বিজ্ঞাপন

পাতে ভর্তা?— আলু-পেঁয়াজ-মরিচের দামে ভাবতে হচ্ছে আরেকবার

October 16, 2020 | 1:40 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আলু। এত বিচিত্রমুখী সবজি বোধহয় দ্বিতীয়টি আর নেই। যেকোনো ধরনের মাছ বা মাংসই হোক না কেন, তাতে আলুর উপস্থিতি নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন নেই। ছোট মাছের চচ্চড়ি তো আলু ছাড়া ‘জমে’ই না। কাচ্চি বিরিয়ানি থেকে বেছে আলু তুলে নিয়ে খাওয়ার মানুষও নিশ্চয় কম নেই। সকালে রুটির সঙ্গে ঝিরি আলু ভাজি— সে অনেক মানুষের নিত্যদিনের খাবার। দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জনপ্রিয় খাবার আলুর ডাল। আলুর দম, শীতে নতুন আলু দিয়ে আলু-কপির ডালনা, আলু পরোটা, আলু পুরি, এমনকি বিকেলের নাস্তার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই— আলুর বিচিত্র ব্যবহারের নমুনা বলে শেষ করাটাই বেশ কঠিন। ‘ভেতো বাঙালি’র কথা বাদ দিলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কুইজিনেও ‘ফিশ’ বা ‘মিটে’র সঙ্গে ‘সাইড ডিশ’ হিসেবে ‘ম্যাশড পটেটো’র চাহিদাই কি কম নাকি!

বিজ্ঞাপন

তবে বঙ্গদেশে সবকিছুকে ছাপিয়ে আলুর সবচেয়ে বেশি ও জনপ্রিয় পদ সম্ভবত আলু ভর্তা। কাঁচা পেয়াজ-মরিচের সঙ্গে সরিষার তেল কিংবা সরিষার তেলে ভেজে নেওয়া পেঁয়াজের সঙ্গে টেলে নেওয়া শুকনো মরিচের সঙ্গে সেদ্ধ আলুর ভর্তা— ডালের সঙ্গে কিংবা ডাল ছাড়াও এক প্লেট ভাত উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট— এ নিয়ে দ্বিমত করবেন খুব কম মানুষই। সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছেই নির্বিচারে আদরণীয় হলেও বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ ও ব্যাচেলরদের কাছে আলু ভর্তার কদরটা একটু বেশিই। বাজারে সবজির দাম বেশি? ডাল-ভাতের সঙ্গে আলু ভর্তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় নিম্নবিত্তসহ বিত্তহীন অনেক মানুষকে। মেসে বুয়া আসেনি? ভাতের সঙ্গে দু’টো আলু দিয়ে সেদ্ধ করে ওই ভর্তাতেই উদরপূর্তি ছাড়া ব্যাচেলরদের অনেকেরই আর গতি কী!

দুর্মূল্যের বাজারে সেই আলু ভর্তা খেতেও এবার দ্বিতীয়বার ভাবতে হচ্ছে মানুষকে, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে। কারণ আচমকাই আলুর বাজারে আগুন। ক’দিন আগেও ১৮-২০ টাকা কেজি দরে যে আলু বিক্রি হয়েছে পাড়ায়-মহল্লায়, সেই আলুর দাম হাঁকিয়েছে হাফ সেঞ্চুরি, অর্থাৎ ৫০ টাকা। এদিকে আলু ভর্তার অপরিহার্য উপকরণ পেঁয়াজের ঝাঁজ আর কাঁচামরিচের ঝালও কমার নাম নেই ক’দিন হলো। চিরপরিচিত আলু ভর্তার খরচ কুলোতেও তাই হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর পূর্ব নাখালপাড়া এলাকার পাঁচ-ছয়টি মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সব দোকানেই আলুর দাম ‘ফিক্সড’— প্রতি কেজি ৫০ টাকা। কয়েকজন দোকানদার বললেন, আগে যেখানে একবারে দুই-তিন বস্তা করে আলু আনতেন, এখন দাম বেশি হওয়ার কারণে তারাও পাল্লা মেপে তিন-চার পাল্লার বেশি আলু আনতে সাহস পাচ্ছেন না। এসব দোকানে পেঁয়াজের কেজিও ‘ফিক্সড’— ১০০ টাকা।

সরকার খুচরায় ৩০ টাকার বেশি দামে আলু বিক্রি করতে নিষেধ করেছে— এ প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিতেই মুনসেফা স্টোরের মালিক আব্দুল হামিদ বললেন, ‘সরকার তো দাম বেঁধে দিয়েই খালাস। কাওরান বাজারে পাইকারিতেই এক কেজির দাম পড়ছে ৪৫-৪৬ টাকা। সরকার সেখানে অভিযান চালিয়ে ২৫ টাকায় বিক্রি করাতে পারলে আমরা কেন বেশি রাখব?’ দাম বেশি থাকলেও ক্রেতারা অল্প-স্বল্প করে হলেও আলু কিনছেন বলে বাড়তি দামেও তাকে আলু কিনতে হচ্ছে— এমনটিই জানালেন এ দোকানি।

বিজ্ঞাপন

এই এলাকার দোকানগুলোতে পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা। সব দোকানেই দেশি জাতের পেঁয়াজ। পাঁচ-ছয়টি দোকানের মধ্যে একটি দোকানে দেখা গেল আমদানি করা বড় আকারের পেঁয়াজ। তার দামও একই। মা জেনারেল স্টোরের রফিকুল ইসলাম জানালেন, পেঁয়াজের দাম মাঝে ৭০ টাকা পর্যন্ত নেমেছিল। গত সপ্তাহ দুয়েক হলো বাড়তে বাড়তে ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। তাদের পাইকারিতেই কিনতে হচ্ছে ৪৭০ টাকা পাল্লা, অর্থাৎ ৯৫ টাকা কেজি দরে। ১০০ টাকার নিচে তাই বিক্রিও করতে পারছেন না।

এই এলাকায় বেশকিছু ভবনের নিচে সবজির দোকান বসে। এসব দোকানে কাঁচামরিচের কেজি ২৪০ টাকা। দোকানিরা জানালেন, গত শুক্রবার ২৮০ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি করেছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রায় কাছাকাছি চিত্র এখানকার নাবিস্কো বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কাঁচাবাজারটিতে। সব দোকানেই আলুর কেজি ৫০। তবে গুঁড়া আলু ও লাল আলু ৬০ টাকা এবং জাম আলু ও শিল আলু ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল এই বাজারে। আর এই বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৯০ টাকা। আমদানি করা বড় আকারের পেঁয়াজ নেই বাজারের তিনটি দোকানের একটিতেও। এই বাজারে অবশ্য কাঁচামরিচের দাম একটু কম— প্রতি কেজি ২০০ টাকা। দোকানিরা জানালেন, গত সপ্তাহে ৩০০ টাকা কেজি পর্যন্ত দরে বিক্রি করেছেন।

কেবল পূর্ব নাখালপাড়া নয়, রাজধানীর প্রায় সব এলাকার চিত্রই এক। কারওয়ান বাজারেই যেমন পাইকারিতে ২২০ টাকা পাল্লা বা ৪৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে আলু। আর খুচরায় আলুর দাম ৫০ টাকা। পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৭৫ থেকে ৮৩ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৭৬, চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে রাজধানীর অন্যতম বড় এই বাজারেও আমদানি করা পেঁয়াজের পরিমাণ খুবই অল্প। এখানকার খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম ৯০ টাকা কেজি। আর কাঁচামরিচ ২০০ টাকা কেজি।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর রামপুরা, বনশ্রী, সেগুনবাগিচা, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা এলাকার বাজারের চিত্রও এমনই। ৫০ টাকার নিচে মিলছে না আলু, বেশিরভাগ বাজারেই পেঁয়াজের কেজি ১০০, আর কাঁচামরিচও ২০০ টাকার কমে বিক্রি হচ্ছে না কোথাওই।

এরকম পরিস্থিতিতে আলু ভর্তার খরচ হয়েছে স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যান্য বছর তো বটেই, মাসখানেক আগের সঙ্গে তুলনা করলেও অঙ্কটি একই। কারণ ওই সময় আলুর দাম পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতেও ছিল ২৫ টাকা কেজি। পেঁয়াজের কেজি তখন ছিল ৪০ টাকা। আর কাঁচামরিচ ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। আলু ভর্তার উপকরণের মধ্যে সরিষার তেলের দামই কেবল বাড়েনি। মাসখানেকের ব্যবধানে বাকি সব তিন উপকরণের দাম হয়েছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি। দাম নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সরকারি প্রচেষ্টায় আলু ভর্তা ফের কবে আগের মতো সহজলভ্য হবে— সে প্রশ্নের জবাব জানা নেই কারও। বরং এই প্রশ্নটিই সবার— কবে আবার আলু ভর্তা পাতে ফেরাতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন