বিজ্ঞাপন

‘আপনি তো প্রতিজ্ঞা করেছেন গ্রাহককে এক পয়সাও ফেরত দেবেন না’

September 24, 2020 | 11:22 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনের জামিন শুনানিতে আপিল বিভাগ তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আপিল বিভাগ বলেছেন, ‘আপনি তো প্রতিজ্ঞা করেছেন যে গ্রাহকের এক পয়সাও ফেরত দেবেন না। আপনাকে শর্তসাপেক্ষে জামিনের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি সেটাও গ্রহণ করেননি।’

বিজ্ঞাপন

বৃস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ জামিন শুনানির সময় আদালত এসব কথা বলেন।

৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা দিলেই মিলবে জামিন— ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনের আইনজীবীদের এমন প্রস্তাবে ২০১৬ সালে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও ওই আদেশ প্রতিপালন করেনি রফিকুল আমীন। মুক্তিও মেলেনি। দীর্ঘ সময় পর নতুন করে অসুস্থতা দেখিয়ে জামিন চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

জামিন আবেদনের শুনানিতে আদালত রফিকুল আমীনের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আপনার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ। এই অর্থ কাদের? আমরা তো আপনাকে শর্তসাপেক্ষে জামিনের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি সেটা গ্রহণ করেননি কেন? আপনি তো প্রতিজ্ঞা করেছেন গ্রাহকের এক পয়সাও ফেরত দেবেন না।

জামিন শুনানিতে রফিকুল আমীনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ডেসটিনির ৫০ লাখ গ্রাহক আছে। এদের কেউ অর্থ তছরুপের অভিযোগ না করলেও দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিনি আট বছর ধরে কারাগারে আছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ। জামিন দরকার। মরে গেলে কার বিচার করবেন? কারাগারে থেকে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা কি ছয় সপ্তাহের মধ্যে দেওয়া সম্ভব?

বিজ্ঞাপন

এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনাদের বক্তব্য গ্রহণ করেই আমরা আদেশ দিয়েছিলাম। আপিল বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, আপনি এখন পর্যন্ত একটি পয়সাও দেননি। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, জেলের বাইরে এসে যদি অর্থ দিতে না পারেন, তাহলে জামিন দিয়ে কী হবে?

জামিন আবেদনের বিপক্ষে মতামত তুলে ধরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, এই মামলায় ১৭২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন। উনারা অভিযোগ করেছেন, আট বছর ধরে রফিকুল আমিন কারাগারে আছেন। কিন্তু এই আট বছরের মধ্যে ছয় বছরই হাসপাতালে কাটিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে। ডেসটিনির গ্রাহকরা কেন মামলা করবেন? উনি একজন কানাডিয়ান নাগরিক। জামিন পেলে পালিয়ে যেতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

দুদক আইনজীবী আরও বলেন, রফিকুল আমিনের আইনজীবীদের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই আপিল বিভাগ শর্তসাপেক্ষে জামিনের আদেশ দিয়েছিলেন। এটা সর্বোচ্চ আদালতের চাপানো কোনো আদেশ নয়। একশ কোটি টাকা জমা দিয়েও যদি আপনাদের কাছে (আপিল বিভাগ) এসে বলত আর অর্থ দিতে পারছি না, সেটাও হতো। কিন্তু কোনো টাকা জমা না দিয়েই এখন নতুন করে জামিনের আবেদন নিয়ে এসেছেন।

এ সময় দুদক আইনজীবীর কাছে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান জানতে চান, ‘রফিকুল আমীন কি বিচারের সময় নিম্ন আদালতে হাজির হচ্ছেন না?’ দুদক কৌঁসুলী বলেন, ‘উনি ৪/৫ বার হাজির হননি। সাক্ষ্য নেওয়ার দিন থাকলে তখন আবেদন নিয়ে আসেন এবং কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদন দিয়ে বলে অসুস্থ থাকায় তাকে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না।’

বিজ্ঞাপন

এরপর রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেন, গাছেরই তো অস্তিত্ব নাই। আর এই গাছ কি রফিকুল আমীনের? ডেসটিনি অপরাধ করেছে। আর ডেসটিনির এমডি হিসেবে সেই অপরাধের দায় উনার। এ কারণে তিন জেলে আছেন। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ না মেনে নতুন জামিনের আবেদন নিয়ে আসলেন কিভাবে?

তিনি বলেন, ওই সময় আাপিল বিভাগ ভারতের সাহারা গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছিলেন। প্রয়োজনে কারাগারে ভেতরে বৈঠকের ব্যবস্থার কথা এই আদালত বলেছিলেন। কিন্তু উনারা আপিল বিভাগের আদেশ লঙ্ঘন করেছেন।

শুনানির শেষ পর্যায়ে রফিকুল আমীনের আইনজীবী আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জামিন চেয়েছি। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট রয়েছে।’ তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি তো দেশের সবচেয়ে ভালো হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা পাচ্ছেন।’ আইনজীবী বলেন, ‘প্রিজন সেলে থেকে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুরাদ রেজা বলেন, ‘প্রিজন সেল নয়, কেবিনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’

সব পক্ষের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আগামী রোববার আদেশের জন্য দিন ঠিক করে দেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করে দুদক। ওই মামলায় রফিকুল আমীনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তির আদেশ দেন আপিল বিভাগ। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, ছয় সপ্তাহের মধ্যে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা জমা দিতে হবে সরকারি কোষাগারে। ওই অর্থ জমা দেওয়ার কপি নিম্ন আদালতে দাখিল করলেই জামিন পাবেন ডেসটিনির দুই কর্ণধার রফিকুল আমিন ও মোহাম্মদ হোসেন।

আদেশে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া এই টাকা ডেসটিনির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মাঝে বিতরণ করার জন্য দুদক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। তবে চার বছরেও এই শর্ত প্রতিপালন করেননি রফিকুল আমীন। জামিনও পাননি তিনি।

সারাবাংলা/এজেডকে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন