বিজ্ঞাপন

বৃহত্তম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি: আবেদন থেকে কোটি টাকা আয় নিয়ে সন্দেহ

September 17, 2020 | 9:06 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আমার এমপি ডটকম’ প্ল্যাটফর্ম থেকে ই-কমার্সের জন্য প্রায় ৫০ হাজার জনবল নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এটি। তবে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ না থাকলেও নিয়োগের আবেদন করতে গেলে ফি হিসেবে ৯৯ টাকা বিকাশ এবং ক্যাশআউটের জন্য আরও ২ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। যথাযথভাবে নিয়োগ না হলে পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

একাধিকবার ‘আমার এমপি ডটকম’ প্ল্যাটফর্ম থেকে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পায়। সবশেষ ১৫ সেপ্টেম্বরের সংস্করণে বলা হয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বিভাগীয় পর্যায়ে ৮ জন ই-কমার্স কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, যাদের বেতন ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। একই পদে জেলা পর্যায়ে ৬৪ জনের প্রত্যেকের বেতন হবে ৪০ হাজার টাকা। সঙ্গে বোনাস। সংসদ সদস্য (এমপি সিট) পর্যায়ে ৩৫০ জনের বেতন ধরা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে ৪৯২ জনের ২০ হাজার টাকা, পৌরসভা পর্যায়ে ৩৩০ জনের ২০ হাজার টাকা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪ হাজার ৫৫৪ জনের ১৫ হাজার টাকা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ৪০ হাজার ৯৮৬ জনের ১০ হাজার টাকা করে বেতন ধরা হয়েছে। প্রতিটি পর্যায়েই কো-অর্ডিনেটরের জন্য রয়েছে বোনাস। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এসএসসি, পৌরসভা ও উপজেলায় এইচএসসি, সংসদীয় আসন ও জেলা পর্যায়ে স্নাতক ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে আবেদনের জন্য।

বৃহত্তম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি: আবেদন থেকে কোটি টাকা আয় নিয়ে সন্দেহ

বিজ্ঞাপন

আগ্রহী চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে পদের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য নেই। আবার বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ না থাকলেও আবেদন করতে গেলেই ৯৯ টাকা বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। সঙ্গে ২ টাকা খরচ হচ্ছে ক্যাশআউটে। এতে অনেক প্রার্থীই সন্দেহ করছেন পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েই। তারা বলছেন, ৫০ হাজার পদের একেকটির বিপরীতে ২০ জন করেও আবেদন করলে মোট প্রার্থী হবেন ১০ লাখ। তাদের একেকজনের কাছ থেকে ৯৯ টাকা হিসাবে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঢুকবে ‘আমার এমপি’র পকেটে!

সম্প্রতি আরেক ই-কমার্স সাইট ইভ্যালির বিজনেস মডেলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের ধরন দেখা যাওয়া নিয়ে ইভ্যালির গ্রাহকদের মধ্যেও ব্যাপক সন্দেহ ও প্রশ্ন দানা বাঁধে। ইভ্যালির বিজনেস কমপ্লায়েন্স খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে একটি কমিশনও গঠন করেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-ক্যাব। এসবের মধ্যেই ‘আমার এমপি’র ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের জন্য এত বড় পরিসরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও তাতে আবেদন ফি রাখা নিয়ে একইভাবে সন্দেহ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুবায়ের নামে একজন প্রার্থী লিখেছেন, ‘ভাইয়া, প্রায় ৫০ হাজার লোক নেবে বলে সার্কুলার দিয়েছে। এত লোক তো বাংলাদেশে কোনো কোম্পানির শুরুতে লাগার কথা না। আমি অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে দেখলাম, বিকাশে ১০০ টাকা নন রিফান্ডেবল দিতে হবে। ১০ লাখ মানুষ আবেদন করলেই তো ১০ কোটি টাকা ক্যাশ!’

গৌর মোহন্ত সুজন লিখেছেন, ‘এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে। এত বড় নিয়োগ আমি বিগত ১২ বছরও দেখিনি। আবার তাদের বিকাশ নাম্বারে ৯৯ টাকা ক্যাশ আউট করতে বলা হয়েছে। জীবনে এমন সিস্টেম দেখিনি (যা সার্কুলারে উল্লেখ্য নেই)। সার্কুলারে যোগ্যতার চেয়ে বেতনও অনেক উল্লেখ করা। এটি কি সঠিক? আমার মনে হয়, ভালোভাবেই খোঁজখবর নিয়ে তারপরই টাকা দিয়ে আবেদন করা উচিত।’

বিজ্ঞাপন

পিঙ্কু দাস লিখেছেন, ‘আমি খুবই আশাবাদী ছিলাম আমার এমপির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে। কিন্তু যখন দেখলাম অ্যাপ্লাই করার শেষ ধাপে ৯৯ টাকা দিতে হয়, তখন থমকে গেলাম। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোথাও কিন্তু লেখা নেই যে অ্যাপ্লাই করতে টাকা লাগবে। এখন সহজ হিসাব, একজনের কাছ থেকে ৯৯ টাকা নিলে তাদের পোস্ট হলো  ১৪৬৭৮৪×৯৯=১৪৫৩১৬১৬ টাকা। একটু ভাবেন ভাই এই টাকা দিয়ে একটা কোম্পানি দাঁড় করানো যায়!’

‘আমার এমপি’র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হলে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে এর জবাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি আইন অনুযায়ী প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থী আইনে মেনে আবেদন ফি জমা দিতে বাধ্য। তাই সার্কুলারে উল্লেখ না থাকলেও আবেদনের সময় টাকা নেওয়া হচ্ছে।

বৃহত্তম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি: আবেদন থেকে কোটি টাকা আয় নিয়ে সন্দেহ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যোগাযোগের কোনো নম্বর না থাকলেও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, রূপনগর এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলা। সুশান্ত দাস গুপ্ত নামে একজন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিষয়ে জানতে চাইলে সুশান্ত দাস গুপ্ত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সারাবাংলাকে বলেন, ‘আবেদন ফি নেওয়ার ব্যাপারে শ্রম আইনে বলা আছে। একজন প্রার্থী আবেদন ফি আইন অনুযায়ী দিতে বাধ্য। আমরা সেই ফি নিচ্ছি। তাদের ইন্টারভিউ বোর্ডে যারা ডাকবেন বা যারা পরীক্ষা নেবেন, তাদের সম্মানি বাবদ অনেক টাকা দিতে হবে। একজন প্রার্থীকে ডাকতে অনেক টাকাই খরচ হবে। কিন্তু ওভারঅল আমরা একটা ফি নিচ্ছি, সেটা ৯৯ টাকা।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য প্রাইভেট কোম্পানিগুলো আবেদন ফি নেয় কি না, জানা নেই। তবে ছোট ছোট কোম্পানিগুলো নিয়ে থাকে। কেউ টাকা নিক আর না নিক, আমরা নিচ্ছি। আর এতে মন চাইলে প্রার্থীরা আবেদন করবে, না চাইলে আবেদন করবে না।’

এত জনবল নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশান্ত বলেন, ‘এটি একটি ই-কমার্স সাইট। এটি আমার একটি বিজনেস। এখানে প্রায় দেড় লাখ লোকের দরকার হবে। তারপরও আমরা প্রথম পর্যায়ে ৫০ হাজারের মতো লোক নিচ্ছি। মানুষ প্রথমে জানুক আগে, তারপর সবাই বিশ্বাস করবে।’

জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ তমাল সারাবাংলাকে বলেন, আমরা বিষয়টি দেখেছি। এ নিয়ে ‘আমার এমপি’ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। আমরা নিজেদের মধ্যেও আলোচনা করছি। বিস্তারিত জানার পর বলা যাবে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘আইনিভাবে তারা নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কি না, সেটি দেখতে হবে। তাদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না কিংবা তারা যে এত বড় বিজ্ঞপ্তি দিলো তার ভিত্তিটা কী— সেটি দেখতে হবে।’

ওই আইনজীবী বলেন, ‘চাকরির আগে প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে— এমন বিষয়টির ভিত্তি শ্রম আইনের কোথাও নেই। শ্রম আইনের বিষয়টি চাকরি পাওয়ার পর থেকে কার্যকরের বিষয়।’ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে দুদকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

আমার এমপি’র সিইও সুশান্ত দাস গুপ্ত ব্যক্তি জীবনে একজন প্রকৌশলী। আমার ব্লগ ডটকম দিয়ে ভার্চুয়াল জগতে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সাল পরবর্তী সময়ে দেশের ব্লগগুলো বন্ধ হতে শুরু করলে এক সময় আমার ব্লগ ডটকমও কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ‘আমার এমপি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে সংসদ সদস্যদের মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানাসহ যোগাযোগের বিভিন্ন তথ্য সংযুক্ত করা হয়। ৩৫০টি আসনের মধ্যে বেশকিছু আসনের এমপিদের জন্য একজন করে অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ দেওয়া হয়। ওইসব অ্যাম্বাসেডরদের কাজ ছিল সাধারণ জনগণ ও এমপির মধ্যে যোগাযোগ সাধন কিংবা আমার এমপির প্ল্যাটফর্মে সাধারণ জনগণ কোনো প্রশ্ন করলে এমপির কাছ থেকে লিখিত বা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ওই প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করা। পরে এসব উত্তর আমার এমপির ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হতো।

শুরুতে এই উদ্যোগটিও বেশ প্রশংসিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে। জনগণের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগের চমকপ্রদ এই উদ্যোগে একাধিক মন্ত্রী ও এমপি এর সঙ্গে যুক্ত হন। তবে ২০১৮ এর নির্বাচনের আগে সুশান্ত তার এলাকা সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে নিজেও নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। পরে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আমার এমপি প্ল্যাটফর্মটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সুশান্ত এরপর ‘দৈনিক আমার হবিগঞ্জ’ নামের একটি স্থানীয় পত্রিকা বের করেন। তিনি নিজেই পত্রিকটির সম্পাদক ও প্রকাশক। পত্রিকাটিতে হবিগঞ্জ-৩ (সদর, লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রকাশ করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়েছিলেন সুশান্ত। গ্রেফতার হওয়ার ২৮ দিন পর গেল জুনে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কারামুক্ত হন তিনি। পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমার এমপির পেইজ থেকে ‘ই-বাংলাদেশ’ নামে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসার ঘোষণা দেন।

পেজটি থেকে জানানো হয়, ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের সদস্য পদ পেয়েছেন তারা। এবারে আমার এমপি’র প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ই-কমার্সের নামে বিশাল এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ পেয়েছে।

সারাবাংলা/ইউজে/এজেডকে/একে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন