বিজ্ঞাপন

ইন্টারনেট সেবায় অপরিকল্পিত সংযোগ, সমন্বয়হীনতায় ভোগান্তিতে গ্রাহক

August 29, 2020 | 8:00 am

সাদ্দাম হোসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি না থাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবেই চলছে এ খাত। সমন্বয়কারী সংস্থাগুলো একে অপরকে দায়ী করেই পার করছে সময়। ফলে সমন্বয়হীনতায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী ব্যবসায়ীরাও গ্রাহককে নিজেদের ইচ্ছেমতো সংযোগ দিচ্ছে। এতে শহরজুড়ে বেড়েই চলছে তারের জঞ্জাল। আবার সমন্বয়হীনভাবে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো তারের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে ভোগান্তিতে ফেলছে গ্রাহককে। কিন্তু মিলছে না কার্যকরী কোনো সমাধান।

বিজ্ঞাপন

সূত্র বলছে, গত ১০ বছরে রাজধানীতে প্রায় ২ হাজার ২০০ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাডার (আইএসপি) ব্যবসায়ীকে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। কিন্তু সেসব ব্যবসায়ীদের জন্য সংস্থাটির নেই কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন। ফলে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একাধিক আইএসপি ব্যবসায়ী গ্রাহককে ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছে ঝুলন্ত তারের (ওভারহেড ক্যাবল) মাধ্যমে।

এতে একই এলাকায় একাধিক আইএসপি ক্যাবল একত্র হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তারের জঞ্জাল। আবার এ জঞ্জাল সরাতে গত ৫ আগস্ট থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ঝুলন্ত তার অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে। ডিএসসিসির এমন কার্যক্রমে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পৌনে দুই লাখ গ্রাহকের। যদিও প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ফের ১ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহককে পুনরায় ঝুলন্ত তারের সংযোগই দিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

আইএসপি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা নিজেরাও সুশৃঙ্খল একটি ব্যবস্থাপনা চান। তবে ওভারহেড তারের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা এটি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এজন্য নিয়ন্ত্রণ  সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাই বড় বাধা বলে মনে করছেন তারা।

ওয়ারীর আইএসপি ব্যবসায়ী আনোয়ার পারভেজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিটিআরসি থেকে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া আছে মাটির নিচ দিয়ে যারা ক্যাবল সংযোগ দেয় তাদের থেকে সংযোগ নিতে। আমরা মূলত তাদের থেকেই সংযোগ নিয়ে থাকি। কিন্তু সমস্যা হলো মাটির নিচ থেকে সংযোগ নেওয়ার পর যখন বাসা বাড়িতে সংযোগ দিতে হয়, তখনি ওভারহেড ক্যাবল (ঝুলন্ত তার) টানতে হয়। একাধিক ক্যাবল যখন একত্র হয় তখন সেখানে জঞ্জাল সৃষ্টি হয়। সিটি করপোরেশনও হুট করে এসে ক্যাবল কেটে দেয়। কিন্তু একবারও তারা ভাবে না যে এ কাটাকাটির কারণে কি ধরণের সমস্যায় পড়তে হয় গ্রাহক এবং আইএসপি ব্যবসায়ীদের।’

বিজ্ঞাপন

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৬টি ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) থাকলেও ৩টি প্রাইভেট এনটিটিএন সক্রিয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ এনটিটিএনের লাইসেন্স নিলেও তারা এই সেবার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে বাহন লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোম ও সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড নামের তিনটি অপারেটর রাজধানীসহ সারা দেশে ভূগর্ভে ব্যান্ডউইথ পরিবহনের কাজ করছে। তাদের মাধ্যমে ক্যাবল সংযোগ নিতে ২০১৪ সালে বিটিআরসি নির্দেশনা দিলেও আইএসপি ব্যবসায়ীরা সেটি মেনে গ্রাহককে সংযোগ দিতে পারছে না।

এনটিটিএনের মাধ্যমে সংযোগ নেওয়ার পরও কেনো ওভারহেড ক্যাবলে সংযোগ দিতে হয়, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজধানীর অধিকাংশ স্থানে এনটিটিএনের (মাটির নিচে) লাইন রয়েছে ফাইবার ক্যাবল টানার জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো এনটিটিএন থেকে সংযোগ নেওয়ার পর যখন বাসাবাড়িতে সংযোগ দিতে হয় তখন কিন্তু ঝুলন্ত তারের সংযোগ ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার কোথাও কোথাও এনটিটিএনের সব সুবিধা থাকার পরও আইএসপি ব্যবসায়ীরা সেটি নেয় না, কারণ এতে যে অর্থ খরচ হবে তাতে ঝুলন্ত তারে সংযোগ নিলে তার চেয়ে অর্ধেক খরচ কমে যাবে। তাই অধিকাংশ আইএসপি বর্তমানে ঝুলন্ত ক্যাবল টানছে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটিরও সমাধান রয়েছে। এজন্য অবশ্যই প্রতিটি বাড়িতে মাটির নিচ দিয়ে ক্যাবল সংযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এনটিটিএনে যে খরচ হবে সেটি সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করতে হবে। যাতে করে গ্রাহকও সেটি মানতে বাধ্য হয় এবং আইএসপিগুলোও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর এ জন্য অবশ্যই বিটিআরটিকে ভূমিকা রাখতে হবে।’

বিটিআরসি’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিটিআরসি মূলত এনটিটিএনকে অনুমোদন দিয়েছে মাটির নিচ দিয়ে ফাইবার ক্যাবলের সংযোগ টানার জন্য। এ কাজটি তাদেরই। আর তাদের কাছ থেকে আইএসপি সংযোগ দিবে গ্রাহককে। এনটিটিএন প্রতিটি গলির লাস্ট মাইল (সর্বনিম্ন এক মাইল দূরত্ব) পর্যন্ত সংযোগ দিবে। কিন্তু সমস্যাটা হলো বিটিআরসি যখন আইএসপিগুলোকে লাইসেন্স দিয়েছে সেটা একটা অপরিকল্পিত শহরের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। কোথায় বাসাবাড়ি হওয়ার কথা ছিল, কোথায় রাস্তা হওয়ার কথা ছিল আর কোথায় গলি হওয়ার কথা ছিল সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিস্টেমে হয়নি। যেটা সিটি করপোরেশনের করার কথা ছিল। ফলে কাজটি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবে এসব জটিলতা নিরসনে বিটিআরসি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করছে। খুব শিগগিরই সেটি অনুমোদন পেলে এসব সমস্যা আর থাকবে না বলে আশা তাদের।

বিজ্ঞাপন

দেশের প্রথম এনটিটিএনের সত্ত্বাধিকারি ‘ফাইবার এ্যাট হোমে’র চিফ টেকনোলোজি অফিসার (সিটিও) সুমন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, “দেশে বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান এনটিটিএনের কাজের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে বাহন পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। কিন্তু সামিট এবং আমরা যদিও কার্যক্রম চালাচ্ছি বহু বছর ধরে। বর্তমানে শহরের যেকোনো জায়গায় কেউ যদি আমাদের থেকে সংযোগ চায় তাহলে বলবো এটা দিতে আমরা সক্ষম। কিন্তু কেউ যদি কোনো বাসায় সংযোগ চায় তাহলে বলবো ‘না’। কারণ বাসাবাড়ি পর্যন্ত সংযোগ দেওয়ার মত সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়নি।”

তিনি বলেন, ‘বাসাবাড়িতে সংযোগ লাইন নিতে পারলেও আমরা কিন্তু সংযোগ দিতে পারি না। এটি দেবে আইএসপি ব্যবসায়ীরা। সমস্যাটা হলো বাসাবাড়ি পর্যন্ত সংযোগ দিতে যে পরিমান অর্থ ব্যয় হবে, সে পরিমান অর্থ পরিশোধ করে কোনো আইএসপি ব্যবসায়ী সংযোগ নিতে চাইবে না। যা ইতোমধ্যে মহাখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘটেছে। কারণ হলো বাসা বাড়ি পর্যন্ত সংযোগ কাঠামো তৈরি, সড়ক কাটার জন্য এবং বিভিন্ন কারণে আমাদের অর্থ খরচ করতে হয়। আর আমরা সে খরচ আইএসপিদের থেকে নিতে চাইবো। কিন্তু আইএসপিরা যখন ওই টাকা গ্রাহক থেকে নিতে চাইবে তখন বিপত্তি ঘটে। কারণ গ্রাহকক কখনও বর্তমান দামের চেয়ে বেশি দামে সংযোগ নেবে না। যে কারণে আইএসপিগুলো টিকে থাকতে বাধ্য হয়ে ওভারহেড ক্যাবল টেনে সংযোগ দিচ্ছে। তাই সুনির্দিষ্ট সমাধানের পথ না তৈরি করে সিটি করপোরেশন যদি কোনো ওভারহেড ক্যাবল কেটে ফেলে তাহলে এটি প্রকৃতপক্ষে গ্রাহককে যেমন হয়রানি করা হবে, তেমনি আইএসপিগুলোর বিপুল অর্থ নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু হবে না।’

গ্রাহকের জন্য কার্যকরী বিকল্প ব্যবস্থার পথ না রেখে তার কেটে ফেলতে ডিএসসিসির এমন সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক, এমন প্রশ্নে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইরফান উদ্দিন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ক্যাবল নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন-২০০৬ এর ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ক্যাবল ব্যবসায়ীরা অনুমতি ছাড়া খুঁটি বা ল্যাম্পপোস্ট ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে প্রত্যেক ব্যবসায়ী এ অপরাধ করেছে। অনুমতি না নিয়েই ডিএসসিসির ল্যাম্পপোস্ট এবং বিদ্যুতের খুঁটিতে ক্যাবলের এমন সংযোগ নিয়েছে যে, খুঁটিগুলো বাকা হয়ে যাচ্ছে। এরপরও আমরা কিন্তু জরিমানা করিনি কোনো কোম্পানিকে। শুধু সংযোগটা কেটে দিয়েছি যাতে তারা একটা শৃঙ্খলায় আসতে পারে।’

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সমন্বয়ে ডোমেস্টিক নেটওয়ার্ক কোর্ডিনেশন কমিটি (ডিএনসিসি) গঠন করা হয়েছে, যাতে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা বাধাগ্রস্ত না হয়। যদি কোনো সংস্থা এ সেবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা কোনো মতামত বা অভিযোগ দিতে হয় তবে এ কমিটিকে তা অবিহত করতে হবে। যে কমিটিতে বিদ্যুৎ বিভাগ, সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, সড়ক ও জনপদ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অংশীদারিত্ব সব সংস্থা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কোনোভাবে কমিটিকে না জানিয়ে নিজেদের মনমতো ইন্টারনেটের ক্যাবল অপসারণ করেছে। এতে কয়েক লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা বঞ্চিত হয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছে। এটা কোনভাবেই কাম্য না। সিটি করপোরেশন নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে।’

মাটির নিচ দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগের স্থাপনের জন্য এনটিটিএনদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা হল আইএসপিগুলো এনটিটিএনদের কাছে থেকে সংযোগ নিয়ে গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। এজন্যই ওভারহেড ক্যাবল টানছে আইএসপিগুলো। কিন্তু এ ক্যাবল যদি কাটতে হয় তাহলে তো অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে করতে হবে। যা সিটি করপোরেশন করেনি। তবে আমি মেয়রের সঙ্গে বিষয়ে আলাপ করছি। আমি বলছি কার্যকরী সমাধান না করে এটা করা ঠিক নয়। এছাড়া আমরাও একটি নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে বিটিআরসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করে দিতে। তারাও কাজটি সম্ভবত শেষ করেছে। শিগগিরই এর একটা কার্যকরী সমাধান মিলবে।’

সারাবাংলা/এসএইচ/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন