বিজ্ঞাপন

পুলিশের খাতায় পলাতক, দিব্যি ইউপি চালাচ্ছেন আলী হোসেন চেয়ারম্যান

September 26, 2020 | 1:55 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আলী হোসেন ভুঁইয়া (৫০)। নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার হাইজ্যাদি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান । একটি স্বর্ণ চোরাচালান মামলার আসামি তিনি। গত ছয় বছরে একাধিকবার আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক থাকলেও দিব্যি ইউনিয়ন পরিষদ চালাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সবশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত আলী হোসেন ভুঁইয়া চেয়ারম্যানসহ পলাতক আরও ৯ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার আদেশ দেন। সাত কেজি তিনশ স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে ২০১৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ছয় বছর আগে তদন্ত করতে গিয়ে আলী চেয়ারম্যানের নাম উঠে আসে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৪ সালের ২২ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়শিয়ার কুয়ালামপুর থেকে আসা বিজি-৮৭ ফ্লাইটের যাত্রী নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার বড় আলমদি গ্রামের বাসাদ মিয়ার ছেলে মোহাম্মাদ আল আমীনের (২৫) কাঁধে থাকা ব্যাগ তল্লাসি করে পাঁচটি এক কেজি, একটি ৫০০ গ্রাম ও ১৮টি ১০০ গ্রাম ওজনের সোনার বার উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা। এসব সোনার মোট ওজন ৭ কেজি ৩০০ গ্রাম।

বিজ্ঞাপন

ওই ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান সোনা চোরাচালানের অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর গ্রেফতার মোহাম্মাদ আল আমিন ওই বছর ২৬ আগস্ট আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। জামান, সোহেল, সেলিম ও রমজান নামে চার জন ওই সোনা চোরাচালানে জড়িত বলেও জবানবন্দিতে প্রকাশ করেন আল আমিন। ওই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মচারী মো. ইয়াছিন মিয়া সেলিমকে (৩৫) গ্রেফতার করে।

মামলাটি তদন্তের পর ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড টান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগ হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড স্মাগলিং টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান ২০১৬ সালের ২১ জুলাই ঢাকা সিএমএম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন, আল আমিন, জসিম উদ্দিন, নূর-ই আলম, শংকর সরকার, শহিদুল ইসলাম বাবু, ইয়াছিন ওরফে সেলিম ও ইব্রাহিম শেখকে অভিযুক্ত করেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন ও ইব্রাহিম শেখ পলাতক এবং বাকি আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন: না.গঞ্জের হাইজ্যাদি ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

মোট ১৬ জন আসামির নাম প্রকাশ পেলেও আট জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করায় ঢাকার সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত ২০১৭ সালের ৯ মার্চ সিআইডির কাছে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য প্রেরণ করেন। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ থেকে সিআইডি মামলাটি অধিকতর তদন্ত শুরু করে চলতি বছর ৭ জুলাই সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। সেখানেও চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন আসামির তালিকায় আছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তাকে গত ছয় বছরেও গ্রেফতার করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, গ্রেফতার না হওয়ায় চেয়ারম্যান আলী হোসেন ভূঁইয়া ও তার বড়ভাই নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্যানেল চেয়ারম্যান মিলে এলাকায় ব্যাপকভাবে দখলদারিত্ব চালাচ্ছেন। তারা অবৈধ মানবপাচারের সঙ্গেও জড়িত। অবৈধ কাজের অভিযোগে এলাকাবাসী ঝাড়ুমিছিলসহ বিক্ষোভও করেছেন। এরপরেও শত শত মানুষ তাদের ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ে সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার দলীয় ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে থানার দালালি থেকে শুরু করে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দাফতরিক দালালির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করছে। নিজের দাপট খাটিয়ে তার ছোট ভাই আলী হোসেন চেয়ারম্যানকে দুই দুইবার বিনা নির্বাচনে বিজয়ী করেন। যার কোন আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি সম্পৃক্ত থাকা দূরের কথা সাধারণ সদস্যপদও ছিল না। তার পেশা ছিলো অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালান ও অবৈধ মানব পাচারের ব্যবসা। এলাকায় মানুষ তাদের এরকম শত শত অপর্কমের পরও অদৃশ্য অপশক্তির ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

দুই মেম্বর শাহাবুদ্দিন ও কবির হোসেন ভুঁইয়া বর্তমানে বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধ কাজের টাকা পয়সা উত্তলন করেন এবং সকল অপর্কমে সহযোগিতা করেন।

জানতে চাইলে ওই ইউনিয়নের শাহাবদ্দিন মেম্বার শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সারাবাংলাকে বলেন, আলী হোসেন চেয়ারম্যানের নামে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি মামলা আছে। সেটির বিচার চলমান আছে বলে জানি। এর বাইরে ক্ষমতা খাটিয়ে টাকা উত্তোলন করেন এমন তথ্য জানা নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে। আমি কোনো অবৈধ কাজের সাথে জড়িত নই। নিজের ব্যবসা করি আর মেম্বারি করি।’

অন্যদিকে কবির হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যানের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আল আমিন নামে এক আসামি চেয়ারম্যানের নাম জড়িয়ে দিয়েছেন। চেয়ারম্যান এখন দিব্যি ইউনিয়ন পরিষদ চালাচ্ছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশ কেন ধরে না সেটি আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে জানতে আড়াইহাজারের হাইজ্যাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হোসেন ভুঁইয়াকে মোবাইলে বার বার ফোন করলেও কল রিসিভ করেননি তিনি। এরপর মেসেজ করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।

সারাবাংলা/ইউজে/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন