বিজ্ঞাপন

‘গণবদলি’ নিয়ে চট্টগ্রাম পুলিশে আতঙ্ক-অস্থিরতা

October 10, 2020 | 3:16 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে ধারাবাহিক রদবদল চলছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হত্যার ইস্যুতে কক্সবাজার থেকে সকল পুলিশ সদস্যকে একযোগে বদলির পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশেও (সিএমপি) শুরু হয়েছে গণবদলি। প্রতি সপ্তাহে সদর দফতর থেকে চট্টগ্রামে বিভিন্ন পদে কর্মরত ২০-৩০ জন করে পুলিশ সদস্যকে বদলি করে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন রেঞ্জ ও ইউনিটে।

বিজ্ঞাপন

কিছুসংখ্যক নেতিবাচক ভাবমূর্তির সদস্যের পাশাপাশি পেশাদার, দক্ষ ও চৌকস হিসেবে পরিচিতদের বদলি করা নিয়ে চট্টগ্রামে পুলিশের মধ্যে আতঙ্ক, অস্থিরতা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক কাজের মধ্যে স্থবিরতা এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের মনোবল ভেঙ্গে যাবারও আশঙ্কা করছেন তারা। এতে আইনশৃঙ্খলাসহ চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না সেটা নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে এই গণবদলি নিয়ে উঠছে অনেক প্রশ্ন।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার- টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ওই ঘটনায় টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৩ জন পুলিশ সদস্য এখন কারাগারে আছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টির পর গত সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের প্রায় দেড় হাজার পুলিশ সদস্যকে বদলি করে বিভিন্ন রেঞ্জে পাঠানো হয়।

বিজ্ঞাপন

এই গণবদলি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত দূরের জেলা থেকে আসা পুলিশ সদস্যরা কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজন এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের ভাষা বুঝতে পারবেন কি না, ওই জনপদে চাকরি করার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় অপরাধ দমন, মামলার তদন্তসহ সার্বিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে কি না, এই প্রশ্নগুলো তখনই তৈরি হয়।

বদলি হয়ে কক্সবাজারে যাওয়া কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, অনেকে নীলফামারি, গাইবান্ধা- এমন দূরের জেলা থেকে এসেছেন। বদলির জন্য তাদের কোনো মানসিক প্রস্তুতিও ছিল না। অনেকেই বদলিজনিত ছুটিও পাননি। অধিকাংশই কক্সবাজারের রাস্তাঘাটও চেনেন না। এ কারণে ইয়াবা-মাদক উদ্ধার, অপরাধী গ্রেফতারসহ সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। এখন মূলত তথ্যসংগ্রহ করা, এলাকা চিনে নেওয়া, লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক করা- এসব কার্যক্রম চলছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেনও গতমাসে গাজীপুর থেকে বদলি হয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন। এই গণবদলি নিয়ে সম্প্রতি তিনি সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, পুলিশের ইমেজ বাড়াতেই এটা করা হয়েছে। পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করলে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা কোনো সংকট নয় বলে মনে করেন তিনি। কক্সবাজারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেলায়ও সীমিত আকারে পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন ডিআইজি।

জানা গেছে, সিএমপিতে অভিজ্ঞ, দক্ষ, চৌকস ও পেশাদার হিসেবে পরিচিতদের সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে। পুলিশের নিয়মিত বদলির অংশ বলা হয়েছিল তখন। তবে আলোচনা আছে, যারা দীর্ঘসময় সিএমপিতে কাজ করছেন শুধু তাদেরই সরানো হয়। ওই বছরের অক্টোবরে এসে একযোগে ১৩ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন রেঞ্জে বদলি করা হয়, যাদের সবাই চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। চট্টগ্রামের বাসিন্দারা সিএমপিতে চাকরি করতে পারবেন না, পুলিশ সদর দফতর অলিখিতভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্রক্রিয়াটি স্তিমিত হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে বেনজীর আহমেদ যোগদানের পর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এসে রদবদলের প্রক্রিয়া জোরালো হয়। কক্সবাজারে গণবদলির পর শুরু হয়েছে সিএমপিতে।

সিএমপি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে সিএমপি থেকে অন্তত ১২০ জনকে বদলি করে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন রেঞ্জে। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক এবং সহকারি কমিশনার থেকে উপ-কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও আছেন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন রেঞ্জের পাশাপাশি নৌ, শিল্প, রেলওয়ে, ট্যুরিস্ট পুলিশ, সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর সিএমপি থেকে একযোগে ২৬ জনকে বদলি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

একের পর এক বদলি আদেশ আসার পর সিএমপিতে কর্মরতদের মধ্যে অস্বস্ত্বি, বদলি আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে কক্সবাজারের মতো চট্টগ্রামেও সবাইকে বদলি করে বিভিন্ন রেঞ্জ ও ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হবে, এমন আলোচনা চলছে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। সিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই গণবদলি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেছে সারাবাংলা। অনাকাঙ্খিত জটিলতার আশঙ্কায় তাদের কেউই নাম প্রকাশে সম্মত হননি।

কয়েকজন কর্মকর্তা সারাবাংলাকে জানান, বদলিজনিত কারণে কর্মস্থল ত্যাগের জন্য নিয়ম অনুযায়ী ৭ থেকে ১২ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু সদর দফতর থেকে যেসব বদলির আদেশ আসছে সেগুলোতে সময় দেওয়া হচ্ছে মাত্র তিনদিন। একজন কর্মকর্তার কাছে মামলার তদন্তভার, অভিযোগ জমা থাকে। সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার সময়ও দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে তাৎক্ষণিক বদলি আদেশের কারণে কর্মকর্তারা ‘দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন হচ্ছেন। অনেকেই কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত না থেকেও এই অপবাদের শিকার হচ্ছেন। এতে পুলিশ সদস্যদের সামগ্রিক মনোবল ভেঙ্গে পড়ছে।

তাদের মতে, চট্টগ্রাম নগরীতে পেশাদার অপরাধী, ডাকাত-ছিনতাইকারী গ্রেফতারে সক্ষম এবং যে কোনো সূত্রবিহীন চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হিসেবে যাদের পরিচিতি আছে, নাশকতাকারী, সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতা আছে যাদের, তাদের অনেককেও বদলি করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নাশকতা-সহিংসতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে সিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তারাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

বদলি হওয়া একজন পুলিশ পরিদর্শক সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি করি, বদলি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এভাবে অপমান করে বিদায় দেওয়া হচ্ছে কেন ? সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে জানানো হোক। অথবা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বদলি করা হোক। এভাবে বদলির মাধ্যমে তো আমাদের সারাজীবনের জন্য বিতর্কিত করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের পরিবার আছে, ছেলেমেয়ে চট্টগ্রাম শহরে পড়ালেখা করে। অনেককে এমন জায়গায় বদলি করা হয়েছে, যে জীবনে কোনোদিন সেই জেলায় যায়নি। তার পরিবারটাকেও তো সমস্যার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।’

এই গণবদলি নিয়ে পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে পারেনি সারাবাংলা। তবে সম্প্রতি সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সারাবাংলাকে জানিয়েছিলেন, কক্সবাজারের মতো গণবদলি তিনি সিএমপিতে চান না। বিশেষত যেসব অফিসারদের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে এবং দশ্যমান বড় কোনো অভিযোগ নেই, তাদের সরনোর পক্ষে নন তিনি। তবে সদর দফতর থেকে কোনো আদেশ এলে সেটি তিনি মানতে বাধ্য।

গণবদলি নিয়ে মতামত জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বতমান যারা আছেন তারা মনে করছেন, পুরনো সেট চেঞ্জ করে যদি নতুন সেট দিই, তাহলে একটা পরিবর্তন আসবে। অনেকদিন এক জায়গায় থাকলে অনেক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে যায়, তদবির হয়, তখন আর চেয়ারে বসে থেকেও কাজ করা যায় না। নতুন সেট দিলে এই সমস্যা কমে যায়, কাজ করা যায় তখন। এই চিন্তা থেকে এভাবে বদলিটা হচ্ছে। কিন্তু এটার ফলাফল আদৌ কতটুকু আসবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ভালোর জন্যই তো করা হচ্ছে, কিন্তু ভালোটা হবে কি না, সেটা দেখতে হবে।’

গণহারে বদলিতে কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে বেশি সমস্যা হবে। রাস্তাঘাট চিনতে সমস্যা হবে, ভাষা বুঝতে সমস্যা হবে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা না গেলে তো কাজ করা যাবে না। কিন্তু এর মধ্যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ নিশ্চয় বসে থাকবে না। আর একটা বিষয় হচ্ছে, মনোবলে কিছুটা প্রভাব পড়বে। হুট করে বদলি আদেশ এলে তো প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়বে, কারণ তার ছেলেমেয়ে হয়ত কর্মস্থলের আশপাশের কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। তাদের ওপর তো চাপ পড়বে। এছাড়া কর্মস্থলে পরিবারের সদস্য না থাকলে স্বাভাবিকভাবে একটা মানসিক চাপ পড়ে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের বিষয় আলাদা। কক্সবাজারের বিষয়টা সঠিক। এর আগেও একবার সিএমপি থেকে চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন আমরা জেনেছিলাম যে, অন্যান্য জেলা থেকে অনেকেই সিএমপিতে কাজ করার সুযোগ পেতে চান। তাদের সুযোগ করে দিতেই বিভিন্নভাবে বদলির একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এবারও যদি এ ধরনের কিছু হয়ে থাকে, তাহলে সেটা নিন্দনীয়। কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’

‘চট্টগ্রামের ভাষা-সংস্কৃতি অপরাধের ধরণ আলাদা। এখানে অনেক পুলিশ সদস্য আছেন যারা অপরাধের ধরণ বোঝেন, অপরাধীদের চেনেন, তথ্য সংগ্রহের সূত্রগুলো জানেন-বোঝেন। সুতরাং একেবারে খোলনলচে পাল্টে দেওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেকসময় সঙ্গত হয় না। এতে আইনশৃঙ্খলার উন্নতির চেয়ে অবনতিই বরং বেশি হয়। অপরাধীরা অধরা থেকে যেতে পারে।’ - বলেন আখতার কবির

সারাবাংলা/আরডি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন