বিজ্ঞাপন

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবন ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’য় কাটবে সংকট

October 1, 2020 | 8:05 am

আমজাদ হোসেন মিন্টু, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

বগুড়া: এককালে হলুদ, শুকনা মরিচ, জিরা, ধনিয়ার মতো মসলাগুলোর ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ ছিল পাটায় বেটে নেওয়ার মধ্যে। সময়ের বিবর্তনে এখন এসব মসলাই কেবল নয়, গরম মসলা হিসেবে পরিচিত এলাচ-দারচিনির গুঁড়াও দখল করে নিয়েছে বাজার। ঘরে ঘরে নিয়মিত রান্নায় এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও এখন আর প্রশ্ন নেই। এমনকি বহুল ব্যবহৃত না হলেও আদা-রসুনের গুঁড়াও মিলছে বাজারে। এদিকে, পেঁয়াজ নিয়ে যখন গত বছর থেকেই তীব্র সংকট মাথাচারা দিয়ে উঠেছে, তখন এই সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য মসলার মতো ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’ নিয়ে হাজির হয়েছে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন

যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করে কাঁচা পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন করেছে প্যাকেটজাত ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’। সম্পূর্ণ দেশীয় এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ছোট পরিসরেও উদ্যোক্তারা পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদন করতে পারবেন, সংরক্ষণও করতে পারবেন সহজেই। গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদন প্রক্রিয়া ছড়িয়ে দিতে পারলে আমদানি না করেও দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র এরই মধ্যে দেশীয় এই পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলকভাবে পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদন শুরু করেছে।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রে ড. মাসুদ আলমের তত্ত্বাবধানে গবেষণাগরে পেঁয়াজের গুঁড়া উৎপাদন চলছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণারত এই বিজ্ঞানী জানান, অনেক দেশেই পেঁয়াজের গুঁড়ার প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে নেই। আবার অন্য দেশগুলোতে পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদনে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সেটি ব্যয়বহুলও বটে। এ অবস্থায় সহজে পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদনের দেশীয় পদ্ধতি উদ্ভাবন নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবন ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’য় কাটবে সংকট
বিজ্ঞাপন

পেঁয়াজ গুঁড়া উৎপাদনের পদ্ধতি ব্যাখা করে ড. মাসুদ সারাবাংলাকে বলেন, এই পদ্ধতিটি খুব সাধারণ। প্রথমে খোসা ছাড়িয়ে পেঁয়াজ স্লাইস করে ভাপ দিতে হবে। পরে তা শুকিয়ে নিয়ে সোডিয়াম মেটাবাইসালফেট দ্রবণে ৪/৫ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর আবার তা শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর সাধারণ ব্লেন্ডিং মেশিনেই এটি গুঁড়া করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা একবছরের কথা বললেও এই পেঁয়াজ গুঁড়া দুই বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া পদ্ধতিটি জটিল না হওয়ায় ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও ঘরে বসেই এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব। ফলে এই প্রযুক্তিটি নিশ্চিতভাবেই পেঁয়াজ সংকটের সমাধান বয়ে আনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটি প্রযুক্তি।

বিজ্ঞাপন

পেঁয়াজ সংরক্ষণে অপচয় ও বাজারে সংকট

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আমাদের দেশে বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন গড়ে ২৫ লাখ মেট্রিক টনের আশপাশে। সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করায় উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ছয় থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়। অথচ দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা মূল উৎপাদন, অর্থাৎ ২৫ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। অর্থাৎ গড়ে প্রায় আট লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে দেশে। এ কারণেই এই পণ্যের বাজারে আমদানি নির্ভরতা অনস্বীকার্য। ফলে আমদানি ব্যাহত হলেই সংকট তৈরি হয় পেঁয়াজের বাজারে।

বিজ্ঞাপন
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবন ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’য় কাটবে সংকট

গত বছর এই সংকটের সব মাত্রা ছাড়ানোর স্মৃতি এখনো সবার মনেই টাটকা। এ বছরও ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণায় সেই শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল সবাইকে। এমন অবস্থায় গত বছর থেকেই পেঁয়াজের আবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র বলছে, তাদের উদ্ভাবন ‘পেঁয়াজ গুঁড়া’ হতে পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ।

গবেষক ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করায় সংরক্ষণ করতে গিয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজের অপচয় ঘটে থাকে। কাঁচা পেয়াজ থেকে গুঁড়া পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতে পারলে সেই অপচয় শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। ফলে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই দেশের বাৎসরিক চাহিদা মোটামুটি পূরণ সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের আবাদ প্রসারের মাধ্যমে চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত উৎপাদন করে পেঁয়াজ সংকটের স্থায়ী সমাধানই সম্ভব।

পেঁয়াজ গুঁড়ায় উচ্চ ফলনশীল জাতের আবাদও বাড়বে

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পোস্ট হারভেস্ট) ড. মো. মাসুদ আলম ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্যানতত্ত্ব) কৃষিবিদ নুর আলম চৌধুরী জানান, পেঁয়াজের ফলন বাড়াতে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় জাতের পেঁয়াজের হেক্টর প্রতি উৎপাদন যেখানে ১০ থেকে ১১ টন, সেখানে তাদের উদ্ভাবিত গ্রীষ্মকালীন বারি-৫ পেঁয়াজের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ২৩ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এমনকি বারি-২, ৩, ৪ ও ৬ জাতের পেঁয়াজের ফলনও সাধারণ জাতের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এসব পেঁয়াজের সংরক্ষণকাল সর্বোচ্চ তিন মাস। ফলে এসব জাতের পেঁয়াজের আবাদ প্রসার পায়নি। এ কারণেই তারা পেঁয়াজের উৎপাদন বা ফলনের পরিবর্তে সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছেন। আর তাতেই উদ্ভাবিত হয়েছে পেঁয়াজ গুঁড়া।

গবেষক মাসুদ আলুম সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের উদ্ভাবিত পেঁয়াজ গুঁড়া পদ্ধতি প্রয়োগ করলে সংরক্ষণজনিত সমস্যা থাকবে না বললেই চলে। কারণ পেঁয়াজের গুঁড়া অনায়াসে একবছর প্যাকেটজাত করে সংরক্ষণ করা যায়। এতে দুইভাবে সুবিধা পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, দেশে সাধারণভাবে পেঁয়াজের যে ফলন হয়, তার বড় অংশ এই পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে এই ফলনের অপচয় রোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, পেঁয়াজের উচ্চ ফলনশীল জাত থাকলেও কেবল সংরক্ষণকাল কম হওয়ায় সেগুলোর আবাদ নেই বললেই চলে। গুঁড়া করে সংরক্ষণ করতে পারলে ওই পেঁয়াজের আবাদের প্রসার ঘটাতে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া যাবে।

এই গবেষক বলেন, উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোর আবাদ বেশি হলে এখন যে পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়, একই জমিতে এখনকার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ পরিমাণ ফলন পাওয়া সম্ভব। আর গুঁড়া পদ্ধতিতে সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় সেগুলোর অপচয়ও হবে না। ফলে পেঁয়াজের যে সংকট প্রতিবছর দেখা দেয়, সেই সংকট তৈরির কোনো সুযোগই থাকবে না।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন