বিজ্ঞাপন

করোনা শনাক্তে অ্যান্টিজেন টেস্ট চালু হবে কবে?

October 15, 2020 | 11:28 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্তের জন্য রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (আরটি-পিসিআর) পদ্ধতির পাশাপাশি অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেটা গত ১৭ সেপ্টেম্বরের কথা। এরপর প্রায় একমাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অ্যান্টিজেন পদ্ধতিতে নমুনা পরীক্ষা শুরুর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মিডিয়া সেল এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির তথ্য তাদের কাছে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি হতাশাজনক।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাপিড টেস্ট বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে ৯ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলীকে সভাপতি করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। এই বিশেষজ্ঞ কমিটি ৪ আগস্ট নমুনা পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠান। এর মধ্যেই গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

আরও পড়ুন- অ্যান্টিজেন টেস্ট নিয়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশ

বিজ্ঞাপন

পরে ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ডা. বিলকিস বেগমের সই করা চিঠিতে জানানো হয়, দেশে করোনা শনাক্তের জন্য অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে অ্যান্টিজেন টেস্টের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের প্রস্তাবনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১১ সেপ্টেম্বরের ‘ইনটেরিম গাইডেন্স’ অনুসরণ করে দেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, সরকারি পিসিআর ল্যাব ও সব স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অ্যান্টিজেনভিত্তিক টেস্ট চালুর অনুমতির কথা জানানো হয় ওই চিঠিতে। এরপর থেকে আর অ্যান্টিজেন টেস্ট নিয়ে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি।

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘র‌্যাপিড টেস্ট অনুমোদন বিষয়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই সুপারিশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে এটা নিয়ে আসলে নতুনভাবে কিছু বলার নেই। দেশে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র জানা জন্য ও কত সংখ্যক মানুষ নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই আক্রান্ত হয়েছে— তা জানার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্তকরণের জন্য অ্যান্টিবডি টেস্টের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। শুধু যারা আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে গেছে, তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, সেটা দেখার জন্য গবেষণা বা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় এই টেস্ট করা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা যত দ্রুত অনুমোদন হবে, সবার জন্য ততই ভালো।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেটা কার্যকর করতে পারলে আরটি-পিসিআর টেস্টের তুলনায় সময়সাশ্রয়ীও হবে। অ্যান্টিজেন টেস্ট করা আরটি-পিসিআর টেস্টের চেয়ে অনেক সহজ ও কার্যকর। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই অ্যান্টিজেন টেস্টের ফল পাওয়া যায়। কেউ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে গেলে দ্রুত সময়ে তার অ্যান্টিজেন টেস্ট করে সে অনুযায়ী চিকিৎসার জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়া যাবে। এতে রোগীর যেমন সঠিক চিকিৎসা হবে, চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই এগুলোর মান নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। এখন অনুমোদন পাওয়ার পরও আসলে কেন এই টেস্ট শুরু করতে দেরি হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।

প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের নমুনা পরীক্ষা এখন কেবল আরটি-পিসিআরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সেক্ষেত্রে র‌্যাপিড টেস্ট জরুরি অবশ্যই। এক্ষেত্রে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি কিটের মান ও ব্যবহারের নীতিমালা বিষয়ক নির্দেশনা এরই মধ্যে দেওয়া আছে। সেই নীতিমালার অনুমোদনও করা আছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে। সরকারিভাবে অ্যান্টিজেন্ট টেস্ট শুরুর কথা বলা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়। ইদানীং শুনছি বেসরকারিভাবেও করা হবে। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরেকটি নির্দেশনা হয়তো দেবে। কিন্তু এই অনুমোদন দিয়ে বসে থাকলেই তো আর হবে না। ভালো মানের কিট কোথায় পাওয়া যাবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, অ্যান্টিজেনের যে মানসম্মত কিট, তা সারা দুনিয়াতেই কিন্তু সীমিত আকারে আছে। মাত্র চার থেকে পাঁচটি কোম্পানি আছে, যেগুলো আবার কিছু দেশ রেস্ট্রিক্ট করে রেখেছে। যদি আমাদের আনতে হয়, তবে এগুলো যেসব দেশ ডেভেলপ করেছে সেসব দেশ থেকে আনতে গেলেও কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি ভারতে যেটা তৈরি করেছে, সেটাও কিন্তু ব্লক করে রেখেছে। ফলে অ্যান্টিজেন টেস্টের কিট আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণের যে নীতিমালা আছে, তা দেখে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র দেবে। সেই নীতিমালা অনুসরণ করেই অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু করা যেতে পারে।

জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক আইয়ুব হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্টের কিট বিষয়ে যদি সরকারিভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে অবশ্যই আমরা অনুমোদন দেবো। কারণ সরকার এই টেস্টের অনুমোদন দিয়েছে। এখন হয়তো বেসরকারি পর্যায়েও এই টেস্ট চালুর চিন্তাভাবনা চলছে। সেক্ষেত্রে যদি কেউ বেসরকারিভাবে আনতে চায়, তবে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের এখান থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে। আমরা হলাম অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে দুয়েকদিনের মধ্যে বেসরকারিভাবেও অ্যান্টিজেন কিট ব্যবহার করা হবে, আমরা অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টিজেন কিট আনা হবে, সেসব বিষয়ে আমাদের নীতিমালা আছে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য। এখন যদি দেখা যায় বাইরের দেশে কোনো ভালো কোম্পানির কিট ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে সেটা মানসম্পন্ন হলে অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। আমার ধারণা এটা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান অ্যান্টিজেন কিট আনার বিষয়ে অনাপত্তিপত্র পায়নি। তবে সরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান অনাপত্তিপত্র পেয়েছে কি না, তা একটু আপডেট নিয়ে জানাতে হবে।

অ্যান্টিজেন টেস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে জানানো হয়, অ্যান্টিজেন টেস্ট নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ‘ডেভেলপমেন্ট’ তারা জানেন না। তবে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশে এই টেস্টের অনুমোদন রয়েছে।

অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরুর বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদউদ্দিন মিঞাও। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, এ ব্যাপারে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে এই অ্যান্টিজেন টেস্ট চালুর ব্যাপারে যে নীতিমালা প্রয়োজন, তা আজ (বুধবার, ১৪ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজি স্যার দেখে দিয়েছেন। সেটি আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেবো। এক্ষেত্রে কিভাবে বা কোন ফর্মুলায় অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হবে, সে বিষয়টি নীতিমালায় উল্লেখ করা আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলে এটা খুব দ্রুতই শুরু হবে বলে আশা করা যায়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলমের মোবাইল নম্বরে কল করলেও তিনি ফোন ধরেননি। দেশে কবে নাগাদ অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু হতে পারে— এ বিষয়ে জানতে চেয়ে এসএমএস করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। মোবাইল নম্বরে কল করলে রিসিভ করেননি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নানও।

উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরে প্রথম করোনা শনাক্তের জন্য র‌্যাপিড টেস্ট করা হয়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়াতেও এই পদ্ধতিতে করোনা আক্রান্তদের শনাক্ত করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে চালু হয় অ্যান্টিজেন টেস্ট। তবে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন কিট তৈরি করে থাকে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন