বিজ্ঞাপন

‘বৈধ চুক্তিতে ভাড়া নিলে তবেই মিলবে আইনি সুরক্ষা’

September 25, 2020 | 12:25 am

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীর অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িওয়ালা, বাকি প্রায় ৮০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। এই রাজধানীতেই বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বের খবর পাওয়া যায় প্রায়ই। অনেক ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে বাড়ির মালিকদের অভিযোগ— তারা নিয়ম মানতে চান না, বাসার ক্ষতি করেন। তেমনি বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ— তারা কথায় কথায় ভাড়া বাড়িয়ে দেন, বিনা নোটিশে বাসা ছাড়তে বলেন, বাড়িতে থাকতে হলে ‘অযৌক্তিক’ শর্ত আরোপ করেন।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় অনেক বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নেয়। আইনজীবীরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া— কেউই নিজ নিজ আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যে তার প্রতিকার পাওয়া সম্ভব, সেটি অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। তবে এই আইনি সুরক্ষা বা প্রতিকার পেতে হলে কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে অবশ্যই বৈধ চুক্তি থাকতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে সারাবাংলা ডটনেটের আইনি পরামর্শ বিষয়ক নিয়মিত আয়োজন ‘লিগ্যাল চেম্বার’ শীর্ষক আলোচনায় যুক্ত হয়ে আইনজীবীরা এই দুই পক্ষের আইনি প্রতিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। ‘বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া আইন’ বিষয়ক এ আলোচনাটি সারাবাংলা ডটনেটের পক্ষে সঞ্চালনা করেন ব্যারিস্টার ইফ্ফাত গিয়াস আরেফিন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন আইনি পরামর্শ তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক ও ব্যারিস্টার মো. আব্দুল্লাহ আল শাইখ (নিপ্পন)।

বিজ্ঞাপন

আলোচকরা বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১’-এ বলা হয়েছে, বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে অবশ্যই একটি লিখিত চুক্তিপত্র করে নিতে হবে। সেই লিখিত চুক্তিতেই উল্লেখ থাকবে ভাড়াটিয়া কতদিন পর্যন্ত ভাড়া থাকবেন, কী কী সুবিধা পাবেন বা পাবেন না, বাসা ছেড়ে দেওয়ার কত দিন আগে বাড়িওয়ালাকে জানাতে হবে। দুই পক্ষের কে কী অধিকার সংরক্ষণ করবেন, সেটি মূলত উল্লেখ থাকে চুক্তিনামায়। বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া— কোনো পক্ষ যদি ওই চুক্তি ভঙ্গ করেন, তাহলে ভুক্তভোগী যেকোনো পক্ষ  সিনিয়র সহকারী জজের কাছে মামলা করতে পারবেন।

আইনজীবীরা আরও বলেন, যেকোনো কারণ দেখিয়ে বাড়িওয়ালা চাইলেই ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবে না। জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলে ভাড়াটিয়া ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১’ অনুযায়ী প্রতিকার পাবেন।

বিজ্ঞাপন

তবে বাড়ি ভাড়া বিষয়ক যেকোনো আইনি প্রতিকার পেতে হলে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটিয়ার বৈধ চুক্তি থাকতে হবে বলে জানান আইনজীবীরা। তারা বলেন, বৈধ চুক্তি থাকলে সব অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। লিখিত চুক্তি না থাকলে সেটিও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর জন্য জরিমানার বিধান আছে। আবার বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সময় রশিদ বুঝে নিতে হবে। রশিদ না থাকলেও এর জন্য দুই-তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা করার সুযোগ আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে আলোচকরা জানান, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৫ ধারায় বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের হার সম্পর্কেও বলা আছে। ওই ধারা অনুযায়ী একটি ভবনের দামের ১৫ শতাংশ এক বছরের ভাড়া হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে। তবে এই হার অনেক বেশি। এর মাধ্যমে ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষা হয় না। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে একটা রিট হয়েছিল। সেটি এখনো পেন্ডিং রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীরা বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বাড়িওয়ালা কখনো একমাসের বেশি বাসাভাড়া অগ্রিম হিসেবে নিতে পারেন না। যদি তিনি নেন, সেটা অবৈধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া বাড়িতে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া বাড়িওয়ালা দায়িত্ব। বড় ধরনের কোনো মেরামতের প্রয়োজন পড়লে সেটিও বাড়িওয়ালা করে দেবেন। তবে দৈনন্দিন কাজের জন্য যেসব জিনিস ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ভাড়াটিয়াকে করতে হবে। আবার অনেক সময় চুক্তিতে বাড়িওয়ালা বলে দেন, বাড়ি যেমন অবস্থায় ভাড়া হচ্ছে, ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার সময়ও তেমনই থাকতে হবে। এক্ষেত্রে মূল কাঠামো পরিবর্তন না করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।

বাড়ি ভাড়া বাড়ানো বা বাড়ি থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে আইনজীবীরা বলেন, যেকোনো অজুহাত দেখিয়ে বাড়িওয়ালা চাইলেই প্রতিমাসে ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। তবে লিখিত চুক্তিতে এ নিয়ে কোনো শর্ত থাকলে সেই অনুযায়ী ভাড়া বাড়াতে পারবেন। আবার বাড়িওয়ালা আপনাকে যদি উচ্ছেদ করতে চান, অবশ্যই ১৫ দিন আগে নোটিশ জারি করতে হবে। চুক্তি বহির্ভূত কাজ না করলে আপনাকে চাইলেও উচ্ছেদ করতে পারবেন না। তবে বাড়ি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করলে উচ্ছেদের ছয় মাস আগে নোটিশ দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের কারণে অনেকের আর্থিক সামর্থ্য কমে গেছে। সেক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া মওকুফ করা বা কমানোর ক্ষেত্রে কোনো বিধান আছে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনজীবীরা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে ভাড়া মওকুফের বিষয়টি একান্তই বাড়িওয়ালার ওপর নির্ভর করে। তিনি মানবিক দিক বিবেচনা করলে মওকুফ করতে বা কম নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আইনে কিছু বলা নেই।

আইনজীবীরা বলেন, বাড়িওয়ালা যদি জোর করে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে চায়, সেক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া আদালতের দ্বারস্থ হয়ে নোটিশ দিয়ে ডাকের মাধ্যমে ভাড়া দিতে পারবেন। তবে বাড়িওয়ালা এই পদ্ধতিতে ভাড়া না নিতে চাইলে তখন বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণকের কাছে যাওয়া যাবে। তার মাধ্যমে ভাড়ার টাকা দিতে পারবেন ভাড়াটিয়া। বাড়িওয়ালা তিন বছরের মধ্যে সেই টাকা না নিলে তা সরকারের তহবিলে জমা হয়ে যাবে।

আলোচনায় আইনীজীরা আরও বলেন, এলাকাভিত্তিক বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেওয়া হলে সে ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে। সরকারের এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।

সারাবাংলা/এআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন