বিজ্ঞাপন

ই-জিপি চালু করেও সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি ঠেকানো যায়নি: টিআইবি

September 16, 2020 | 7:12 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সরকারিভাবে কেনাকাটার কাজ করার জন্য ই-জিপি পদ্ধতি চালু করা হলেও এর মাধ্যমে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবিদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বরং ই-জিপি চালুর পরও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য সংস্থাটির।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন: বাংলাদেশে ই-জিপির কার্যকরতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে টিআইবি।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবি গবেষণা দলের শাহজাদা এম আকরাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবি‘র উপদেষ্টা সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক শেখ মঞ্জুর ই আলমসহ অন্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুযারি পর্যন্ত সময়ে ই-জিপি বাস্তবায়নকারী চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা চালিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান চারটি হলো— স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপদ (সওজ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড (ইআরবি)। টিআইবি’র গবেষণায় ৮১ শতাংশের বেশি স্কোর পেলে ভালো প্রতিষ্ঠান, ৬১ থেকে ৮০ শতাংশ স্কোর পেলে সন্তোষজনক, ৪১ থেকে ৬০ শতাংশ স্কোর পেলে ঘাটতিপূর্ণ এবং ৪০ শতাংশের নিচে স্কোর পেলে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণার উদ্দেশ্য হিসেবে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্রয় আইন ও বিধি অনুযায়ী ই-জিপি কতটুকু অনুসরণ করা হয় তা চিহ্নিত করা, ই-জিপি যথাযথভাবে অনুসরণ না হলে তার কারণ অনুসন্ধান, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ই-জিপির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং ই-জিপি প্রয়োগে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের উপায় সুপারিশ করা তাদের উদ্দেশ্য।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ই-জিপি চালু হলেও রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কোনো বিশেষ কাজে কারা টেন্ডার সাবমিট করবে, সেটা রাজনৈতিক নেতা, বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঠিক করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মাঝে বণ্টন করেন।

টিআইবি‘র প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিতে সিপিটিইউ‘র ই-জিপি পোর্টালের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের ২ জুন। এটি ২০২১ সালের ​মধ্যে সব সরকারি পরিষেবা ডিজিটাল করার সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। কিন্তু যে উদ্দেশ্য ই-জিপি চালু করা হয়েছিল, তার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। বরং দুর্নীতির ধরণ বদলানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ই-জিপির মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠানিক ও আইনি সক্ষমতা এবং নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু ই-জিপি তৈরির পর আমাদের যতটুকু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সে তুলনায় আমাদের প্রাপ্তি খুবই কম। মোটা দাগে বলা যায়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ফল ই-জিপি আমাদের দেয়নি।

তিনি বলেন, ই-জিপি‘র ক্ষেত্রে উল্লেখিত চারটি প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র পাঁচটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ২০টি মাপকাটিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনোটিই ভালো করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ই-জিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চারটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান উদ্বেগজনক। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পরস্পর যোগসাজশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ই-জিপি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতার দিক থেকে চারটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান উদ্বেগজনক। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে এলজিইডির অবস্থান ঘাটতিপূর্ণ হলেও বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হয়েছে। ফলে এখন দরপত্র বাক্স ছিনতাই, দরপত্র জমা দিতে না দেওয়া কিংবা কার্যালয় ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা ঘটে না। বরং বিদ্যামনা দুর্নীতির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বিশেষ কাজে কারা দরপত্র জমা দেবেন, তা রাজনৈতিক নেতা, বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্ধারণ করে দেন। অনেক সময় বড় কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, নিজেরা কাজ না করে কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি, নম্বর বাড়িয়ে-কমিয়ে আনুকূল্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অফিস কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের রেট শিডিউল জানিয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অফিসের কম্পিউটার অপারেটরদের সাহায্যে নিয়ম-বহির্ভূত কাজ করানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজ পাওয়ার পর ওয়ার্ক অর্ডার আনার সময় টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে কাজ পাওয়া যায় না। এক কোটি টাকার কাজে ১ লাখ টাকা দিতে হয়। আবার বিভিন্ন ধরনের মান পরীক্ষায় ঘুষ না দিলে সময়মতো প্রতিবেদন পাওয়া যায় না। আবার ঠিকাদারদের মধ্যেও অনিয়ম করা হয়। দেখা যায় একটি এলাকার পাঁচ জন ঠিকাদার রয়েছেন, তারা পরস্পর সমন্বয় করে কাজ নেন। একজন কাজ পেলে বাকি চার জনের মাঝে টাকা ভাগ করে দেওয়া হয়। আবার অনেক ঠিকাদার কাজ পেয়ে কাজ না করে বিক্রি করে দেন। এতে অনেকে কোনো কাজ না করেই লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয় ই-জিপির মাধ্যমে করতে হবে। ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঠিকাদারদের অনলাইনে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।

সারাবাংলা/জিএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন