বিজ্ঞাপন

প্রাণিসম্পদ গবেষণায় অগ্রগতি, কিউসি ল্যাবে নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য

September 28, 2020 | 10:21 am

জোসনা জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

সাভার থেকে ফিরে: প্রাণিসম্পদ গবেষণায় গত কয়েকবছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বিদেশি জাতের বিভিন্ন প্রাণী প্রজননের মাধ্যমে প্রাণীজ আমিষ সরবরাহ যেমন বেড়েছে, একইসঙ্গে দেশীয় জাত সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সর্বাধুনিক কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব, যেটি এখন জনবল নিয়ে পূর্ণোদ্যমে চালুর অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ল্যাব চালু হলে খাদ্যপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সনদ সংক্রান্ত জটিলতার অবসানও ঘটবে।

বিজ্ঞাপন

সাভারে অবস্থিত ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)’, ‘কিউসি ল্যাব’ ও ‘গো-প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামার’ সরেজমিন ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল এমন চিত্র।

ঢাকার সাভারে দেশে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগারটি (কিউসি ল্যাব)। চলতি বছরেই ১ দশমিক ৬৪ একর জমির ওপর স্থাপন করা হয়েছে এই ল্যাব। ছয় তলা ল্যাব ও চার তলা ডরমেটরিসহ যন্ত্রপাতি ও আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ১০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে। প্রায় শতভাগ কাজ শেষ হলেও ল্যাবটি পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও একবছর মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

গবেষণাগারটিতে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী ও আইনগত প্রতিষ্ঠানের জন্য পশুপাখির খাদ্য, খাদ্য সংযোজক ও প্রিমিক্স, বায়োলজিক্সসহ প্রাণিজাত পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করার সুবিধা রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক ড. মোস্তফা কামাল সারাবাংলাকে জানান, তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে এই ল্যাবের ফলাফল দেওয়া হয়। অনলাইনেও ফল পাওয়া যায়। পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে সনদ সংগ্রহ করা যায়।

ল্যাবের প্রায় সব কাজ শেষ হলেও জনবল সংকটে এই ল্যাবের শতভাগ কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। ড. মোস্তফা কামাল বলেন, জনবলের চরম সংকট বিরাজ করছে এখানে। নতুন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৯৪ জন কর্মকর্তার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজস্ব খাতের প্রচুর বরাদ্দ প্রয়োজন। আশা কর শিগগিরই এগুলোর ব্যবস্থা করতে পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করতে পারব।

বিজ্ঞাপন

ড. মোস্তফা কামাল সারাবাংলাকে বলেন, বর্তমানে প্রাণিসম্পদ খাত নিট প্রাণিজ আমিষের বার্ষিক চাহিদার শতকরা ৫৭ দশমিক ৭২ শতাংশ জোগান নিশ্চিত করেছে। মাথাপিছু দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের বার্ষিক চাহিদার বিপরীত দৈনিক ১২৬ দশমিক ২০ গ্রাম মাংসের জোগান দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রাণিজ খাদ্যের গুণগতমান নিশ্চিতে গবেষণাগারে পরীক্ষার বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকেই আন্তর্জাতিক মানের এ কিউসি ল্যাবটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ল্যাব ঘুরে দেখা গেছে, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মান পরীক্ষা করা হয়ে থাকে এখানে। এই ল্যাবে দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত পণ্যের গুণগতমান পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায় থেকে গৃহীত দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত পণ্যের নমুনার মান পরীক্ষা করে জাতীয় ডাটাবেজ তৈরির কাজও চলছে এখানে। প্রাণিখাদ্য ও প্রাণিজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সব আদালতকেও নমুনা পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল এলাকাজুড়ে এটি প্রতিষ্ঠিত। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে বিভিন্ন শেডে চলছে নানারকম কর্মকাণ্ড। ভেতরে না গেলে বোঝার উপায় নেই এই প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে প্রাণিসম্পদে বিপ্লব ঘটিয়েছে গবেষণার মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। গরু, মহিষ, ভোড়া, ছাগল, হাঁস, কবুতর, কোয়েল, তিতির ও মুরগীর একাধিক জাত উন্নয়ন করেছে বিএলআরআই। দেশীয় জাতের গরুর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় রেড চিটাগাং ক্যাটেল, মুন্সিগঞ্জ ক্যাটেল (মিরকাদিমের গরু) এবং বিএলআরআই ক্যাটেল ব্রিড-১-এর জাত সংরক্ষণের কাজ চলছে এখানে। পাশাপাশি পাঁচটি ফডারের (ঘাস) জাত উন্নয়ন করা হয়েছে।

বিএলআরআই সংশ্লিষ্টরা জানালেন, গবাদি প্রাণী ও মুরগির দু’টি ভ্যাকসিন এবং দু’টি রোগ নিয়ন্ত্রণ মডেল উদ্ভাবন করা হয়েছে। তাছাড়া প্রাণি ও পোল্ট্রি খাদ্য, পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, খামার বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও বায়োস্লারি থেকে উন্নত জৈব সার উদ্ভাবন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, গরুর জাত উন্নয়ন ও বেশি দুধ উৎপাদনের জন্য ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ গো-প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামারটি। এখানে বিশালাকার ষাঁড় উৎপাদনের উপযোগী জাতসহ বেশি দুধ দিতে সক্ষম গাই গরুও উৎপাদন করা হচ্ছে। এখানে উন্নত জাতের সিমেন উৎপাদন করে ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ পরিদর্শন করেছেন সাভারের বিএলআরআই, কিউসি ল্যাব ও গো-প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামার। তাকে এখানকার বিভিন্ন শেড ও ল্যাব ঘুরিয়ে দেখান প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার, বিএলআরআই’র মহাপরিচালক ড. নথু রাম সরকার, এস্টাবলিস্টমেন্ট অব কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি ফর লাইভস্টক ইনপুট অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোস্তফা কামাল, এআইঅ্যান্ড ইটি প্রকল্পের পরিচালক ড. বেলাল হোসেনসহ সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পরে জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, বাংলাদেশে বিগত একদশকে ব্যপক সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদা বেড়েছে। বর্ধিত চাহিদার জোগান নিশ্চিত করার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলে দেশে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়ছে। বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। তবে দুধ উৎপাদন ও দুধের ভ্যালু-অ্যাডিশন এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে আমরা আশা করছি এখানকার সবগুলো অংশ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে সমানভাবে কাজ করতে পারলে আগামী কয়েক বছরে প্রাণিসম্পদ খাতে আমরা আরও অনেক এগিয়ে যাব।

সারাবাংলা/জেজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন