বিজ্ঞাপন

ভাসছি হাতে তোমার হাত খুঁজেছি

September 28, 2020 | 11:40 pm

ফারহানা হোসেন শাম্মু

কন্যাশিশু দিবসটা আমার ভালোই লাগে। আমাদের পরিবারের একগুচ্ছ কন্যাশিশু এই এক সপ্তাহের মধ্যে জন্মেছে। প্রতি বছর মনে হয় ওদের জন্যই যেন ঘোষণা করা হয়েছে দিবসটি। অনেকেই দেখলাম আগে খেয়াল করেননি দিবসটি। এইবার কি বেশি নজর কাড়লো আয়োজনটা?

বিজ্ঞাপন

কন্যাশিশু দিবসের কোল ঘেষে এমসি কলেজের বর্বর ঘটনাটি ঘটেছে। সবার ক্ষোভ আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছে এই বর্বর সময়ে কন্যাশিশু দিবস উদযাপনের আদিখ্যেতা। কিন্তু উদযাপনের মতো একদম যে কারণ নেই তা কিন্তু নয়।

একজন স্বামী তার নিপীড়িত স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে মামলা করেছে এই ঘটনাটির পরে। মেয়েটি অত্যাচারিত কিন্তু একা নয় আর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ‘ভাসছি হাতে তোমার হাত খুঁজেছি’, কিন্তু হাত হাতড়ে হাত না পাওয়ায় অনেক সাইফুল, রবিউল, তারেক, মাহফুজ, অর্জুন, মাহবুব জন্মেছে একেকটি মায়ের কোলে।

বিজ্ঞাপন

দহন সিনেমাটা দেখেছেন কেউ? ঋতুপর্ণা স্বামীর সঙ্গে সম্ভবত সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো। ফেরার পথে হামলা করে ঠিক এমসি কলেজের মতো ক্ষমতাধর কিছু যুবক। কিছুই করতে পারেনি তার স্বামী। চোখের সামনে নির্মমতার শিকার হলো স্ত্রী। পরবর্তীতে সমাজ, পরিবার, ক্ষমতার কাছে আরও একবার জানু নত করে চুকিয়ে দিতে বলেছিলো স্বামী সবকিছু। মেয়েটাকে সমস্ত নিন্দার মুখে একা লড়ে যেতে হয়েছিলো যাতনার চেয়েও গভীর যাতনায়। আদালত, সমাজ, পরিবারের হাতে সম্মানচ্যুত হতে হয়েছিলো তাকে আরও কয়েকবার।

সেই সিনেমায় ধর্ষকের পাশে শিক্ষিত ধনবান বাবা ছিল। ধর্ষিতার বিরুদ্ধে পরিবার, শ্বশুর বাড়ি ছিল। সংবাদপত্র অন্বেষণ করেছে তার ছিদ্র। কিন্তু দিন একটু হলেও বদলেছে। ‘আইনের শাসনে’ অপরাধীর কী হবে জানি না। কিন্তু কাঁদো কাঁদো অসহায় কার্টুন মেয়ের গায়ে অজ্ঞাতনামার থাবার বদলে প্রত্যেকটি অভিযুক্ত আসামীর স্পষ্ট ছবি পত্রিকায় এসেছে। তাদের পরিবার নত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের যেইসব ছাত্র কিংবা অছাত্র নামক ‘হিমাদ্রি'র কাছে প্রশাসন ও কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ছিল ‘শির নেহারি নতশির’, আজ তারা সত্যের মতো উলঙ্গ। জানামতে 'খতিয়ে দেখা দরকার তারা জামাত-বিএনপি সংশ্লিষ্ট কিনা’ এমন কোনো স্টেটমেন্টও আসেনি জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের কাছ থেকে। সরকার সহযোগিতা না করলে সোনার ছেলেদের স্পষ্ট ছবি মিডিয়াতে প্রকাশ করবে, এতটা স্বাধীন সেবামাধ্যম তেমনটি শোনা যায়নি নিকট অতীতে।

বিজ্ঞাপন

‘সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামিদের পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি কোনো আইনজীবী’। লিখতে লিখতে বদলে যেতে পারে ঘটনা তবু কিছু সময়ের জন্য পত্রিকার এই সংবাদটি আমাদেরকে কৃতার্থ করেছে। ধর্ষকের বাবা দাঁড়াননি ছেলের পক্ষে। বলেননি একবারও, ‘আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না’। ন্যায্য বিচার যাই হোক মাথা পেতে নেবেন তিনি। ধন্যবাদ সেই বদলে যাওয়া গ্রামের সাধারণ বাবাকে।

অসম আইন- নানা পুরুষতান্ত্রিক কোটার মধ্য দিয়ে দিন কিন্তু বদলাচ্ছে। কত সহজে মেয়েরা মেনে নিয়েছি পেটে ধরবে মা, পদবী জন্মস্থান হবে বাবার। সন্তান হয়ে জন্মাবো কিন্তু সম্পদের ভাগে ছেলের অর্ধেক হিসেবে বিবেচিত হবো। অথচ ছোট্ট সজীব সহ্য করতে পারেনি যে তার চার বছরের বোনের প্রতি মা বাবার অতিরিক্ত মনোযোগ। ১৪ বছরের কিশোর গলা টিপে মেরে ফেলেছে তার চার বছরের ছোট্ট বোনকে। অথচ সর্বংসহা নারীরা সব কিছু মেনে কী সুন্দর বড় করছে নয় মাস পেটে ধরে তারেক বিন মুসাকে (মুসার ছেলে তারেক)। এমসি কলেজের মতো এই নির্মম ঘটনাটাও একটা সময় বদলের সাক্ষী যেখানে মিনা কার্টুনে মিঠুদের দিন বদলাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ভারতে হিন্দু সম্পত্তি আইনে নারী পুরুষ সমান অংশীদারিত্ব আইন দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। ধন্যবাদ ধর্মীয় নেতাদের। তাদের ধর্ম অতলে যায়নি এই রায়ের মাধ্যমে। আমাদের দেশেও মাত্রই হিন্দু বিধবা স্ত্রী পেয়েছে তার স্বামীর সব সম্পত্তির অধিকার। আরও একবার কৃতজ্ঞতা ধর্মগুরুদের, তাদের দেবতার আসন টলেনি এই আইনি সিদ্ধান্তে।

পথের অনেক বাকি। কিন্তু যতটা পথ এগিয়েছে তাকে স্বাগতম। বদলে যাবার দিনগুলো আমাদেরকে আরও বদলে যাবার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাক। অর্ধেক নর আর অর্ধেক নারী মিলে এগিয়ে নিয়ে যাক প্রিয়তম স্বদেশ — ভাসছি হাতে তোমার হাত খুঁজেছি।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন