বিজ্ঞাপন

‘ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে’

October 14, 2020 | 8:38 pm

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং টেকসই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়তে এ সংক্রান্ত কৌশলে বাংলাদেশকে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ একাধিক রাষ্ট্র এই কৌশলে যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত মিলে ‘কোয়াড’ নামক যে নিরাপত্তা কৌশল গঠন করেছিল, ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মূলত ‘কোয়াড’-ই পুনর্জীবিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বা কোয়াড মূলত চীনকে চেক দেওয়া। তবে এই কৌশলে কে শত্রু বা মিত্র তা এখনও প্রকাশ্য নয়। তাই সেখানে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশকে সবকিছু ভালো করে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক রাষ্ট্র চায় যে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশ যোগ দিক। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করতে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই. বিগান বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকায় আসবেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

‘ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে’

বিজ্ঞাপন

স্টিফেন ই. বিগানের ঢাকা সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্রের বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির ঢাকাস্থ দূতাবাস জানিয়েছে, ডেপুটি সেক্রেটারি স্টিফেন ই. বিগান ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশে সফরকালে দেশটির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করবেন এবং আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের বিষয়টি পুনর্নিশ্চিত করবেন। বাংলাদেশের সফরে ডেপুটি সেক্রেটারি বিগান সবার সমৃদ্ধির জন্য একটি স্বাধীন, অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ও যৌথ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন।

এর আগে গত ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়তে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গত ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সেক্রেটারি ড. মার্ক টি. এসপার টেলিফোনে আলাপ করেন।

বিজ্ঞাপন

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট এই টেলিফোন আলাপ সম্পর্কে জানিয়েছে, উভয় নেতা সব দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক সুরক্ষা, বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা এবং বাংলাদেশের সামরিক সামর্থ্যকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগসহ সুনির্দিষ্ট দ্বি-পাক্ষিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। উভয় নেতা পারস্পরিক স্বার্থ ও মূল্যবোধের সমর্থনে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই উপমহাদেশ বা অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন হচ্ছে। যার মধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিকের কারণটা হচ্ছে, চীনকে একধরনের চেক দেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন চীন বনাম ভারত একধরনের কনফ্রনটেশন আছে। ভারত মহাসাগরে ভারতের একটা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সমর্থন রয়েছে। একদিকে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত মিলে কোয়াড গঠন করছে। যাকে এশিয়ান নেটো হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। তাই ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেওয়া কতটা ঠিক হবে, তা ভাবনার বিষয়। এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিষয় জড়িত, একটু ভুল হলে চরম মাশুল গুনতে হবে। এই বিষয়ে খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক এবং নতুন করে কোয়াড গঠন হচ্ছে। এটিকে আমি আমাদের দেশের জন্য খানিকটা এলার্মিং বলে মনে করি। কারণ, এটা চীনের বিপরীতে চারদেশের একটা শক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা। আবার এই চার দেশের মধ্যে ভারত এবং জাপান কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অনেকটাই মিয়ানমারকে সমর্থন করে যাচ্ছে। তাই আমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে যে, এই কোয়াড মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সমস্যা (আসলে মিয়ানমারের সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া) সেক্ষত্রে এই তাদের অবস্থান কী হবে?’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে সবাইকে বেনিফিট করার কথা বলা হয়। আমরা যখন ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলোচনা করেছি, তখন এর একটা ব্যবসায়িক দিক ছিল, আমরা ওইখানে থাকতে চেয়েছি।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহেদুল আনাম খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১২ সালে বারাক ওবামা (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) যখন ভারত সফরে আসেন, তখন ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলোচনা হয়। ২০১৩-১৪ সালেও এটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। ইন্দো-প্যাসিফিকের বিস্তৃতি বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে করে। এশিয়া-প্যাসিফিকের জায়গায় এখন ইন্দো-প্যাসিফিক আলোচনায় চলে আসছে। ভবিষ্যতে বিশ্বনেতৃত্ব পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ায় চলে আসবে। গত বছরের জুন পর্যন্ত আমাদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না যে, এটি কী। তবে ধীরে ধীরে সেই ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো একক নেতৃত্ব নয়, এখানে অনেক দেশ আছে। আমেরিকা, চীন ও ভারত— এরা হলো ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রধান শক্তি।’

শাহেদুল আনাম খান আরও বলেন, ‘আমেরিকার যে পলিসি, সেখানে চীন হলো প্রথম ফ্যাক্ট। আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়াতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশকে তাদের বলয়ের মধ্যে রাখতে চায়। কিন্তু ইন্দো-প্যাসিফিকের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো আমাদের জানতে হবে। চীনের পলিসি নিয়ে আমেরিকা সন্দিহান। আবার আমেরিকার হাবভাব নিয়ে সন্দিহান চীন। সেইসঙ্গে চীনের ইকোনোমিক মিলিটারি নিয়ে আমেরিকার সন্দেহ আছে। এসব বিষয়ে পূর্ণ ধারণা রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রুকসানা কিবরিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল সমস্যা। আর এই ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের অবস্থানও বেশ জটিল। বঙ্গোপসাগরে ভারতের অবস্থান বেশ শক্ত। মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত হচ্ছে লিড সিকিউরিটি প্রোভাইডার। বঙ্গোপসাগরে ভারতের নেভাল বিজনেস খুব ভালো। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে আবার চীনের ভালো সম্পর্ক। এখানে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এরা একদিকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা বলছে, অন্যদিকে চীনকে নিয়ে তাদের আপত্তি আছে।‘

অধ্যাপক রুকসানা কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আসলে এই ইন্দো-প্যাসিফিকে শত্রু-মিত্র বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে বাংলাদেশকে তিনটি শক্তিশালী দেশ— আমেরিকা, চীন ও ভারতের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি সমন্বয় করতে হবে। শক্তিশালী তিনটি দেশকে ম্যানেজ করে বাংলাদেশকে তার স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে।’

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে আমরা চাই যে, এই কৌশলে যদি ইফেক্টিভিটি বাড়াতে হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। এই ইস্যুতে টাকা খরচ করতে হবে, শুধু মুখে বললেই হবে না, তাদের বিনিয়োগ করতে হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ডিফেন্সে যেতে চান, তারা ইকুইপমেন্ট (সামরিক সরঞ্জাম) বিক্রি করতে চান। আমরা ওই মারামারিতে নেই, আমরা হলাম বন্ধুত্বের দেশ।’

সারাবাংলা/জেআইএল/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন