বিজ্ঞাপন

হাজার বছরের সম্পর্কে গতি আনতে চায় তুরস্ক

October 20, 2020 | 7:22 pm

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাংলাদেশ-তুরস্ক— দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয় ১৯৭৪ সালে। এরপর ৫/৬ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে চলে টানাপোড়েন। তবে দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় দুই দেশই তা কাটিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-তুরস্ক দুই দেশই এখন প্রাচীন সম্পর্কে গতি আনতে আগ্রহী। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ একাধিক খাতে বিনিয়োগ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে তুরস্ক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান সারাবাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। অনেক প্রচীনকাল থেকেই দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বিদ্যমান। জালালউদ্দিন মুহম্মদ রুমি, হযরত শাহ জালাল হাজার বছর আগে তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ দেশের মানুষ এখনো তাদের স্মরণ করে। এই শতাব্দীর শুরুতে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ তুরস্ককে সমর্থন করেছিল। আমাদের কামাল পাশাকে নিয়ে এ দেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছেন। বর্তমান সময়ে দুই দেশের মানুষের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগযোগ রয়েছে। দুই দেশের মানুষই পর্যটক হিসেবে দুই দেশ ভ্রমণ করছে এবং পরস্পর পরস্পরকে জানছে। সামনের দিনে এই সম্পর্কে আরও গতি আনতে আমরা কাজ করছি।’

কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দুই দেশই সম্পর্কের উত্থান-পতন দেখেছে। বর্তমান সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে? জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘আমি উত্থান-পতন বলতে চাই না। আমি বলতে চাই— বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান। পরিবার বা নিকটজনের মধ্যে অনেক সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত দেখা দিতেই পারে। কিন্তু সেটা আবার বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানও হয়ে যায়। বিগত দিনগুলোতে বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ একাধিক ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে। আমার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে চলমান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।’

বিজ্ঞাপন

চলমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আপনি কোন বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেবেন?— এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘অবশ্যই অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেবো। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে এবং এখানে তুরস্কের বিনিয়োগ বাড়াতে মনোযোগী হব। দুই দেশই অর্থনৈতিক উন্নতি করছে, যা দুই দেশকে আরো ঘনিষ্ঠ হতে একাধিক সুযোগ সৃষ্টি করবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও কিভাবে ঘনিষ্ঠ করা যায়, সে জন্য বাংলাদেশের সচিবালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ চলছে। আমি এরই মধ্যে হাইটেক পার্ক, বিডা ও বেজা কর্তৃপক্ষ, এফবিসিসিআই ও বিজিএমএই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছি। এ ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইসটি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছি।’

হাজার বছরের সম্পর্কে গতি আনতে চায় তুরস্ক

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, অটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশল, পর্যটন, জ্বালানি, ইন্টারনেট প্রযুক্তিসহ একাধিক খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আলাপ-আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এখান থেকে আমরা উভয় রাষ্ট্রই লাভবান হতে পারি। এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। এই অঞ্চলগুলো একেকটা একটা জায়গাতে এবং একেকটা বিশেষ বিশেষ অঞ্চল, তাই আমরা এখানে বিনিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি যে আমাদের জন্য কোন জায়গা ভালো হবে।’

সামনের দিনে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা বলেন, ‘দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছর তুরস্ক সফর করেছেন। তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বছর বাংলাদেশ সফর করার কথা থাকলেও চলমান করোনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। দুই দেশের পুলিশের মধ্যে সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি নিয়ে আমরা দুই দেশই কাজ করছি, যেখানে দুই দেশের মধ্যে পুলিশ প্রশিক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান, সহিংসতা ও চরমপন্থা প্রতিরোধ, মাদক নির্মূলের মতো বিষয়েগুলো অর্ন্তভুক্ত থাকবে। এই বিষয়ে খুব শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সই হবে বলে আশা করছি।’

বিজ্ঞাপন

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘তিনি আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফর করতে পারেন। তারিখটা এখনো ঠিক হয়নি। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে তুরস্ক সফর করেছিলেন। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্বোধন করেছিলেন। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সফরে বাংলাদেশে তুরস্ক দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধন করবেন। এছাড়া তুরস্ক-বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে ব্যবাসীয়দের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে আমরা কাজ করছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমাঝোতা স্মারক সই হতে পারে। অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ নিয়েও আমরা কাজ করছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে এই বিষয়েও সমাঝোতা স্মারক সই করা হতে পারে।’

দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কিভাবে আরও বাড়ানো যায়— এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘দুই দেশর মধ্যে আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো। এ কারণে দুই দেশের পর্যটকরা দুই দেশ ভ্রমণ করছেন। সামনের দিনগুলোতে সাংস্কৃতিক বিনিময়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিনিময়, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে। আমরা দুই দেশের আর্টিস্টদের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে চাই। বাংলাদেশের লালন সংগীত সুফি ধর্মকে উৎসাহিত করে। আমাদের মধ্যে অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে, যা আমরা মানুষে মানুষে সংযোগ বাড়াতে বিনিময় করতে পারি।’

বিজ্ঞাপন

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস) এবং চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (বিআরআই) সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘আমি মনে করি, চীনের উদ্যোগে বিআরআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে অবাধ, মুক্ত এবং নিরাপদ আইপিএস বাস্তবায়ন মূলত দুইটি উদ্যোগের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা। আমরা জানি যে এশিয়ায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এই অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো, রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা সবগুলো ক্ষেত্রেই এই দুই দেশ বা দুইটি উদ্যোগের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। আমরা চীনের বিআরআই উদ্যোগকে সমর্থন করেছি। কেননা আমরা চাই যে এশিয়ার মানুষের সঙ্গে তুরস্কের মানুষের সংযোগ ঘনিষ্ঠ হোক। আমরা এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চাই। চীনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়বে। আইপিএসও তাই। অর্থাৎ এই অঞ্চলের উন্নয়নে দুই উদ্যোগের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা, তা কিছুটা উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে তুরস্কের নীতি হচ্ছে যে আমরা এই অঞ্চলের মানুষ এবং সরকারের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে চাই।’

আইপিএস ও বিআরআই উদ্যোগের কারণে মিয়ানমার বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ করছে না। জাপান, ভারত ও চীন তাদের স্বার্থে মিয়ানমারকে সমর্থন ও বাড়তি সুবিধা দেওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না। এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান?— জানতে চাইলে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সমর্থন বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের কাঁধে যে বোঝা, সেটা আমি বুঝি। কেননা তুরস্কতেও ৪ মিলিয়ন শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। এই দেশগুলোর (ভারত, চীন, জাপান) উচিত, এই সংকট কাটাতে বাংলাদেশকে সমর্থন জানানো এবং মিয়ানমারের প্রতি চাপ তৈরি করা।’

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান আগামী বছর বাংলাদেশ সফর করতে পারেন— এমন আলোচনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে নতুন কী অগ্রগতি থাকতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত মুস্তফা ওসমান তুরান বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরের জন্য আমাদের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই সফরটি কখন হবে, তা এখনো বলতে পারছি না। আগামী বছরের শুরুতে ঢাকায় ডি-৮ সামিট হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সম্মলনে যোগ দিতে তুরস্কের রাষ্ট্রপতির ঢাকা আসার কথা ছিল। কিন্তু করোনার সংক্রমণের কারণে এই সম্মেলনটি ভার্চুয়ালি হবে। আশা করছি, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে এই শীর্ষ সফরটি অনুষ্ঠি হবে। শীর্ষ সফরে দুই দেশের কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা হবে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, রাজনৈতিক সম্পর্ক, সামরিক সম্পর্কসহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবগুলো বিষয়ে অগ্রগতি হবে।’

সারাবাংলা/জেআইএল/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন