বিজ্ঞাপন

কুকুর অপসারণ ‘অযৌক্তিক’, বিরোধিতায় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো

September 29, 2020 | 8:00 am

সাদ্দাম হোসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরই মধ্যে বেশকিছু কুকুরকে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে অপসারণও করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগকে নগরবাসীর একাংশ সমর্থন জানালেও বিপক্ষেও দাঁড়িয়ে গেছেন একপক্ষ। বিশেষ করে প্রাণী অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলো অনলাইন ও অফলাইনে বেশ সোচ্চার। এর মধ্যে কুকুর অপসারণে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ বন্ধ করতে হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে অনড়— তাদের এই উদ্যোগ জনস্বার্থের পক্ষে।

বিজ্ঞাপন

ডিএসসিসি বলছে, স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে কুকুর অপসারণ বা স্থানান্তর কেবল নয়, চাইলে কুকুর নিধনও করতে পারবে তারা। তবে নিধন নয়, আপাতত অপসারণকেই বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান বলে মনে করছে তারা। আর প্রাণী অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন— কুকুর আপসারণ বা স্থানান্তরে কোনো সমাধান মিলবে না, প্রয়োজন বন্ধ্যাত্বকরণ। তার জন্য আবার কোনো পরিকল্পনা নেই ডিএসসিসি’র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই ডিএসসিসির বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে সংস্থার মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ‘ঢাকাবাসীর অভিপ্রায় অনুযায়ী’ বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আমরা চিন্তাভাবনার কথা জানান। এরপর শুরু হয় কুকুর অপসারণের পরিকল্পনা। ওই সময় ডিএসসিসি’র ধারণা ছিল, ৩০ হাজারেরও বেশি বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে ডিএসসিসি এলাকায়। শুরুতে অতি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণের পরিকল্পনা করে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের সারাবাংলাকে বলেন, ধানমন্ডি লেক, নগর ভবন ও রমনা পার্ক এলাকায় থাকা বেওয়ারিশ কুকুরগুলো অপসারণ করা হয়েছে। প্রায় শখানেক কুকুর অপসারণ করে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে রেখে আসা হয়েছে।

ডাম্পিং স্টেশন থেকে কুকুররা ফিরে আসবে কি না, বা সেখানে তাদের তদারকির বিষয়গুলোর দেখভাল কিভাবে হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে হাজারখানেক কুকুর রাখলেও খাদ্যের সংকট হবে না। তাছাড়া তারা পালিয়ে আসতেও পারবে না। সে সুযোগ নেই। প্রাচীর টপকে বের হতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

কুকুর অপসারণের ক্ষেত্রে আইনি ব্যখ্যা দিয়ে আবু নাছের বলেন, প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী, প্রাণী অপসারণ অপরাধ। সেটি ব্যক্তি কিংবা সংস্থার ক্ষেত্রে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের যে মৌলিক কার্যাবলি আছে, সেখানে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলের ১৫.৩, ১৫.৪, ১৫.৫ ও ১৫.১০ এবং পঞ্চম তাফসিলের ৫১ ধারা ও সপ্তম তফসিলের ১৮ ধারা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন যদি মনে করে কোনো বেওয়ারিশ কুকুর অথবা কোনো বেওয়ারিশ প্রাণীকে অপসারণ করবে, তবে সেটি তারা করতে পারবে। এমনকি নিধনও করতে পারে। কিন্তু আমরা নিধন করছি না, শুধু অপসারণ করছি।

ডিএসসিসি আইন দেখালেও তাদের এ উদ্যোগকে ‘অযৌক্তিক’ মনে করছেন পরিবেশবিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ কর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কুকুর নিধন কিংবা অপসারণে কোনো সমাধান মিলবে না। সঠিক ও কার্যকর সমাধানে যৌক্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। কুকুরকে বন্ধ্যাত্ব করতে পারলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান মিলবে বলে মনে করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

কুকুর অপসারণ ‘অযৌক্তিক’, বিরোধিতায় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জানালেন, তাদের এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনা ছিল ছয় দিনব্যাপী কুকুর অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। ওই ছয় দিনে আমরা প্রায় একশ কুকুর অপসারণ করেছি। এখন পরে কী করা হবে, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাই এখন আর কুকুর অপসারণ করা হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

প্রাণী অধিকার সংগঠনের কর্মীরা বলছেন, বেওয়ারিশ কুকুরকে আঘাত না করলে তার আক্রমণের শিকার হওয়ার নজির বিরল। বরং মানুষের সঙ্গে কুকুর বন্ধুসুলভ আচরণ করে থাকে। তাছাড়া আমাদের দেশে শহর এলাকায় বাসায় কুকুর পালন করার সুযোগ সীমিত। ফলে বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে এবং এসব কুকুরকে সাধারণ মানুষ সবাই সহায়তা করারই চেষ্টা করে। ফলে ডিএসসিসি’র কুকুর অপসারণ কার্যক্রম কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি কোনো সমাধান নয়।

বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের প্রতিবাদে সড়কে রাজধানীবাসী

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, স্রষ্টা সবকিছুর ভারসাম্য রেখেই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে। এটা হচ্ছে ধর্মীয় দিক। আর যদি বৈজ্ঞানিকভাবে বলতে হয় তবে বলব— এটাকে বলা হয় বাস্তুসংস্থান। আবার ফুডচেইন (খাদ্যচক্র) বলেও একটা কথা রয়েছে। এখন এ ফুডচেইনটাই হলো— একটা ছোট পিঁপড়াকে ব্যাঙে খাবে, ব্যাঙকে সাপ খাবে, সাপকে ঈগলে খাবে, ঈগলকে কুকুর খাবে। এভাবেই কুকুর মারা গেলে কুকুরকে অন্য কোনো প্রাণী খাবে। না খেলে পচে প্রকৃতিতে নিউট্রেশন দেবে। এভাবেই প্রকৃতির প্রতিটি স্তরেই ফুডচেইন থাকে, সেটি ঠিকঠাকমতো থাকলে কোনো সমস্যা হয় না।

পরিবেশ বিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বলেন, এখন কুকুর যদি না থাকে, দেখা যাবে ইঁদুর বেড়ে গেছে। এরপর ইঁদুর যখন অনেক বেশি বেড়ে যাবে, তখন হয়তো প্লেগের মতো মহামারি দেখা দেবে। তখন আমাদের কী হবে? এখন যে বলা হচ্ছে কুকুর বেশি হয়ে গেছে, এটা কোন জরিপের ভিত্তিতে বলা হয়েছে? কোনো জরিপ তো করা হয়নি। তাহলে কেন কুকুর বেশি বলা হচ্ছে? সুতরাং ডিএসসিসি যেটি করছে, এটি কোনো সমাধান নয়।

কুকুর অপসারণের পেছনে ‘অন্য কিছু’ রয়েছে কি না— সে শঙ্কা জানিয়ে ড. কামরুজ্জামান বলেন, এত প্রাণী থাকতে কুকুরের পেছনে লাগার পেছনে আমি মনে করি বড় অঙ্কের আর্থিক কোনো বাজেট থাকতে পারে। এজন্য কুকুর অপসারণে কোনো সুফল না থাকলেও সরকারকে ভুল বুঝিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত কোনো কোনো গোষ্ঠী। তাই আমরাও বৈজ্ঞানিকভাবে কুকুর নিয়ে সম্পূর্ণ একটি পরিসংখ্যন তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়গুলো অবহিত করব।

একই কথা বললেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জলাতঙ্ক সংক্রান্ত পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে কুকুর নিধন কিংবা অপসারণ করলে জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি বাড়বে। দেশে প্রায় ১৬ লাখ কুকুরের মধ্যে কোনো কুকুরের জলাতঙ্ক হলে এর জন্য আমরাই দায়ী। তাই সিটি করপোরেশন যখন কুকুর অপসারণ করে, সেটাকে আমি বলি অকার্যকর উদ্যোগ। কুকুর রক্ষায় আমরা ডগ ওনারশিপ প্রমোশন এবং কুকুরের জন্ম নিয়ন্ত্রণে ডগ পপুলেশন পলিসি কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।

বেশকিছু পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে প্রায় ১৬ লাখ কুকুর আছে। এর প্রায় ১৭ ভাগ পোষা কুকুর এবং প্রায় ৮৩ ভাগ বেওয়ারিশ কুকুর আছে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ লাখ কুকুর বেওয়ারিশ। এ প্রাণীকে কাজে লাগানোর জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় আনা উচিত। বুদ্ধিমান ও অনুভূতিপ্রবণ প্রাণীর কুকুর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন থেকে নিরাপত্তার কাজে কুকুরকে ব্যবহার করে আসছে। নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কুকুরকে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মানুষের সহায়তায় নানা ধরনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

কুকুর অপসারণ কার্যক্রমের বিরোধিতায় সোচ্চার প্রাণিকল্যাণ নিয়ে কর্মরত সংগঠন ও কর্মীরাও। বেওয়ারিশ কুকুর স্থানান্তর বন্ধে এরই মধ্যে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন অভয়ারণ্য, পিপলস ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার এবং চিত্রনায়িকা জয়া আহসান। আগামী ৬ অক্টোবর রিটের শুনানির তারিখ নির্ধারিত আছে।

রাজধানী থেকে কুকুর অপসারণ বন্ধ চেয়ে জয়া আহসানের রিট

রিট সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব বলেন, রিট পিটিশন দায়ের করার আগে থেকেই ডিএসসিসি’র মেয়রের সঙ্গে বসার জন্য চেষ্টা করছিলেন রিট আবেদনকারীরা। ডিএসসিসি মেয়র মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটায় বসার জন্য সময় দিয়েছেন। আবেদনকারী ও আন্দোলনকারীরা তার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। এটি জানানোর পর আদালত রিট আবেদনের শুনানি ৬ অক্টোবর পর্যন্ত মুলতবি করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষও একই যুক্তিতে সময় আবেদন করেছিলেন।

আদালতে রিট আবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণী কল্যাণ আইন-২০১৯ এর ধারা-৭ অনুযায়ী বেওয়ারিশ কুকুরসহ কোনো প্রাণীকে অপসারণ, স্থানান্তরিত ও ফেলে দেওয়া যাবে না। অথচ ডিএসসিসির মৌখিক আদেশে টিএসসি ও ধানমন্ডি থেকে বেওয়ারিশ কুকুর তুলে নিয়ে মাতুয়াইল ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এজন্য কুকুর স্থানান্তরের বিষয়ে ডিএসসিসির সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের বৈধতা রিট আবেদনে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

সারাবাংলা/এসএইচ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন