বিজ্ঞাপন

শেখ মুজিবের রক্ত: শিল্প ও সঙ্গ-প্রসঙ্গ

September 10, 2020 | 8:33 pm

মুনশি আলিম

‘শেখ মুজিবের রক্ত’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত একটি গল্পগ্রন্থ; যে গল্পগ্রন্থের প্রধান বা উপজীব্য বিষয় মুক্তিযুদ্ধের সমগ্রতার মহত্তম প্রলেপ। সম্ভবত বাংলাদেশে (?) এটাই প্রথম গল্পগ্রন্থ; যেখানে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে পুরো গল্পগ্রন্থটি সাজানো। অবশ্য প্রত্যেক গল্পের পরতে পরতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়ার্ত মুহূর্ত বা উৎকণ্ঠার ক্যানভাস। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়—বইটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ একটি শাশ্বত জীবনগাথা।

বিজ্ঞাপন

মানবজীবনের পরতে পরতে যেমন সুখ-দুঃখ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে তেমনই চিরায়ত অনুভূতিগুলো লেপটে রয়েছে প্রখ্যাত গল্পকার মনি হায়দারের শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোয়। দশটি গল্পে সাজানো গ্রন্থটি মূলত বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের আবহে রচিত গল্পগ্রন্থ। ২০২০ সালে পারিবার পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গল্পগ্রন্থ ‘শেখ মুজিবের রক্ত’। প্রায় আট ফর্মার এই গল্পগ্রন্থের পরতে পরতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন দুঃখগাথা, বঙ্গবন্ধু হত্যার দুঃসংবাদ আবার বিচারের পটভূমিতে সুসংবাদ। গল্পগ্রন্থটির মূল ৩০০ টাকা।

জগদ্বিখ্যাত চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়— এ যেনো চিরচেনা, এ যেনো চিরবাস্তব; ঠিক তেমনই মনি হায়দারের গল্পগুলোও। গল্পপাঠে পাঠককুল তন্ময় হবেন। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলা কথাসাহিত্যে প্রবেশ মনি হায়দারের। নিজের মেধা, প্রজ্ঞা আর নিটোল সৃষ্টিশীলতা দিয়েই মনি হায়দার বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিকের স্থান দখল করে নিয়েছেন। বর্ণনাভঙ্গিতে রয়েছে নিজস্ব স্টাইল। ভাষার ক্ষেত্রেও রয়েছে অবিশ্বাস্য সরলীকরণ। প্রতিটি বাক্যবিন্যাসে মুনশিয়ানা চোখে পড়ার মতো।

সর্বজনীন সত্য, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় চিহ্নিতকরণের ইতিহাস। এই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মম ও নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী। আর এ কাহিনীগুলো শিল্পব্যঞ্জনায় দক্ষ লেখকগণ তাদের শিল্পসাহিত্যে তুলে আনেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে কেন্দ্রীয় চরিত্রের চেতনা। প্রকারান্তরে সবগুলো গল্পেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গল্পগ্রন্থটিতে স্বদেশ-চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। সবগুলো চরিত্রকেই খুব আপন মনে হয়। যেনো হাজার বছরের পরিচিত। এককথায় শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থটির গল্পগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আশ্রিত জনগণমননেতার দেশপ্রেমের নিটোল মাহাত্ম্যগাথায় অবিনশ্বর।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ যেন অভিন্ন রূপ হয়ে উঠেছে। ফলে দিনকে দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনাসম্ভার। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সৃজনশীল সাহিত্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জীবনের মতো শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মুক্তিযুদ্ধের গণজাগরণ ও বৈপ্লবিক চেতনা আমাদের সাহিত্যকে আলোকিত করেছে। পরিবর্তন এনেছে আমাদের মনে-মননে-মনীষায়।

মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ধারার সাহিত্য। যাকে আমরা আখ্যা দিয়েছি—“মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য” । সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব ও প্রতিফলন দৃশ্যমান। বাঙালি-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা অপরিসীম। এই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সমগ্র ঘটনাই স্বল্পপরিসরে শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় “শেখ মুজিবের রক্ত” গল্পগ্রন্থে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রখ্যাত গল্পকার মনি হায়দার।

সত্যিকার অর্থে কথাসাহিত্য কবিতার থেকেও বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ভালো একটি গল্প লিখতে, সার্থক একটি গল্প লিখতে গল্পকারকে হতে হয় সমাজ সচেতন, রাজনীতি সচেতন।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। সব লেখাই পাঠককে টানে না। যেসব লেখায় শিল্প নেই সেসব লেখা ও লেখক উভয়ই হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। ইতিহাসের সঠিক ব্যবহার করে শিল্পান্বেষণ সহজ কাজ নয়। এমন ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো যেসব গল্পকারদের গল্পে শিল্পিত রূপ লাভ করেছে —আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, মিন্নাত আলী, শওকত ওসমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সরদার জয়েনউদ্দীন, রাহাত খান, বশীর আল হেলাল, জহির রায়হান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, মাহমুদুল হক, হরিপদ দত্ত, মামুন হুসাইন, শহীদুল জহির প্রমুখ। এঁদের পরে যেসব তরুণ নিজের মেধা দিয়ে এই প্রতিযোগিতার বিশ্বে নিজের গল্প নিয়ে টিকে আছেন কিংবা টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের অন্যতম প্রধান মনি হায়দার।

তিনি কাহিনী নির্মাণে দক্ষ কারিগর। আখ্যানের ভেতর আখ্যান থাকলেই না পাঠক বুদ হয়ে গল্পপাঠ করবে। আর এ কাজটি করা মোটেও সহজসাধ্য নয়। একজন গল্পকার একই সাথে যেমন সমাজদ্রষ্টা তেমনই নিখুঁত সমাজবিশ্লেষকও। একজন বাবার ভেতর মা থাকতে পারে আবার একজন মায়ের ভেতরেও বাবার আচার-অনুভূতি থাকতে পারে। আর এ গুণ না থাকলে যে খাঁটি মা-বাবা হওয়া যায় না! তেমনই একজন গল্পকারের ভেতরও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হয়, বস্তুনিষ্ঠতা থাকতে হয়। গল্পের কাহিনীর মাত্রা ধরে হাঁটে পাঠককুল, গল্পরসে সিক্ত হয়; গল্পের ঘনঘটায় পাঠকহৃদয় দলিতমথিত হয়। আর এ কাজটি যিনি সুচারুরূপে পারেন তিনিই হলেন সার্থক লেখক।

এদিক বিবেচনায় মনি হায়দার অন্যতম সেরা একজন গল্পকার। তিনি একই সঙ্গে গল্পের বুননে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তেমনই গল্পে তুলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন নিটোল বাস্তবতার সুঘ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধ—বাংলাদেশ তথা সমগ্র  বিশ্বের জন্যই ছিল তখন আকাঙ্ক্ষার ধন, লালিত স্বপ্ন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশ নামক একটি দেশের, জন্ম হয়েছে লাল-সবুজের পতাকার। যে পতাকায় সবুজের আভায় লেপটে রয়েছে এদেশের সবুজ-শ্যামলিমা; যে পতাকার লাল আভায় লেপটে রয়েছে বীর আর বীরাঙ্গনাদের আত্মোৎসর্গের বুকের তাজা রক্তের স্মারকচিহ্ন। মনি হায়দার পুরো বঙ্গবন্ধুর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের চিত্রই তুলে ধরেছেন শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থে। মুক্তিযুদ্ধ এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাও গল্পগুলোতে উঠে এসেছে ইতিহাস আর সংগ্রামের মহাস্মারকে।

বিজ্ঞাপন

একজন চিত্রকর চিত্র বা ছবি আঁকেন। ছবির রঙে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন কাঙ্ক্ষিত বস্তুর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা বা ইতিহাস-ঐতিহ্যের চেতনা। ছবিতে লেখকসত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। একজন গল্পকার বা কথাসাহিত্যিকও চিত্রের মতো করে সমাজ-বাস্তবতার, জনজীবনের সুখ-দুঃখ কিংবা জাতীয় জীবনের গাথা অবলীলায় তুলে আনেন সৃষ্টিকর্মে। আপাতদৃষ্টিতে কাজটি ছোট মনে হলেও কিন্তু বাস্তবতা উলটো।

একটি ভালো মানের নাটক বা সিনেমা দর্শক কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেখে শেষ করেন। কিন্তু এই ভালো নাটক বা সিনেমা তৈরি করতে একজন চিত্রনির্মাতাকে যে কী পরিমাণ ঘাম ঝরাতে হয় তা কেবল যিনি নির্মাণ করেন তিনিই ভালো জানেন। এ রকমই নজির পাই আমরা গল্পকার বা সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে। লেখক বা গল্পকারগণ ইতিহাস-ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি- বৈশ্বিকনীতিকে নিজের মতো করে পর্যবেক্ষণ করে তিল তিল করে সৃষ্টি করেন সাহিত্যসম্ভার। যেভাবে তিল তিল করে তৈরি করা হয়েছিল তাজমহল। প্রত্যেক লেখকের কাছেই সৃষ্টকর্ম হলো তাজমহলের মতো!

শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থটির গল্পগুলোতে রয়েছে গল্পকারের ঘামঝরা পরিশ্রম আর ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর পঠনপাঠন। গল্পগ্রন্থের দশটি গল্প যথাক্রমে ‘ইতিহাসের বেলিফুল’, ‘দশ জানুয়ারি ১৯৭২’, ‘কর্নেল আসছেন’, ‘ন্যাশন ৫৭০’, ‘শেখ মুজিবের রক্ত’, ‘ট্রানজিস্টার’, ‘জল ও পাথর’, ‘মুজিবনগরে- আমবাগানে’, ‘শিথানে শেখ সাব’, ‘একটি সিনেমার যাত্রা’ প্রভৃতি।

বিজ্ঞাপন

‘ইতিহাসের বেলিফুল’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাফর ইকবাল তার নতুন স্ত্রী তৃণাকে যখন বলেন—

“দেশটা স্বাধীন হলে তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ জৌলুশে মেতে উঠবে না। এদেশের ছেলেমেয়েরা বিয়ের অনুষ্ঠানে দামি অলংকার পরবে না। তারা বেলিফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করবে।” এ কথাগুলো আপাতদৃষ্টি জাফর ইকবালের মুখ থেকে উচ্চারিত হলেও মূল চেতনাটি কিন্তু গল্পকারের। এই মহা-আদর্শটি তিনি নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রাদর্শ থেকে। গল্পকার সচেতনভাবেই জাফর চরিত্রের মধ্যে মুজিবপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা ইতিহাসের মহাসত্যরসে সিক্ত করেই তৈরি করেছেন। পারভেজ আক্তার, শিলা, ভাবি, ইকবাল হাসান, মা-সহ অন্যান্য চরিত্রগুলো যুতসইভাবেই ফুটে উঠেছে। চরিত্র চিত্রণের ব্যাপারে সত্যিই মনি হায়দার প্রশংসার দাবি রাখেন।

‘দশ জানুয়ারি ১৯৭২’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো হলো আফসানা খানম, খোকন, আলী আমজাদ প্রমুখ। এ গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসে থেকে মায়ের কাছে খোকনের পত্র। মুক্তিযোদ্ধা খোকনের পত্র পাঠ করতে করতে পাঠক তন্ময় হয়ে চলে যেতে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের তৎকালীন বিভীষিকাময় ঘটনার ঘনঘটায়। শেখ মুজিবের লন্ডন হয়ে ভারত ও বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন বাঙালির জন্য ছিল রাষ্ট্রীয় চেতনায় বরনের উৎসব। কেন্দ্রীয় চরিত্র আফসানা খানম ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির এই শ্রেষ্ঠ সময়ের সাক্ষী থাকতে চান। খুবই আবেগমাখা গল্পটি। এ গল্পপাঠে পাঠকহৃদয় আন্দোলিত হবে, ভেতরে ভেতরে ক্ষরণ ঘটবে। পাঠকহৃদয়ে ক্ষরণ সৃষ্টি করা মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। একজন সার্থক গল্পকারই কেবল এটা পারেন। একজন কালজয়ী লেখকই কেবল এটি পারেন।

‘কর্নেল আসছেন’ গল্পে উঠে এসেছে পাকিস্তানি শাসকদের শাসন আর শোষণের নির্মম চিত্র। উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী মুজিব হত্যাকাণ্ডের নির্মম ইতিহাস। সামরিক শাসকদের দ্বন্দ্ব, দ্বৈরথ যুদ্ধ, বিভক্তি, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, সাধারণ মানুষের ভয়, মুজিবপ্রীতিসহ সেনাশাসকদের নির্মমতা। কর্নেলের ভাষায়—“শোনো, আমরা যখন পাকিস্তানের জুনিয়র অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেছি, কখনো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেওয়া হতো না। দেখো, পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে আমরা পূর্ব বাংলার সৈনিকরা কেবল মেজর পর্যন্ত হতে পারছি। একমাত্র ওসমানী ছিলেন কর্নেল। তাও দিতে বাধ্য হয়েছে ওরা, কারণ তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আর্মির অফিসার। যে নেতা এই সুযোগ দিয়েছেন তার নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর আমিও আমার কয়েকজন সহকর্মী অফিসারের সঙ্গে আলাপ করি। ওরা আমার সঙ্গে একমত হয় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করবো। সেভাবে আমরা কাজও শুরু করি। কিন্তু একদিন পরই দেখলাম—আমাদের সঙ্গে যুক্ত দুজন অফিসার নেই।”

যে কারণে ফেরারি আসামি হয়ে গেলেন কর্নেল। তার নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। বিশ হাজার টাকা অর্থ ঘোষণা হয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। শেষতক সে মুক্তিযোদ্ধা হাবিবের আশ্রয়ে মফস্বলের দিকে রওয়ানা হয়। হোসনে আরা, নয়না, আবির, হাসমত, শ্যামল চরিত্র থেকেও মুক্তিযোদ্ধা হাবিব চরিত্রটি বেশ উজ্জ্বল।

ন্যাশন ৫৭০ গল্পটি অসাধারণ প্রতীকাশ্রয়ী গল্প। যেখানে প্রিয়জনকে একটি সুগন্ধি সাবান দেওয়ার জন্য আগন্তুকের কষ্টের শেষ নেই। গ্রাম থেকে শুরু করে, গঞ্জ, শেষতক শহরে এসেও সে প্রিয়তমা জাহ্নবীর জন্য একটি সুগন্ধি সাবান কেনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু কোথাও সে ৫৭০ সাবান ছাড়া আর কিছু পায় না। অবশেষে তার চেতনা ফিরে জ্ঞানবৃক্ষের কাছে গিয়ে। লেখকের ভাষায়, “[...] হত্যার পর নিহত জনক আগামেমননকে .. কে কবরে শায়িত করার আগে যে পবিত্র সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়েছিল, সেই সাবানের নাম ৫৭০। বাঙালি জাতি সেই দিন থেকে দুনিয়ার সব সাবান অস্বীকার করে, একমাত্র ৫৭০ সাবান ব্যবহার করে আসছে। কারণ আমরা বাঙালি জাতি মনে করি, এই সাবানের চেয়ে কোনো সাবান পবিত্র আর মানবিক হতে পারে না।”

শেষতক আগন্তুক প্রেমিকার জন্য মানবিক পবিত্র এই ৫৭০ সাবানই নিয়ে যান। এই গল্পটিও পাঠককে নতুন করে ভাবিয়ে তুলবে আমার বিশ্বাস। ‘শেখ মুজিবের রক্ত’ গল্পগ্রন্থের শিরোনাম গল্প। গল্পটি খুবই টাচি। গল্পপাঠে পাঠকহৃদয় চলে যাবে সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রান্তরে। পাঠকমন আন্দোলিত হবে। কখনো পাঠকহৃদয়ে জন্ম নেবে প্রতিশোধের স্পৃহা। এখানেই গল্পকারের সার্থকতা। গল্পকারের ভাষায়—‘‘কোথায় ছেলেন? নেন, ভাত খান।
বাড়িয়ে ধরে ভাতের থালা। এক ঝটকায় ভাতের থালা ফেলে দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কফিলুদ্দিন হাউমাউ কাঁদতে শুরু করে। হঠাৎ বাবার কান্না শুনে এগার বছরের মেয়ে পুষ্প দৌড়ে আসে বারান্দায়। তাকায় মায়ের দিকে-বাবা কানতাছে ক্যান? ধরা গলায় জবাব দেয় সুলতানা, বঙ্গবন্ধুর লাইগা কান্দে।”

বুকে শক্তি আর সাহস নিয়ে কোনো কাজ শুরু করলে যে—সে কাজ সফলতার দ্বারপ্রান্তের দিকে যায়, প্রমাণ কফিলুদ্দিন। গ্রাম বাংলার মুক্তিযোদ্ধা কৃষক কফিলউদ্দিন সেই শ্রাবণ দিনে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ একাই উঠে দাঁড়ায়। গ্রামীণ হাটে বিকেলে শ্লোগান ধরে, জ...য় বাংলা। প্রতি উত্তরে তারই মেয়ে পুষ্প উত্তর দেয়, জয় বাংলা। উভয়ের শ্লোগানের সঙ্গে যোগ হতে থাকে একে একে পরিচিত-অপরিচিত অনেক মুজিব ভক্ত। মিছিলের মিলিত শ্লোগান—শেখ মুজিবের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না। বৃথা যেতে দেবো না : শেখ মুজিবের রক্ত...। 

গল্পপাঠের ক্ষেত্রে কেউ কাহিনীর ঘনঘটায় মুগ্ধ, আবার কেউ খুঁজে ফেরেন দার্শনিক পদবাচ্য তথা বুলেট বাক্য, আবার কেউ খুঁজে ফেরেন সমন্বিত ইতিহাস-ঐতিহ্যের রসদ, আবার কেউবা খুঁজে ফেরে যৌনঘেঁষা বিনোদন। কাজেই এ ক্ষেত্রেও বলা যায় পাঠকভেদেও গল্পের নির্যাস আস্বাদনেরও ভিন্নতা রয়েছে। বুলেটবাক্য যেকোনো গল্পেই পাঠককে কিছুটা হলেও ছুঁয়ে যায়। সংলাপও গল্পের বিশেষ শিল্প হিসেবে বিবেচিত। পাত্রপাত্রীর মুখ দিয়ে সংলাপ বের হলেও পাঠককুল সেই সংলাপের মাত্রা ধরে হাঁটেন। আবার কোনো কোনো সংলাপ তো জাতীয় সংলাপ হিসেবেও বিবেচিত হয়; আবার কোনোটিও বা হয়ে ওঠে চিরন্তন বাণী।

‘ট্রানজিস্টার’ গল্পে শফি তালুকদারের ট্রানজিস্টার প্রীতি প্রকারান্তরে মুজিবপ্রীতিরই বার্তা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ট্রানজিস্টারে শুনত বঙ্গবন্ধুর বার্তা। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের দিন থেকে দীর্ঘদিন ট্রানজিস্টার বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে একটা সংবাদ শুনে আবারও সেই ট্রানজিস্টার ৫০০ টাকা দিয়ে কেরামত মিস্ত্রীর কাছ থেকে মেরামত করে আনে। এটাই হলো মুজিবপ্রেম! গল্পকারের ভাষায়—“খুব ভোরে হালিমার ঘুম ভাঙে পবিত্র কোরআন পাঠের শব্দে। মাথার কাছে ট্রানজিস্টার থেকে পবিত্র সুর ভেসে আসছে। শফি নিমগ্ন মনে ট্রানজিস্টারের সামনে উবু হয়ে বসে আছে। শুনবে আজ এই ট্রানজিস্টার থেকে প্রচারিত সংবাদে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের বিচারের রায় ...”।

‘জল ও পাথর’ গল্পটি রোমান্টিক ধাঁচের। মীরা ও বর্ণর বাস যাত্রা থেকে তাদের পরিচয়। সে পরিচয় ক্রমশ তাদের ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে। এক সময় দেখা করে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির উল্টো পারে। এই গল্পটি এখানে না দিলেও মূল গল্পগ্রন্থটির ক্ষতি হতো না।

‘মুজিবনগরে, আমবাগানে’ গল্পটিতে গল্পকার আবেগের প্লাবনে প্লাবিত করে তুলেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কেউ যখন মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিল না সেনাবাহিনীর ভয়ে, তখন মুন্সি কফিলউদ্দিনই এগিয়ে আসে। নিজেই প্রচার-প্রসার চালায়। এমপির দ্বারস্থ হয়। কিন্তু সময় অনুকূলে না থাকায় এমপি প্রহার করে এবং এ কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু মুজিবভক্ত কফিলুদ্দিন এমপির প্রচণ্ড প্রহারেও এতটুকু টলেনি। বরং বিপুল উৎসাহ নিয়েই গায়েবানা জানাজা পড়তে প্রচার-প্রসার চালায়। সঙ্গে যোগ দেয় রিচার্ড, হানিফ, গোবিন্দ রায়, হারুনসহ অসংখ্য জন। মিছিল নিয়ে মুজিবনগরে আমবাগানের দিকে যেতে থাকে । বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে আওলাদ মোল্লা। যে ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজাকার। স্থানীয় পুলিশেও খবর পাঠায়। শুনে মুক্তিযোদ্ধা হারুনকে প্রচণ্ড মারধর করে আওলাদকে । শেষতক কফিলুদ্দিন এসে আওলাদকে ছাড়িয়ে নেয়। কয়েকশ মানুষ মিছিল নিয়ে আমবাগানের দিকে যেতে থাকে। অল্পসময় পরে পুলিশ আসে। দূর থেকে দেখে কয়েক হাজার মানুষ মুজিবের নামে গায়েবানা নামাজ পড়ছে। কিছু বলার সাহস পায় না। মুজিবের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা দেখে তারাও অবাক হয়।

‘শিথানে শেখসাব’ গল্পটির মূল চরিত্র রফিকউদ্দিন। বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত। মুজিবকে স্যালুট দেওয়ার জন্য প্রায়ই বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে গাছের নিচে পাতা বিছিয়ে শুয়ে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল আনসার। স্যালুট দিয়েছিল মুজিবনগর সরকারকে। আনসারের পোশাক সর্বদা সঙ্গে রাখে। যদি মুজিব কোনোদিন এ আমবাগানে আসে আনসারের পোশাক পরে একটিবার স্যালুট জানাবে। রফিকউদ্দিনের জীবনের অন্তিম স্বপ্ন।

এক সাংবাদিক এসে সাক্ষাৎকার নিয়ে পত্রিকায় ছাপে। চারদিকে জানাজানি হয়। লোকজন ভিড় করতে থাকে। চেয়ারম্যানরা আসে,  ঘর তৈরির প্রস্তাব দেয়। বিনয়ের সাথে না করে রফিকউদ্দিন। ঘটনার মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নির্মম ঘটনা শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বাসেদসহ অন্যান্যরা বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা জানায়। কিন্তু অন্ধভক্ত রফিকুদ্দিন বিশ্বাস করে না।

মুজিব হত্যার পর রাতারাতি বদলে যায় ক্ষমতা ও শাসকদের চিত্র। সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একসময় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় রফিকউদ্দিনকে। থানাতে তিন দিন, তিন রাত থাকে। পরে খবর পেয়ে বড়ো ছেলে এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পরদিন ভালো করে খেয়ে দেয়ে আবারও আমতলায় যায়। সেখানে এক লম্বা ঘুম দেয়। সেই ঘুম জীবনের শেষ ঘুম। শিথানে ছিল একটি পত্রিকা। বাসেদের আট বছরের ছেলে কাসেদ পত্রিকাটা তুলে ধরে। গল্পকার লিখছেন—“কাসেদ তুলে হাতে নেয়। সবাই তাকায়, ছবিটা শেখ মুজিবের। সাদা কালো। অনেক আগের কোনো পত্রিকায় ছাপানো ছবিটা বেশ বড় ... শেখ মুজিব বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন চিরায়ত প্রথায় হাত উঁচু করে, অঙ্গুলি নির্দেশ করে।’’

‘একটি সিনেমার যাত্রা’ গল্পটির আখ্যান সাম্প্রতিক। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমা বানানোর দায়িত্ব পড়েছে জগলুল পাশার ওপর। অফিসে স্ক্রিপ্ট জমা পড়েছে প্রায় আটশ। এর মধ্যে সচিব থেকে শুরু করে অনেক আমলা, নেতা, মন্ত্রীরাও সুপারিশ করছে কাছের মানুষদের কাজটা পাইয়ে দেওয়ার জন্য। রুমকি খানও এমন একজন নেত্রী। বাবা মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে সিনেমা নির্মাণের কাজটা চায়। অথচ এ কাজে তেমন অভিজ্ঞতা নেই। স্রেফ রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে টাকা কামানোর একটা ধান্দা মাত্র। জগলুলের বন্ধু কায়েশ আলী বসে বসে সকল কর্মকাণ্ডই দেখে।

শেষতক অফিসে স্ক্রিপ্ট জমা দিয়ে কোনো সদুত্তর না পেয়ে জবাবদিহিতার খোঁজ নিতে আসে অরবিন্দ হাসান। এই অরবিন্দ হাসান একালের সিনেমার সকল টেকনিক জানা একজন চৌকশ ডিরেক্টর। কিন্তু ওর স্ক্রিপ্টটি জগলুল খুলেও দেখেননি। কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে জগলুলকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারে। সরকারি অনুদান না পেলেও বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে শিল্পগুণসম্পন্ন ছবি নির্মাণ করে দেখাবেন। এমন চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি জগলুল কখনোই হননি। শেষটায় জগলুল আত্মবিশ্বাসের কারণ জানতে চান, যেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তুমি ছবি বানাবে তাকে তুমি কীভাবে ধারণ করো এক লাইনে আমাকে বলো। গল্পকারের ভাষায়‘ অরিন্দম হাসান ডান হাতটা উঁচুতে তুলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উচ্চারণ করে, ‘আর দাবায়া রাখতে পারবা না।”

মনি হায়দারের প্রতিটি গল্প স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ব্যক্তি মনি হায়দার শিল্পরসিক। ফলে রচনাতেও শিল্পকুশলতার বন্যা বইবে এটাই স্বাভাবিক। শেখ মুজিবের রক্ত বইয়ের প্রতিটি গল্পেই মুজিব একমাত্র দৃশ্যমান কেন্দ্রবিন্দু। মূলত মুজিবই হলো প্রত্যেক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। অদৃশ্যভাবে মুজিবকে প্রত্যেক গল্পেই কেন্দ্রীয় চরিত্র করা মোটেও ছোটো কাজ নয়। বাতাসকে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। ঠিক তেমনই প্রত্যেক গল্পেই মুজিবকে দেখা যায় না কিন্তু উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। একজন সার্থক গল্পকারের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। সত্যিকার অর্থে শেখ মুজিবকে বুঝতে, জানতে, মানতে মনি হায়দারের “শেখ মুজিবের রক্ত’ গল্পের বইটি হতে পারে ইতিহাসের নতুন দরজা।

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী শাখা অবশ্যই ছোটগল্প। বাংলা গল্পে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ক্যানভাস নিটোলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের মধ্যে মনি হায়দার অন্যতম প্রধান একজন কারিগর। শেখ মুজিবের রক্ত গল্পের প্লট, ভাব, ভাষা, চরিত্রচিত্রণ, সংলাপ চয়ন, সন্নিবেশ, পরম্পরা, কাহিনীর গভীরতা, সময়ের ঐক্য, ব্যাপ্তি, সমাপ্তি সবকিছু মিলিয়ে গল্পগ্রন্থটি হয়ে উঠেছে অনন্য। ভাষার সরলতা ও কাহিনীর গতিশীলতা পাঠকে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

সাহিত্যের কাজ হলো নদীর মতো এঁকেবেঁকে চলা। ভাষার কাজও অনেকটা সেরকম। অর্থাৎ পরিবর্তনই ভাষার ধর্ম। এককথায় ভাষার কাজ হচ্ছে মিথস্ক্রিয়া। সাহিত্যের কাজও। শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থের ভাষার সরলীকরণ অত্যন্ত চমৎকার। প্লট ও ঘটনাপ্রবাহের পরম্পরা পাঠকহৃদয়কে ভরা নদীর স্রোতের মতোই প্লাবিত করবে। ‘জল ও পাথর’ গল্পে যৌনঘেঁষা বিষয়গুলোকে গল্পকার কোনো ধরনের জড়তা ছাড়াই সরলভাবে বর্ণনা করেছেন। চরিত্রের সংলাপেও আঞ্চলিক আবহ জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

মনি হায়দারের গল্পের বুননের আবেদন বা শিল্পগুণ কখনো পুরানো হবে না, পুরানো হবারও নয়; কারণ, গল্পে তিনি যে শৈল্পিকচিত্র তুলে এনেছেন, যে বস্তুনিষ্ঠতা তুলে ধরছেন, যে সমকালীন চেতনাকে ধারণ করেছেন তাতে সাধারণ মানুষ থেকে একেবারে রাজনৈতিক জীবনের ক্লেদ-ঘৃণা, হাহাকার, শৌর্য-বীর্য বারবার উঠে এসেছে। প্রতিটি গল্পেই শিল্পসত্ত্বা বারবার রঙ পালটায় আবার নতুন হয়, মধ্যবিত্ত ঘুরেফিরে আসে বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন সমস্যায়। সমস্যাগুলো আরও ঘনায়িত হয়। একই গল্প পাঠকের মনোজগতকে নানা সময়ে-নানাভাবে-নানা আবেগে দোলা দেয়। মনি হায়দার সময়কে ধারণ করেছেন নিজেরই মতো করে।

মনি হায়দারের শিল্পভাবনা খুবই চমৎকার, উন্নত তো বটেই। শাশ্বত ভাবনাকে তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উত্তরোত্তর উজ্জীবিত করেছেন; যা সময়কে সময়ের কাছে নিয়ে আসে। এ দেশে বাংলা ভাষা, বাঙালি যতদিন থাকবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানুষের মনে যতদিন থাকবে ততোদিন থাকবে এ বইয়ের কদর। যতদিন মধ্যবিত্ত থাকবে, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন বা স্বপ্ন ভাঙার অথবা গড়ার ইঙ্গিত থাকবে, মনি হায়দারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ শেখ মুজিবের রক্ত গল্পগ্রন্থটি ততোদিন বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করবে নতুন পথের আলোকে।

একজন কথাসাহিত্যিক যত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন ততই নির্ভুল হতে থাকে তার শিল্পকর্ম। মনি হায়দারের শৈল্পিক কাজগুলো দেখলেই উপলব্ধি করা যায় তিনি কী পরিমাণ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। সাহিত্যসাধনায় এমন দরদমাখা কাজ খুব একটা চোখে পড়ে না বললেই চলে। তার নিষ্ঠাবান সাহিত্যকর্ম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত “শেখ মুজিবের রক্ত” গল্পগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের জন্য নিঃসন্দেহে মাইলফলক। প্রতিটি গল্পের শেষে তিনি একটি সম্মোহনী বার্তা রেখে গেছেন; যে বার্তাটি প্রতিটি বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকের জন্যই নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে। আর এ বার্তাটি নিজের মতো করে জানতে মূল বই পাঠের বিকল্প নেই।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন