বিজ্ঞাপন

হেলাল হাফিজ: সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক মহৎ কবি

October 7, 2020 | 3:49 pm

আসাদ জামান

বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ বা আপন মনের ভাবনা-কল্পনাকে যিনি অনুভূতি-স্নিগ্ধ ছন্দোবদ্ধ তনুশ্রী দান করতে পারেন, তিনিই কবি। আদি কবি বাল্মীকির ক্রৌঞ্চমিথুন-বিয়োগজনিত শোকই শ্লোকরূপে উৎসারিত হয়েছিল। সহচরী-বিয়োগকাতর কৌঞ্চের বেদনায় কবির চিত্তে বেদনার সঞ্চার হয়। এই বেদনা হতে সহসা ‘পরিপূর্ণ বাণীর সঙ্গীত’ জন্মগ্রহণ করে অপূর্ব ছন্দে কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হলো—

বিজ্ঞাপন

‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগতঃ শাশ্বতী সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমধবী কাম মোহিতম।।’’

অর্থাৎ কবির বেদনাবিদ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্মভূমি। সময়বিশেষ কোনো একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ বেদনা যখন প্রকাশের পথ পায়, তখনই কবিতার জন্ম। কবি বেদনাকে আস্বাদ্যমান রস-মূতি দান করেন।

বিজ্ঞাপন

শুধু আধুনিক নয়, বাংলা সাহিত্যের সর্বাধুনিক কবি হেলাল হাফিজের কবিমানস নিয়ে আলোচনা করতে বসে কেন বাল্মীকি দিয়ে শুরু, কেন ফিরে যাওয়া খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে?— সচেতন পাঠক মাত্রই এ প্রশ্ন তুলতে পারেন! এ ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজনে বলা যেতে পারে, আলোচনার শুরুতে একটা যুতসই ‘রেফারেন্স’ বা ‘কোটেশন’ প্রয়োজন ছিল। তাই বাল্মীকি দিয়ে শুরু!

কৌঞ্চমিথুন বিয়োগজনিত শোকে যেমন ‘রামায়ণ’ রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের আদি কবি বাল্মীকি, ঠিক তেমনিভাবে সর্বাধুনিককালের বাংলাসাহিত্যের সব চেয়ে জনপ্রিয় কবি হেলাল হাফিজ কতকগুলো বিশেষ ঘটনা এবং সূত্রকে অবলম্ব করে তার কালজয়ী কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন। যেগুলো স্থান পেয়েছিল ‘‘যে জলে আগুন জ্বলে’’ কাব্যগ্রন্থে।

বিজ্ঞাপন

‘‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”

প্রবাদবাক্যে রূপ নেওয়া এ দু’টি লাইন শোনেনি— এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। একসময় শহরের দেয়ালে দেয়ালে চিকামারা হয়েছে কবিতার এই দু’টি লাইন। এখনো যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, প্রকাশনায় ‘যে জ্বলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র এই লাইন দু’টিকে ‘ব্যানারপোস্ট’ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে বলেছিলাম— ‘সময়বিশেষ কোনো একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ বেদনা যখন প্রকাশের পথ পায় তখনই কবিতার জন্ম।’ নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতাটিও রচিত হয়েছিলে বিশেষ একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে।

ঊনসত্তর সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকের ঘটনা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পুরান ঢাকা থেকে রিকশায় হলে ফিরছেন ২১ বছর বয়সী টগবগে যুবক হেলাল হাফিজ। তখন ফুলবাড়িয়ায় ছিল রেলস্টেশন। স্টেশন পেরিয়ে গুলিস্তান চৌরাস্তায় এসে দেখেন- বিক্ষোভরত ছাত্রদের বেদম পেটাচ্ছে ইপিআর এবংপুলিশ। তার রিকশার পাশে এক মধ্যবয়সী রিকশাওয়ালা এসে দাঁড়াল। সে এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলল, 'মার, মার ওদেরকে। কিছু কিছু পেরেম (প্রেম) আছে মার্ডার করাও জায়েজ।'

বিজ্ঞাপন

রিকশাওয়ালার ওই কথাগুলো হেলাল হাফিজের মধ্যে আশ্চর্য রকম তরঙ্গ তুলল। ভাবনায় আচ্ছাদিত করে ফেলল তাকে। কতটা দেশপ্রেম থাকলে একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা এমন কথা বলতে পারে! হলে ফিরে ওই কথাগুলো তার কানে ক্রমাগত বাজতে লাগল। তার ভেতরে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! রিকশাওয়ালার কথাগুলোকে কীভাবে শিল্পে রূপ দেওয়া যায়, সেই যুদ্ধ!

কবিতার প্রসব বেদনায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট হেলাল হাফিজ ঘুমাতে পারেন না, ক্লাস করেন না। শরিফের ক্যান্টি, কলাভবন, ইকবাল হল, নিউমার্কেটে মনিকো রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ান তিনি। এভাবে আট-দশ দিনে তিন পৃষ্ঠার একটা কবিতা ভূমিষ্ঠ হয়। অতঃপর শরিফের ক্যান্টিনে গিয়ে আহমদ ছফা আর কবি হুমায়ুন কবিরকে কবিতাটা দেখান। কবিতা পড়ে তারা তাকে বুকে টেনে নেন। চা-নাশতা খাওয়ান, দুপুরে বিরিয়ানিও! এর পর আহমদ ছফা বললেন, 'কবিতাটা এত বড় রাখা যাবে না। কিছু জায়গায় ঝুলে গেছে। আমরা কিছুই বলব না; তুমি তোমার মতো করে এডিট কর।' আরও পনেরো-বিশ দিন সময় নিয়ে 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়' বর্তমান রূপে আনলেন হেলাল হাফিজ। নিয়ে গেলেন আহমদ ছফার কাছে। সেখানে হুমায়ুন কবিরও ছিলেন। পড়ে বললেন, 'এবার ঠিক আছে।' তারা তাকে নিয়ে সোজা চলে গেলেন দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তী সময় দৈনিক বাংলা) অফিসে, সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে।

আহমদ ছফা কবিতাটা  আহসান হাবীবের হাতে দিলেন। তিনি নিবিষ্ট মনে পড়লেন। পড়া শেষে তিনি বললেন, 'আমি এখন যা বলব তাতে ও (হেলাল হাফিজ) কষ্ট পাবে; আমি এই কবিতা ছাপতে পারব না।' একটু ধাক্কা খেলেন হেলাল হাফিজ। কিন্তু এর পর আহসান হাবীব যেটা বললেন, তাতে আর কোনো কষ্ট থাকল না হেলাল হাফিজের। তিনি বললেন, 'আমি ছাপতে পারলাম না। কিন্তু এই কবিতায় হেলালের অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে।’

৫১ বছর পর এসে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারছি— কবি আহসান হাবীব সেদিন ভুল বলেননি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মধ্য থেকে একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে লেখা স্লোগানধর্মী কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ আজ কালকে জয় করে মহাকালের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর কবি হেলাল হাফিজও অমরত্বের দিকে ধাবমান!

এতক্ষণের আলোচনায় এটা মনে হতে পারে, এই একটা মাত্র কবিতাই তার সম্বল! মোটেই তা নয়। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পাওয়া প্রতিটা কবিতা পাঠকহৃদয় জয় করার পাশাপাশি সাহিত্য বিচারে মহাকাল জয় করতে সক্ষম হয়েছে। কবিতার অন্যতম প্রধান কাজ সময়কে ধারণ করা। এই কাজে যে যতটুকু সিদ্ধহস্ত, তার সৃষ্টি ততটুকু কালোত্তীর্ণ। সময়কে ধারণ করতে না পারলে, কাব্যচর্চায় সিদ্ধি লাভ রীতিমতো অসম্ভব বৈকি!

কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনা জেলায়। অর্থাৎ ৪৭ এর দেশবিভাগের অব্যবহতি পরেই তার জন্ম। জন্মের তিন বছর পর মাকে হারান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা’ হারানোর বেদনাও বাড়তে থাকে। এই বেদনাই তাকে কবি হতে সাহায্য করেছে। কারণ, ব্যক্তিগত বেদনার বিষপুষ্প হতে কবি যখন কল্পনার সাহায্যে আনন্দমধু আস্বাদন করতে পারেন, তখন সেই বেদনা সুন্দর হয়ে ওঠে। বেদনার যিনি ভোক্তা, তাকে এর দ্রষ্টা হতে না পারলে তার দ্বারা কাব্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বেদনারসে সিক্ত হৃদয় থেকেই রচিত হয় কালজয়ী সব কবিতা।

হেলাল হাফিজ ‘বারুদ সময়’-এর কবি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে স্থান পাওয়া কবিতাগুলো ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে লেখা। যে সময়টাতে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে হেলাল হাফিজদের। প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়ানোর সময় তখন না। বরং শত্রুর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য মিছিলের অগ্রভাগ আর রণাঙ্গনে সম্মুখভাগে গিয়ে দাঁড়ানোর সময় তখন! ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’ কবিতা বলেছেন—

“মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই”

তবে এটাও ঠিক, শুধুমাত্র ‘দ্রোহ’ দিয়ে কবিতা হয় না। প্রেমরসে সিক্ত না হলে কবিতার পালে হাওয়া পায় না। প্রেম-ই কবিতার শেষ আশ্রয়স্থল। প্রেমবিবর্জিত কবিতা সময়ের স্লোগান হতে পারে, কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম নয়— এই সত্য মেনে নিয়েই হেলাল হাফিজ আজীবন কবিতাই লিখে গেছেন। আর কবিতাগুলো জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য প্রেমে পড়েছেন একের পর এক রমণীর। বিভিন্ন সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে অকপটে তাদের নামও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কবিতায় ব্যবহার করা নাম হেলেন, হিরণবালা, সাবিতা মিস্ট্রেস— সবই বাস্তবের রমণী। প্রখ্যাত কবি, লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে হেলাল হাফিজ লিখেছেন—

‘‘ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’,
মন না দিলে
ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা।”

নারীর স্পর্শ যে কোনো কবির কাব্যসাধনায় অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি। নারীর রূপ-রস-গন্ধ ব্যতীত কাব্যের অলৌকিক মায়ার জগতে পরিভ্রমণ সম্ভব নয়। যুগে যুগে সব কবি নারীতে খুঁজে পেয়েছেন কাব্যরসের খনী। এখান থেকে যে যতটুকু রস আস্বাদন করতে পেরেছেন, সে ততটুকু সাজাতে পেরেছেন তার কাব্যভুবন। হেলাল হাফিজ এ জায়গায় সফল এক কবিপ্রতিভা।

“আমাকে স্পর্শ করো, নিবিড় স্পর্শ করো নারী।
অলৌকিক কিছু নয়,
নিতান্তই মানবিক যাদুর মালিক তুমি
তোমার স্পর্শেই আমার উদ্ধার।”

সবিশেষ বলা যায়, প্রেম এবং দ্রোহের মেলবন্ধনে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক মহৎ কবি হেলাল হাফিজ। তার কাব্যসাধনা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাকে করেছে নন্দিত। তিনি খুব অল্প লিখেও অনেক লোকের মন জয় করতে পেরেছেন। শুধু মন নয়, কালকেও জয় করতে সমর্থ হয়েছেন হেলাল হাফিজ। তার কাব্যভাষা সব শ্রেণির বাঙালি পাঠককে দিয়েছে অনাবিল আনন্দ। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষা প্রয়োগে রচিত তার কবিতাসম্ভার আমাদেরকে বিমোহিত করে। আমরা খুব সহজেই ঢুকে পড়তে পারি তার কবিতার অন্দরমহলে।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

সারাবাংলা/এজেড/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন