বিজ্ঞাপন

৫ গুণ বেশি দামে কেনা হাসপাতাল বেড পড়ে আছে অযত্নে

October 14, 2020 | 12:12 am

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রতিরোধে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জরুরিভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয় ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ (ইআরপিপি) প্রকল্প। সারাদেশের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহসহ করোনা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে শুরু হয় প্রকল্পটির কার্যক্রম। কিন্তু শুরু থেকেই এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কেনাকাটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রকল্পের আওতায় কোনো দরযাচাই করা ছাড়াই বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ২২০টি হাসপাতাল বেড। যদিও ইনশা ট্রেডিং করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা এসব বেডের দাম বিষয়ে কিছু বলতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। আর কেনার পর এসব হাসপাতাল বেড পড়ে রয়েছে অবহেলা, অযত্নে।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের আওতায় ২৮ মে ইনশা ট্রেডিং করপোরেশনের সঙ্গে ২২০টি হাসপাতাল বেড সরবরাহের জন্য চুক্তি করা হয় ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায়। এই চুক্তি অনুযায়ী ১৭০টি ‘থ্রি ফাংশনাল ইলেকট্রিক হাসপাতাল বেড’ ও ৫০টি ‘ফাইভ ফাংশনাল ইলেকট্রিক হাসপাতাল বেড’ সরবরাহ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিষ্ঠানটি বাজার মূল্যের চাইতে প্রায় সাড়ে ৫ গুণ বেশি দামে ‘ফাইভ ফাংশনাল হাসপাতাল বেড’ ও চার গুণ বেশি দামে ‘থ্রি ফাংশনাল হাসপাতাল বেড’ সরবরাহ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইনশা ট্রেডিং করপোরেশনের পক্ষ থেকে ‘ফাইভ ফাংশন হাসপাতাল বেডে’র প্রতিটির দাম ধরা হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৫০টি বেডের জন্য মোট দাম ধরা হয় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা। পরে প্রতিটি বেডের দাম ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা হিসেবে এক কোটি ৬৫ লাখ টাকায় বেডগুলো সরবরাহের কাজ পায় ইনশা ট্রেডিং।

বিজ্ঞাপন

ইআরপিপি প্রকল্পের আরও যত অনিয়ম-

বিজ্ঞাপন

অধিদফতরের গ্যারেজে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের পিপিই, জানে না স্টোর

একইসঙ্গে ইনশা ট্রেডিং ‘থ্রি ফাংশনাল হাসপাতাল বেডে’র প্রতিটির দাম ধরে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। এ ধরনের ১৭০টি বেডের দাম ধরা হয় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পরে প্রতিটি বেডের দাম ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা হিসাবে ১৭০টি বেডের দাম তিন কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে সরবরাহের জন্য ইনশা ট্রেডিং চুক্তিবদ্ধ হয়।

বিজ্ঞাপন

মহাখালীর ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টারের ষষ্ঠ তলায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এই ২২০টি হাসপাতাল বেড। হাসপাতাল বেডগুলোর গায়ে দেখা যায়, চীনের জিয়াংসু মেডিকেল ইক্যুইপমেন্টের তৈরি এসব বেড। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। ইআরপিপি প্রকল্পে সরবরাহ করা দুই রকমের হাসপাতাল বেডের দাম মডেল নম্বরসহ উল্লেখ করে দিলে প্রতিষ্ঠানটি মেইলের উত্তর দেয়।

চীনের জিয়াংসু মেডিকেল ইক্যুইপমেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের তৈরি করা ‘ফাইভ ফাংশন ইলেকট্রিক হাসপাতাল বেডে’র দাম ৪৮৫ ডলার অর্থাৎ ৪১ হাজার ২২৫ টাকা (৮৫ টাকা ডলার মূল্য ধরে)। প্রতিষ্ঠানটি জানায় তাদের ‘থ্রি ফাংশনাল ইলেকট্রিক হাসপাতাল বেডে’র দাম ৩৭৯ ডলার অর্থাৎ ৩২ হাজার ২১৫ টাকা।

বিজ্ঞাপন

৫ গুণ বেশি দামে কেনা হাসপাতাল বেড পড়ে আছে অযত্নে

হাসপাতাল বেডের দামের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর বিএমএ মার্কেটের কাশেম সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল ওয়ার্কসের জেনারেল ম্যানেজার আবদুল কাইয়ুম সারাবাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিতে এপ্রিল-মে মাসের দিকে হাসপাতালের বেডের দাম বেশি ছিল— এটা সত্যি। কিন্তু ফাইভ ফাংশনাল বেড ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা কিংবা থ্রি ফাংশনাল বেড ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা— এত বেশি কখনোই ছিল না। এই দর বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

চীনের জিয়াংসু মেডিকেল ইক্যুইপমেন্টের পক্ষ থেকে দেওয়া মেইলে দামের বিষয়ে আবদুল কাইয়ুম বলেন, করোনা সংক্রমণের কারণে ফ্রেইট কস্ট কিছুটা বেড়েছিল। সেটি বাড়িয়ে ধরলেও একটি হাসপাতাল বেডের দাম ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা কোনোভাবেই হবে না। এ ক্ষেত্রে জিয়াংসু যে দাম দিয়েছে, তাতে ভ্যাট, ট্যাক্স, সিঅ্যান্ডএফ ও ফ্রেইট খরচসহ সবকিছু মিলিয়ে ফাইভ ফাংশনাল বেডের দাম আসতে পারে ৫৯ হাজার ৮১৩ টাকা। থ্রি ফাংশনাল বেডের ক্ষেত্রে এই খরচ হবে ৪৭ হাজার ৯৬২ টাকা। এই অঙ্কের কিছু কমবেশি হতে পারে। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা দামের সমান হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনশা ট্রেডিং করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী আব্দুর রশীদ সারাবাংলাকে বলেন, এই প্রকল্পে আমরা বিডিংয়ের মাধ্যমে কাজ করেছি। বিডিংয়ে আমরা প্রথম একটি দাম দিয়েছিলেন। পরে দাম কিছুটা কমিয়ে তারপর ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়।

৫ গুণ বেশি দামে কেনা হাসপাতাল বেড পড়ে আছে অযত্নে

অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বিডিংয়ে অংশ নিয়েছিল— জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেননি আবদুর রশিদ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এই বিডিংয়ে ছিল না। শুধুমাত্র প্রকল্পের দু’জন কর্মকর্তার সইয়ে ইনশা ট্রেডিংয়ের সঙ্গে চুক্তিটি করা হয়।

এদিকে, শুরুতে হাসপাতাল বেডগুলো আমদানি করার কথা বললেও ইনশা কপোরেশনের আবদুর রশিদ পরে সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতাল বেডগুলো আমি ইমপোর্ট করিনি। আমি একজন ইম্পোর্টারের কাছ থেকে নিয়েছি। আমরা জুনের শুরুর দিকে সরবরাহের কাজ শুরু করি। সম্ভবত ২৮ জুন বেডগুলো সরবরাহের কাজ শেষ হয়। এখন আবার নতুন অর্ডার করেছে সিএমএসডিতে সরবরাহ করার জন্য। তারা মনে হয় কোথাও বিতরণ করবে।’

স্থানীয় বাজার বা জিয়াংসুর উল্লেখ করা দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যদি বেশি দাম নিয়ে থাকলে সেটি আমার কৃতিত্ব। অধিদফতর কেন এত বেশি দামে কিনেছে, সেটি তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এ বিষয়ে প্রকল্প কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে ভালো হবে। আমাদের কোনো তথ্য আমরা দিতে চাই না। অনেক কিছু হয়ে গেছে এগুলো নিয়ে।’ প্রকল্প কার্যালয় মহাখালী ডিওএইচএসে উল্লেখ করে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বাজারদরের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি দামে কিনলেও ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় কেনা ২২০ পিস হাসপাতাল বেড এখনো কোনো কাজেই আসছে না। বেশি দামে কেনা এই হাসপাতাল বেডগুলোর দর যাচাই কারা করেছিল, হাসপাতাল বেড সরবাহের অভিজ্ঞতা না থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল— এসব বিষয়ে জানতে ইআরপিপি প্রকল্পের পরিচালক ও অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. সৈয়দ শামীম হোসেনের মোবাইল নম্বরে কল করা হলে তিনি জানান, অসুস্থ থাকায় অফিসে যাননি। প্রকল্প কার্যালয়ের ঠিকানাও তিনি জানেন না।

৫ গুণ বেশি দামে কেনা হাসপাতাল বেড পড়ে আছে অযত্নে

সহকারী প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনিও ফোন ধরেননি।

পরে মহাখালী ডিওএইচএসে ইআরপিপির প্রকল্প কার্যালয়ে গেলে প্রথমে জানানো হয়, সেটি প্রকল্প কার্যালয় নয়। তবে কিছুক্ষণ পর সেখানেই দেখা যায় প্রকল্প পরিচালক ডা. সৈয়দ শামীম হোসেন ও সহকারী প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলামকে। তাদের কাছে জানতে চাইলেও তারা কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই কার্যালয় ত্যাগ করেন।

দুই কর্মকর্তা কার্যালয় ত্যাগ করার পর জানতে চাইলে প্রকল্প কার্যালয় থেকে জানানো হয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের সঙ্গে বৈঠক থাকায় তারা চলে গেছেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা যায়, ওই সময় সেখানে কোনো বৈঠক ছিল না।

প্রকল্প কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসআরএস ফ্যাশনস অ্যান্ড ডিজাইন, জাদিদ অটোমোবাইলস, সিম করপোরেশন, ইনশা ট্রেডিং করপোরেশনসহ যেসব প্রতিষ্ঠানকে এপ্রিল-মে মাসে বিভিন্ন সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কেউই। প্রকল্পের ‘অনেক কিছু’ই এখন নতুনভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইআরপিপি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে, তাই এটা নিয়ে আলাদাভাবে কোনো তদন্ত করা হচ্ছে না।’

জানতে চাইলে ইআরপিপি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সারাবাংলাকে বলেন, ‘যদি কেউ অন্যায় করে থাকে, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও দুদক এসব বিষয়ে তদন্ত করছে।’

করোনা মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে অনুমোদিত ইআরপিপি প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের তথ্য এই প্রথম নয়। এর আগে সারাবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, প্রকল্পটিতে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্ব এমন সব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে, যাদের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই সুরক্ষা সরঞ্জামের বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের আওতায় একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরির জন্য খরচ করা হয় পৌনে ৫ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানই নিম্ন মানের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। অনেকেই ঠিক সময়ে সরঞ্জাম সরবরাহ না করেই তুলে নিয়েছে চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকা টাকার অঙ্ক।

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ৮৫০ কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ দিয়ে ইআরপিপি প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ ব্যবস্থায় প্রকল্পটিতে অনুমোদন দেওয়ার পর ২ জুন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। পরিকল্পনা কমিশনে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের জন্য প্রকল্পটির অনুকূলে ২০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন