বিজ্ঞাপন

সৌদিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কনস্যুলারের দায়িত্ব ‘অন্যদের’ হাতে

August 18, 2020 | 10:07 am

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কনস্যুলার বা পরামর্শ দাতার সেবা এখন আর দূতাবাস দেবে না। ওই দায়িত্ব সেখানকার আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে এখন থেকে অভিবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন, জন্ম সনদ নিবন্ধন, সত্যায়িতকরণ, প্রবাসী কল্যাণ কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কনস্যুলার দেবে। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের এক্সেস দেওয়া নিরাপদ নয়।

বিজ্ঞাপন

দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের মহামারিতে জনসমাগম এড়াতে দূতাবাস এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৯ জুলাই এ সংক্রান্ত একটি  নোটিশ দেয় দূতাবাস।

সেই নোটিশে বলা হয়, ২ আগস্ট থেকে পাঁচবছর মেয়াদী পাসপোর্ট রি- ইস্যুর আবেদন জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে সরাসরি জমা নেওয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু নিয়মের মাধ্যমে এই আবেদন অভিবাসীরা করতে পারবেন বলে ওই নোটিশে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

বলা হয়, সৌদি আরবের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস এর মাধ্যমে অভিবাসীরা সেবা পাবেন। অর্থাৎ দূতাবাস অভিবাসীদের যে কনস্যুলার দিত সেটা আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস সেন্টার করবে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন- এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাসী সেবা কেন্দ্র বা এক্সপ্যাট্রিয়েট ডিজিটাল সেন্টার -ইডিসি স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় সরকার। ইডিসির প্রধান উদ্দেশ্যই দূতাবাসগুলোর পরামর্শদাতার সেবা কার্যক্রম আরো হাতের নাগালে নিয়ে আসা এবং সেবা সহজ করা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা সহজ করতে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই তিন পক্ষের প্রথম পক্ষ জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, দ্বিতীয় পক্ষ আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস এবং তৃতীয় পক্ষ এটুআই প্রকল্প। এই সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ইডিসির উদ্যোক্তা নির্বাচন করবে প্রথম পক্ষ দূতাবাস। নিয়ম অনুযায়ী এই উদ্যোক্তা টানা পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ পাবেন। উদ্যোক্তা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দূতাবাসের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

চুক্তি অনুযায়ী কোন কারণে উদ্যোক্তা পরিবর্তন হলেও এ সেবা বন্ধ রাখা যাবে না। উদ্যোক্তাদের কোনো ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হলে বা অনাপত্তি পত্রের প্রয়োজন দেখা দিলে দূতাবাস সহযোগিতা করবে। উদ্যোক্তারা দূতাবাসে নির্ধারিত সেবার বাইরে কোনো সেবা দিতে পারবে না এবং দূতাবাসের ঠিক কর দেওয়া ফি এর বাইরে অতিরিক্ত ফি নিতে পারবে না। কিন্তু সদ্য নির্বাচিত হওয়া আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস শুরুতেই অতিরিক্ত ফি নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, বর্তমানে সাত ধরনের সেবা দিয়ে আসছে আল মামল। সে জন্য দূতাবাস নির্ধারিত ফি'র বাইরে সর্বোচ্চ দ্বিগুণ অর্থ নিচ্ছে তারা। সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দাহ ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য ফি কিছুটা কম হলেও অন্যান্য শহরে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেশি ফি দিতে হচ্ছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত অভিবাসীদের সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ কর জানা গেছে, আল মামল বর্তমানে পাঁচ বছরের জন্য পাসপোর্ট রি ইস্যু করতে সরকারি ফি’র বাইরে ৪০ থেকে ৬০ সৌদি রিয়াল অতিরিক্ত গুণতে হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া পাসপোর্ট নবায়নে ১০ থেকে ১৫ রিয়াল,  ট্রাভেল পারমিটের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ রিয়াল, সৌদি আরব পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য দূতাবাসের সুপারিশ পেতে ১০ রিয়াল এবং প্রবাসী কল্যাণ কার্ড পেতে ৬০ রিয়াল পর্যন্ত অভিবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া নকল জন্ম নিবন্ধন সনদ সরবরাহ করে থাকে আল মামল, সে জন্য আরও ১০ রিয়াল চার্জ রাখে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এক্সপ্যাট্রিয়েট ডিজিটাল সেন্টার -ইডিসি পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটিতে গ্রহণযোগ্যতা ও সুনাম থাকতে হবে, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র পরিবহনে সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স থাকতে হবে, এনএসআই নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও সৌদি সরকারের অনুমতিপত্র থাকতে হবে, বৈধ ইকামা থাকতে হবে, উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার জন্য শহরের উপযোগী স্থানে কার্যালয় নিতে হবে। স্থানীয় আইন অনুযায়ী কাগজপত্র থাকতে হবে এবং কারিগরি আইটি ও আরবি ভাষা জানা সম্পন্ন দক্ষ ব্যক্তি হতে হবে। এইসব শর্ত উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে জুড়ে দিয়েছিলো দূতাবাস। যদিও শর্তের কোথাও এ কাজে পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আল মামল জেনারেল সার্ভিসেসের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সৌদি আরবের রিয়াদে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়সহ তিনটি কার্যালয় রয়েছে। তবে দেশটির বিভিন্ন স্থানে আরো ৮টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। গত ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সাধারন সেবা, তৈরি পাশাকের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, বিভিন্ন অফিসের সাপ্লাই ও রান্না ঘরের সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ করে এসেছে। এবার বাংলাদেশের এ টু আই প্রকল্পের ইডিসি সৌদি আরবের রিয়াদে বাস্তবাস্তবায়নের কাজ পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরবের কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, এর আগে কনসুল্যার সেবা দেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা আল মামলের নেই। এ ধরনের সেবার সঙ্গে নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য জড়িত। ফলে তাদের এ ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও নেই। আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবেও এধরনের সেবা তারা দেয়নি। ফলে গোপনীয়তা বোঝার অভিজ্ঞতা তাদের নেই।

যদিও সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেছেন, আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস এর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, এ প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য পাচার হওয়ার সুযোগ নেই। তারা মূলত এক্সপ্রেস পোস্ট অফিস হিসেবে কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, এ ধরনের সেবা অনেক দেশ দিয়ে থাকে। তবে তা দেওয়া হয় বিশেষ পরিস্থিতিতে। তারা বলেন, যেসব দেশে দূতাবাস নেই,  সেসব দেশে অনারারি কনসাল জেনারেল এ ধরনের কিছু সেবা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশী অভিবাসী। সে তুলনায় দূতাবাসের জনবল কম। সেক্ষেত্রে কনসুল্যার নিয়োগ করা যেতেই পারে। কিন্তু এখানে দেখার বিষয় যারা এই কাজটা করবে তারা কতটা অভিজ্ঞ। কারণ এখানে বাংলাদেশের কয়েক লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য থাকছে তাদের কাছে। সেখানে কতটা গোপনীয়তা বজায় রাখতে পারে সেটা বিষয়।

তিনি বলেন, ‘আল মামল জেনারেল সার্ভিসেস যেহেতু এ কাজে একেবারেই নতুন, সেখানে একবারে পাঁচ বছরের জন্য অনুমতি না দিয়ে প্রতি বছর বছর নবায়নের ব্যবস্থা রাখলে ভালো হতো। অথবা ছয়মাস তাদের কাজ দেখে তারপর মেয়াদ বাড়ানো যেতো। এ বিষয়ে নিশ্চয়ই সরকার নজর দেবে।’

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে। ২২ লাখের বেশি প্রবাসী দেশটিতে অবস্থান করছে। কিন্তু বাংলাদেশ মিশনে কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ১০/১২ জন। অভিবাসীদের সেবা সহজ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

সারাবাংলা/জেআর/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন