বিজ্ঞাপন

কোন্দল-নেতৃত্ব-অর্থসংকটে দুর্বল জাপা, হারাচ্ছে জনসমর্থন

August 7, 2020 | 3:56 pm

আজমল হক হেলাল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সঠিক নেতৃত্বের অভাব, অর্থসংকট ও লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাংগঠনিক অবস্থা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দলটি হারাচ্ছে জনসমর্থন। সেইসঙ্গে ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনৈতিক মহলেও জাপার গুরুত্ব কমেছে। দলের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

নেতাকর্মীরা বলেছে, দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর আসলে জাপায় সঠিক নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। কে হবে পার্টির কর্ণধার?- এ নিয়ে শুরু হয় এরশাদ পরিবারের ভেতরে লড়াই। এ লড়াই মূলত রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে; যা এখনও অব্যহত রয়েছে। আর এই লড়াইয়ের কারণে শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে জেলা ও থানা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া এরশাদের মৃত্যুর পর পার্টিতে দেখা দেয় অর্থ সংকট। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ অন্যান্য পদের নেতারা নিয়মিত মাসিক চাঁদা দিচ্ছেন না। এতে করে দলের বনানী কার্যালয় ও কাকরাইলস্থ জাপা অফিসের খরচ বহন করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে নীতি নির্ধারকদের।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা মনে করে, ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে এইচ এম এরশাদের পতনের পর রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি কতটা শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে তা নিয়ে অনেক সংশয় ছিল। কিন্তু ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কাছে, জাতীয় পার্টির গুরুত্ব কমেনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করলেও সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন তারা পায়নি। ফলে জাপার সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয় তাদের।

বিজ্ঞাপন

নেতাকর্মীদের ধারণা, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট গঠনের পর নির্বাচনে অন্যতম নিয়ামক হয়ে ওঠে জাপা। গত কয়েকটি নির্বাচনে মহাজোটের শরীক হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনেক দরকষাকষিও করেছে জাপা।

তবে জেনারেল এরশাদের পতনের পরও ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি যা ভোট পেয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা ক্রমাগত কমেছে। জাপার ভোট বৃদ্ধি কিংবা হ্রাসে বিএনপির ভোট হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে- এমনটাই মনে করছে দলটির নেতাকর্মীরা। তারা বলছে, ১৯৯১ সালের পর থেকে বিএনপির যত ভোট বেড়েছে, জাতীয় পার্টির সমর্থন তত কমেছে। তাদের মতে বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠীর ভেতর থেকেই জাপার সমর্থন গড়ে উঠেছিল। যেসব জায়গায় জাপার শক্ত অবস্থান ছিল সেসব এলাকা ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভালো ফলাফল করায় জাতীয় পার্টির ভোট কমে যায়। এছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাপার আসনগুলোতে বিএনপির প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া ৯০’ পরবর্তী সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের আওয়ামী লীগেরও শক্তশালী অবস্থান গড়ে উঠেছে। যদিও জাপা এবং আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি আসনে জাতীয় পার্টির এবং আওয়ামী লীগ আলাদাভাবে নির্বাচন করে। সমর্থন কমে যাওয়ার পেছনে এটিকেও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন,  ‘জাপা থেকে একবার টিকেট নিয়ে নির্বচন করেছি। সামান্য ভোটে ফেল করার কারণে আমাকে আর মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ফলে আমার এলাকার নেতাকর্মীদের ধরে রাখতে পারিনি। তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। এভাবে সারাদেশেই পার্টির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা অন্য দলে চলে গেছে। আর অন্যরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।’

বিজ্ঞাপন

তার মতে, ১৯৯০ সালের পর থেকে জাতীয় পার্টি ক্রমন্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেসব নির্বাচনি এলাকায় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি ছিল তা এখন আর নেই। ওইসব এলাকা এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নিয়ন্ত্রণে। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে দল প্রার্থী সংকটে পড়বে। কারণ জাপায় যোগ্য প্রার্থী নেই। এরশাদ সাহেব থাকা অবস্থায়ও দলে গ্রুপিং ছিল। তখন অবশ্য মনোনয়ন দেওয়ার জন্য যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যেত। গ্রুপিংয়ের মধ্যেও এরশাদ সাহেব তার মতো করে পার্টিকে সেসময় এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কূটনৈতিক মহলেও তখন দলের গুরুত্ব ছিল।’

ঢাকা মহানগরের এক নেতা  নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরে জাপার কমিটি নেই। আগামীতে কমিটি করতে গেলে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে যোগ্যপ্রার্থী খুজেঁ পাওয়া মুশকিল হবে। কারণ যারা দুর্দিনে দলটিকে ধরে রেখেছে তারা এখন আর জাপায় নেই। পার্টি পরিচালনা করতে হলে টাকার প্রয়োজন। জাতীয় পার্টি অর্থসংকটে ভুগছে। কোনো ডোনার নেই।  পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যরা ঠিকমতো মাসিক চাঁদা দেন না। এরশাদ সাহেবের সময় দলে অর্থসংকট ছিল না। কারণ ওই সময় অনেক শিল্পপতি এরশাদ সাহেবকে টাকা দিত। এখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।’

বিজ্ঞাপন

এসব বিষয় নিয়ে দলটির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই। যা আছে সব ঠিক হয়ে যাবে। স্যারের (এরশাদ) মৃত্যুর পর দলটির অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এখন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে পার্টি এগিয়ে যাবে। আবার কূটনৈতিক মহলে জাপার কদর বাড়বে। সময়ই সবকিছু বদলে দেবে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন