বিজ্ঞাপন

ভালো কাজ করলেই মিলছে বিনামূল্যের খাবার

September 24, 2020 | 1:00 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অন্ধ বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দিয়েছে পথশিশু হৃদয়। আরেক বৃদ্ধকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পানি এনে দিয়েছে রাকিব। ভালো কাজের প্রতিজ্ঞা নিয়েছে আরেক পথশিশু সুমন। ভালো কাজ করলে যে তা বৃথা যায় না, তার প্রমাণ পাচ্ছে এসব শিশু। এসব ভালো কাজের বিনিময়ে তারা দুপুরের খাবার সারছিল ‘ভালো কাজের হোটেল’ থেকে।

বিজ্ঞাপন

ব্যতিক্রমী এই হোটলটি পরিচালিত হচ্ছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। কোনো অর্থ নয়, কেবল কোনো একটি ভালো কাজের বিনিময়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ মানুষকে ভালো কাজের বিনিময়ে খাওয়ানো হচ্ছে এই হোটেলে। কেবল টোকাই কিংবা কুলির কাজ করা পথশিশু নয়, অসহায় দরিদ্র রিকশাচালক কিংবা উদ্বাস্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও ভালো কাজের বিনিময়ে সেখান থেকে খাবার খাচ্ছেন।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাস্টমস হাউজ আইসিডি গেটের পাশের ফুটপাথে দেখা গেছে এমন চিত্র। ফুটপাতের দেয়ালে সেখানে লেখা রয়েছে, ভালো কাজের হোটেলের সদস্যরা দৈনিক ১০ টাকা করে চাঁদা দিচ্ছেন। আর সেসব অর্থ দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিদিন দুপুর দেড়টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুধু তাই নয়, সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের ডেইলি টেন স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা ও অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভালো কাজ করলেই মিলছে বিনামূল্যের খাবার

হোটেলের ফেসবুক গ্রুপ ‘ভালো কাজের হোটেলে’র সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবক সাকিব হাসান শাওন সারাবাংলাকে বলেন, আমরা এই হোটেলে প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ মানুষকে খাওয়াই। এছাড়া আমাদের ভ্যানটি বিভিন্ন পয়েন্টে খাবার পরিবেশন করে। একেক দিন একেক রোডে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সব মিলিয়ে আমরা প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষের রান্না করি। বাসাবোতে আমাদের একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল ‘টেন টাকা স্কুল’ আছে। আমরা সেখানেই রান্না করি।

বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শাওন বলেন, আমরা এখন একবেলা খাবার খাওয়াতে পারছি। কিন্তু আমরা তিন বেলাই খাবার খাওয়াতে চাই। ২৪ ঘণ্টা আমাদের এই ভালো কাজের হোটেলটি খোলা রাখতে চাই। এখন তো ফুটপাতে এই কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। আমরা একটি নির্দিষ্ট জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করছি, যারা খেতে আসছে রোদ-বৃষ্টিতে যেন তাদের কষ্ট করতে না হয়।

সাকিব হাসান শাওন আরও বলেন, ২০১২ সাল থেকেই ভালো কাজের বিনিময়ে আমরা খাওয়ানোর এই কার্যক্রম শুরু করি। গত বছরের ডিসেম্বরের ৫ তারিখ থেকে আমরা সপ্তাহে একদিন করে খাওয়াতম। পরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে প্রতিদিন খাওয়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়। আর গত মাসের ২৯ তারিখ থেকে ভালো কাজের হোটেলের এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনটির আরেক স্বেচ্ছাসেবক রুবেল আহমেদ হিমেল সারাবাংলাকে বলেন, আগে আমরা প্রতি বৃহস্পতিবার খাওয়াতাম। গত মাসের ২৯ তারিখ থেকে এখানে প্রতিদিন খাওয়াচ্ছি। আমরা প্রতিদিন খাওয়াতে চাই। কিন্তু অর্থের সংকট থাকায় তা সব সময় হয়ে উঠছে না।

ভালো কাজ করলেই মিলছে বিনামূল্যের খাবার

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমরা যাদের খাওয়াই তাদের কোনো না কোনো একটি ভালো কাজ করতে হয়। আমরা আমাদের রেকর্ড ফাইলে তা লিপিবদ্ধ করি। কেউ অসহায় কাউকে রাস্তা পার করে দিলো, পানি দিয়ে সাহায্য করলো কিংবা কোনো একটি ভালো কাজ করলো— প্রত্যেকের জন্যই থাকবে খাবার। মাসে সেরা তিনটি ভালো কাজের জন্য আমরা পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছি।

হিমেল বলেন, ঢাকা শহরের সাতটি পয়েন্টে আমাদের ভ্যান নিয়ে আমরা খাওয়াই। আমাদের এখানে খেতে হলে তাদের একটি হলেও ভালো কাজ করতে হবে। আমাদের প্রায় ৩১০ জন সদস্য রয়েছে। সদস্যদের টাকা দিয় আমাদের এই কার্যক্রম চলে। ৩১০ জন সদস্যের টাকা দিয়ে আমাদের ১২ থেকে ১৩ দিন চলে। অনেকেই তাদের জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, কোনো আত্মীয়ের মৃত্যুবার্ষিকী বা অন্য কোনো উপলক্ষে অসহায়দের খাওয়াতে চায়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও সাত-আট দিন চলে। বাকি আট থেকে ১০ দিনের কোনো কোনো দিন আমাদের পক্ষে খাওয়ানো সম্ভব না।

বুধবার দুপুরে কমলাপুর আইসিডি গেটের পাশের ফুটপাতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিল পথশিশু হৃদয় (১৪)। অন্ধ একজন ব্যক্তিকে রাস্তা পার করে দেওয়ার বিনিময়ে সে এই খাবার পেয়েছে। সারাবাংলাকে হৃদয় জানায়, বেশ কিছু দিন ধরে সে এখানে প্রায়ই দুপুরের খাবার খাচ্ছে। কোনোদিন ভাত-মাছ, কোনোদিন খিচুড়ি খাওয়ানো হচ্ছে।

স্টেশনটিতে বোতল, কাগজ ও প্লাস্টিকের পণ্য কুড়ায় আরেক পথশিশু রাকিব (১২)। সারাবাংলাকে সে জানায়, একজন বৃদ্ধকে স্টেশন থেকে বোতলে পানি এনে দিয়েছে। এছাড়া তার আরেক বন্ধুকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছে। আর এসব কাজের বিনিময়ে দুপুরের খাবার সেরেছে রাকিব।

ওই ফুটপাথে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন হালিমা খাতুন (৪০)। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, আমাকে দেখার কেউ নেই। মানুষের কাছে হাত পেতে চলি। এখন তো আর আগের মতো টাকা দেয় না কেউ। তাই খেয়ে না খেয়ে থাকি। চলার পথে কারও ক্ষতি না করে ভালো কাজ করার চেষ্টা করি। আজ এখানকার একটি বাচ্চা শিশুকে আমার একটি কলা থেকে অর্ধেক খাইয়েছি। প্রতিদিনই এমন কোনো না কোনো কাজ করা হয়ে থাকে। যেদিন আয় কম হয়, সেদিন কোনো একটি ভালো কাজ করে এখানে খেয়ে থাকি।

ভালো কাজের হোটেলে একবেলা খেতে পেরে পথশিশু হৃদয়-রাকিবের মতো খুশি এই বৃদ্ধাও। তিনি বলছেন, যারা মানুষকে এভাবে ভালো কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে, তাদের যেন ভালো হয়।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআরর

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন