্ট। গত ২৯ মার্চ চসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সেটা স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। পরে ফের আরেক দফায় এই নির্বাচন স্থগিত করা হলে এটি নিশ্চিত হয়ে যায়, বর্তমান মেয়রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন মেয়র পাবে না চসিক। তখন থেকেই চসিকে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ২৫ (১) ধারায় বলা আছে, সিটি করপোরেশন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সরকার সিটি করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে। স্থানীয় সরকার সচিব গতকাল সোমবারই (৩ আগস্ট) সারাবাংলাকে জানিয়েছিলেন, এই পদে এবার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একজন ব্যক্তিও সারাবাংলাকে জানিয়েছিলেন, খোরশেদ আলম সুজনকে সরকার এই পদে নিযুক্ত করছে বলে শুনেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার তাকেই চসিক প্রশাসক নিযুক্ত করা হলো।

সারাবাংলা/আরডি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন