বিজ্ঞাপন

পোশাক রফতানি: এনবিআর-ইপিবির তথ্যে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার ফারাক!

September 16, 2020 | 5:58 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: গেল আগস্ট মাসে পোশাক খাতের রফতানি আয় নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখা দিয়েছে। রফতানি আয় নিয়ে সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যে প্রায় ৯০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা) পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এনবিআরের পক্ষ থেকে এখনো এই তথ্য বিভ্রাটের বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত পোশাকের রফতানি আয় নিয়ে এই বিভ্রান্তি দূর করতে গেল ৭ সেপ্টেম্বর এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক।

ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘এনবিআরের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্ট মাসে আমাদের তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানি আয় ছিল ৩৩৬ কোটি ৩৩ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার (১ ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা হিসাবে প্রায় ২৮ হাজার ৫২১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা)। অন্যদিকে, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রকাশিত তথ্য বলছে, একই সময়ে তৈরি পোশাক খাতের রফতানির পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ দুই হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ২০ হাজার ৯২৮ কোটি ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা)। দুইটি তথ্যের মধ্যে রফতানি আয়ের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে ৮৯ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৭ হাজার ৫৯২ কোটি টাকারও বেশি)। এমন তথ্য বিচ্যুতি কেবল পোশাক শিল্প খাতের অভ্যন্তরেই নয়, জনমনেও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইট থেকে অনুমোদিত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রফতানি আয়ের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এক্ষেত্রে এনবিআরের পোর্টাল (ওয়েবসাইট) রফতানি আয়ের তথ্যের প্রাথমিক সোর্স। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোও (ইপিবি) প্রতি মাসে যে তথ্য প্রকাশ করে, তা এনবিআরের তথ্যের ওপর নির্ভর করেই প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এনবিআর ও ইপিবি’র এই দুই তথ্যে সচারচর কোন বিচ্যুতি থাকে না। কোনো পার্থক্য থাকলেওে সেটি হয়ে থাকে নগণ্য। তবে এবার আগস্ট মাসে পোশাক রফতানি আয়ের তথ্যে যে ফারাক দেখা দিয়েছে, তা বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে পোশাক মালিকদের কাছে। আর সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিচ্যুতি দূর করতেই চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএ।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ’র এক নেতা বলেন, আগস্ট মাসের পোশাক রফতানি আয় নিয়ে এনবিআর ও ইপিবির তথ্যে পড়মিল পাওয়া গেছে। এর আগে এই দুই তথ্যে কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। তথ্যের এই বিভ্রান্তি দূর করতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ’র ওই নেতা জানান, এনবিআরের সার্ভার থেকে বিজিএমইএ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। অর্থাৎ এনবিআরের সার্ভারে বিজিএমইএ’র অ্যাকসেস আছে। আর তথ্যটি এনবিআরের সার্ভার থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।

মন্তব্য জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. রহমাতুল মুনিমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে এনবিআরের পরিসংখ্যান শাখার মহাপরিচালক আনোয়ার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের তথ্য পুরোটাই কম্পিউটারাইজড। আসকিকোড পদ্ধতিতে এসব ডাটা সংরক্ষণ করা হয়। সিস্টেমে আমাদের ডাটা। এখন ম্যানুয়ালি নগণ্য কিছু ডাটা হিসাব করা হয়। তাই আমরা আমাদের দিক থেকে ঠিক আছি। আমাদের তথ্যে ভুল থাকার সম্ভাবনা নেই।’

এদিকে, রফতানি আয়ের তথ্যের এই বিচ্যুতি সম্পর্কে জানতে ইপিবি’র জানতে ভাইস চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসানকে একাধিকার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইল এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিবি’র পরিসংখ্যানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এনবিআর থেকে ডাটা নিয়ে থাকি। পরে সেটা বিশ্লেষণ করে তথ্য প্রকাশ করে থাকি। বিজিএমইএর চিঠির পর আমরাও কিছু সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে ইপিবি থেকে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়। এনবিআর আমাদের তথ্যের পক্ষে ইতিবাচক সায় দিয়েছে। আমাদের তথ্যে কোনো ভুল নেই।’

বিজ্ঞাপন

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকও এসব বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সারাবাংলাকে তিনি জানিয়েছেন, এনবিআরের পক্ষ থেকে এখনো সাড়া পাননি। এনবিআরের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যে এত বড় ধরনের পার্থক্য থাকা উচিত নয়। এটি কোনোভাবেই সাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এনবিআর হয়তো তাদের কাস্টমসের তথ্য প্রকাশ করছে। আর ইপিবি হয়তো পণ্য রফতানির অর্ডার দেখে। এই আসামঞ্জস্যতা দূর করতে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি কমিটি করতে পারে। কিংবা এমন অসামঞ্জস্যতা দূর করতে তারা যৌথভাবে কাজও করতে পারে।’

তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, তথ্যের এই ফারাকের মধ্যে ‘বড় একটি কিন্তু’ আছে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বহু বছর ধরেই এনবিআর ও ইপিবির তথ্যের ফারাক রয়েছে। যে পরিমাণ টাকার পণ্য রফতানি হয়, তার সব টাকা দেশে ফেরত আসে না। কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি ফারাক পাওয়া যায়। গেল কয়েক বছর ধরেই ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের একটি ফারাক রয়েছে। এর একটি কারণ হচ্ছে ইপিবি হিসাব করে যে পণ্য রফতানি হয় তার অঙ্ক, আর এনবিআর হিসাব করে যে টাকা দেশে আসছে সেই অঙ্ক।’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন