বিজ্ঞাপন

একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে গেলো— রাসেলের স্মৃতিচারণে শেখ হাসিনা

October 18, 2020 | 6:22 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ছোট ভাই শহীদ শেখ রাসেলের শৈশবের দুরন্তপনা ও তার নির্মম মৃত্যুর কথা স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে গেল, রাসেল আর ফুটতে পারেনি। স্বাধীনতার পরও সে বাবার পাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াতো। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর সে বাবাকে কাছে পেল। আর ১৫ আগস্ট সব শেষ।

বিজ্ঞাপন

রোববার (১৮ অক্টোবর) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা শেখ হাসিনা তার ছোট ভাই শেখ রাসেলের কথা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আজকে রাসেলের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালে রাসেলের জন্ম হয়েছিল। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে তাকে নির্মমভাবে বিদায় নিতে হয়। একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে যায়, রাসেল আর ফুটতে পারেনি।’

বিজ্ঞাপন

রাসেলের জন্মের সময়কার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাসেলের জন্মদিনের কথাটা এখনও আমার মনে পড়ে। একটা ছোট্ট শিশু আসবে আমাদের পরিবারে; আমি, কামাল, জামাল, রেহানা সবাই খুব উৎসাহিত এবং বেশ উত্তেজিত ছিলাম। কখন সেই শিশুটির কান্না আমরা শুনব, কখন তার আওয়াজটা পাব, কখন তাকে কোলে তুলে নেবো। আর সেই ক্ষণটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ছিল। ছোট্ট শিশুটি আমাদের সবার চোখের মণি ছিল।’

শৈশবে বাবা কাছে না পাওয়ায় ছোট্ট শিশু রাসেলের বেদনার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘কী দুর্ভাগ্য তার; ৬৪ সালের অক্টোবরের ১৮ তারিখ তার জন্ম। এরপর ৬৬ সালে বাবা ৬ দফা দিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ৬৬ সালের মে মাসে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বন্দী হয়ে গেলেন। ছোট্ট রাসেল কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবা কারাগারে। ৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবা মুক্তি পান। তখন যে জিনিসটা সব সময় দেখতাম, রাসেলের সর্বক্ষণ মনে একটা ভয় ছিল যেকোনো মুহূর্তে বুঝি বাবাকে হারাবে। তাই বাবা যেখানেই যেতেন, যে কাজই করতেন- রাসেল খেলার ছলে কিছুক্ষণ পর পরই একবার করে দেখে আসতো। বাবা মিটিংয়ে থাক বা যেখানেই থাক সে ছুটে ছুটে যেত।’

বিজ্ঞাপন

রাসেলের নীরব কান্নার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একাত্তর সাল। ২৬ শে মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে গ্রেফতার করা হলো। তারপর থেকে তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে ছিলেন আমরা জানতাম না। তিনি বেঁচে ছিলেন কি না সেটা জানাও আমাদের সম্ভব ছিল না। ৭১ সালে শুধু জাতির পিতাকে বন্দি করা হয়নি, আমার মাকেও বন্দি করা হলো, রাসেলও তখন বন্দী। কামাল মুক্তিযুদ্ধে চলে যাচ্ছে, এক সময় জামালও গেরিলা কায়দায় বন্দিখানা থেকে চলে গেলো মুক্তিযুদ্ধে। রাসেলের চোখে সব সময় পানি। ওইটুকু একটা ছোট্ট শিশু সে তার কষ্টটা কাউকে বুঝতে দিত না। যদি জিজ্ঞেস করতাম, কি হয়েছে? বলতো, চোখে কিছু একটা পড়ে গেছে। তার যে নীরব কান্না তা সে কখনও প্রকাশ করতো না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আব্বা যখন জেলে মাঝে মাঝে সে কান্নাকাটি করতো, কিন্তু আমরা বুঝতাম না। হঠাৎ মধ্যরাতে, বিশেষ করে যেদিন আমরা কারাগারে দেখা করতে যেতাম ওইদিনটা তার জন্য খুব কষ্টের ছিল। ওইরাতে সে ঘুমাতো না, কান্নাকাটি করতো। আমাদের সবাইকে ডাকতো। আমি কামাল, জামাল, রেহানা আমরা সবাই তার পাশে বসতাম। গভীর রাত! ১২টা, ১টা, ২টার সময়েও। অতটুকু বাচ্চা সে তো আর বলতে পারতো না। কিন্তু তার কষ্টটা আমরা উপলব্ধি করতাম। এভাবেই সে বড় হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

শেখ রাসেলের সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়ে ১৫ আগস্ট দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাসেলের জীবনে একটি শখ ছিল যে, সে বড় হলে সেনাবাহিনীর সদস্য হবে। যখন আমরা গ্রামে বেড়াতে যেতাম- সেখানে গিয়ে সে ছোট ছোট শিশুদের একত্রিত করতো, তাদের দিয়ে সে প্যারেড করাতো। আবার তাদের প্যারেড করিয়ে খালি হাতে ফেরাতো না। আমার চাচা শেখ আবু নাসের তাকে টাকা দিতো। যারা প্যারেড করতো সবাইকে সেই টাকা দিতো রাসেল। তাদের জন্য কাপড়চোপড় কিনে দিতো। আমার মা সবসময় সে বাচ্চাদের জন্য কাপড়চোপড় কিনে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যেতেন। রাসেলের ইচ্ছেমতো প্রত্যেকটা বাচ্চাকে এই কাপড়চোপড় দেওয়া হতো।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘৭৫ এর পর আমি যখন দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। তখন আমি আসতে পারিনি এই দেশে। ৮১ সালে এলাম। যখন আমি টুঙ্গিপাড়া গেলাম সেই আলমিরা খুলে অনেকগুলো কাপড় পেলাম, বিশেষ করে শার্ট সেখানে রাখা ছিল। রাসেল যতবার টুঙ্গিপাড়া যেত সে ততবার শিশুদের কাপড় বিতরণ করতো। তার মনটা ছিল অনেক উদার। তাদের জন্য খাবারও দিতো।’

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণে এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যুক্ত হন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে শহীদ শেখ রাসেল এনিমেটেড ডকুমেন্টরি ‘বুবুর দেশ’ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, শেখ রাসেলের জীবনীর উপর প্রকাশিত বই ‘শেখ রাসেল আমাদের আবেগ, আমাদের ভালবাসা’ এর মোড়ক উন্মোচন ও ছবি প্রদর্শনীর উদ্বোধন, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ রাসেলের ‘ম্যুরাল’ উন্মোচন ও ‘শহীদ শেখ রাসেল ভবন’ উদ্বোধন করেন।

এছাড়াও তিনি শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের কার্যক্রম সংক্রান্ত ভিডিও চিত্র অবলোকন, ‘স্মৃতির পাতায় শেখ রাসেল’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ল্যাপটপ বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপসহ পুরস্কার তুলে দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো.তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এছাড়া বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান রকিবুর রহমান, সংগঠনটির মহাসচিব ও সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এবং ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণ প্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

সারাবাংলা/এনআর/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন