বিজ্ঞাপন

‘জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ জরুরি’

October 23, 2020 | 11:59 am

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বিশ্বে এখন নতুন পরাশক্তির উদয় হচ্ছে, যাকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নতুন শক্তির উদয় চলমান পরাশক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ। যে কারণে যুক্তরোষ্ট্রর নেতৃত্বে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস) এবং চীনের নেতৃত্বে বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি চার দেশের উদ্যোগ কোয়াড, জাপানের বিগ-বিসহ একাধিক সহ-সংগঠনও কাজ করছে। সামনে এসব ঘিরে স্নায়ুযুদ্ধ বা ‘দ্য বিগ গেম’ শুরু হলে অস্বাভাবিক কিছু হবে না। আর এসব হচ্ছে মূলত এই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল বা ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে ঘিরে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ বজায় রাখতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা ডটনেটের নিয়মিত আয়োজন ‘সারাবাংলা ফোকাস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট আ ন ম মুনিরুজ্জামান এমন মন্তব্য করেন। সারাবাংলা ফোকাস অনুষ্ঠানে বুধবারের (২১ অক্টোবর) এই আয়োজনের বিষয় ছিল ‘ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সারাবাংলা ডটনেটের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট এমএকে জিলানী।

মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, ‘যখনই কোনো নতুন শক্তি বা পরাশক্তির উদয় হয়, তখনই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘদিন নতুন কোনো শক্তি বা পরাশক্তির উদয় আমরা দেখিনি। সর্বশেষ দেখেছিলাম গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তারপর আমরা দেখেছিলাম তার (যুক্তরাষ্ট্র) কাছাকাছি বা সমকক্ষ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিযোগিতা করতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক শক্তিবলয়, তা তারা রক্ষা করে চলছিল। এই পরিবর্তনটা এসেছে ইদানীংকালে, যখন চীনের শক্তি উদয় হতে শুরু করে। চীনের শক্তি উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটি বিশ্বে একটি বড় অর্থনীতিতেও পরিণত হয়ে গেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পর চীন বিশ্বে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাষ অনুয়ায়ী, চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তাই দেখা যাচ্ছে যে চীন একটি বড় শক্তি হিসেবে উদয় হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিকভাবে চীনে যে নতুন শক্তি হিসেবে উদয় হচ্ছে, তাতে তারা (চীন) পুরনো পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে— এমনটিই মরেন করেন আ ন ম মুনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যখনই কোনো নতুন শক্তির উদয় হয়, তখন নতুন শক্তি পুরনো শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। এটাই হচ্ছে ক্লাসিক্যাল পাওয়ার গেম। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে বৈশ্বিকভাবে চীনে যে নতুন শক্তির উদয় হচ্ছে তাতে তারা (চীন) পুরনো পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যারা চলমান পরাশক্তিতে (এগজিসটেন্স পাওয়ার) থাকে, তারা নিজেদের নাজুক মনে করে এবং এটা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। প্রতিহত করার চেষ্টা করে এমন একটা পর্যায়ে, যখন তারা মনে করে যে তাকে প্রতিহত করতে পারবে যেন নতুন শক্তি তার সমকক্ষ হতে না পারে। চীন এই মুহূর্তটি অতিক্রম করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে নতুন নতুন যে কৌশল নীতি বা সামরিক কৌশল বা জোট বা অর্থনৈতিক কৌশল বা জোট গঠন হচ্ছে, এই সবগুলোই তার অন্তর্ভুক্ত। এর অংশ হিসেবে এখন আমরা বিশ্বে চীনের উদ্যোগে বিআরআই (বেল্ট এন্ড রোড), যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আইপিএস (ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল), আঞ্চলিকভাবে জাপানের পক্ষ থেকে বিগ-বি উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা দেখতে পাচ্ছি। এই উদ্যোগগুলো মূলত বঙ্গোপসাগর অঞ্চল ঘিরেই বেশি হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

‘জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ জরুরি’

বিশ্বে নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর আগাম লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন জানিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আইপিএসকে নিরাপত্তা জোট হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, তারা ভৌগলিক জোট হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইদানীংকালের মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভৌগলিক জোটের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে (তারা এখন নাম উল্লেখ করেই বলছেন, আগে নাম উল্লেখ করেনি)— বিশ্বজুড়ে চীনের যে কর্মকাণ্ড, যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে প্রতিহত করতে চায়। তাই বিশ্বে নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর আগাম লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। এখানে একপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদেশগুলো, অন্যপক্ষে চীন। একইসঙ্গে আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি— নতুন করে জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা হয়তো এমন পর্যায়ে যেতে পারে যেটি অর্থনৈতিক বা ভৌগলিক জোটের মধ্যে সীমিত নাও থাকতে পারে। এর সঙ্গে হয়তো কিছু সামরিক উপাদান যুক্ত হতে পারে। কাজেই ভূ-কৌশলগত ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। যদি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করছে, তাহলে এই অঞ্চলে একটা বড় ধরনের কৌশল আবার নতুন করে শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আইপিএসের মাধ্যমে চীনকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করবে।’

বিজ্ঞাপন

পরাশক্তিদের এ ধরনের লড়াইয়ে বাংলাদেশের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে আ ন ম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখানে আমাদের (বাংলাদেশ) যেটা প্রয়োজন, আমাদের বর্তমানে যে পররাষ্ট্রনীতি আছে, আমরা যে ভূ-কৌশলগত নীতি সবসময়ে অবলম্বন করে আসছি, সেখানে আমরা বলতে চাচ্ছি যে কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, অর্থাৎ আমরা সবার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বিআরআইয়ের সঙ্গে অফিশিয়ালি যুক্ত হয়। একইসঙ্গে আইপিএসের যে মূলমন্ত্রগুলো আছে, তা আমাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এখানে আমাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু দেখতে পাই না। কাজেই আমরা আইপিএসে সহযোগিতা করতে চাই এবং একইসঙ্গে আমরা বিআরআই’তে যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি, সেখানেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চাই। আমরা কোনোভাবেই একে অন্যকে, অন্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কাজ করতে চাই না, যা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে একইসঙ্গে আমি বলতে চাই, বর্তমান পরিস্থিতিটা খুবই জটিল আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। বিশেষ করে, খুবই স্পর্শকাতর অবস্থানে অবস্থিত ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আমাদের খুবই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে এগুতে হবে এমনভাবে যেন আমরা কোনো একটি জোটের সঙ্গে এককভাবে জড়িয়ে না যাই। আমরা সবার সঙ্গে থাকতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থে কাজ করতে পারি।’

আমাদের নৌ অঞ্চলে এবার আর্ন্তজাতিক নৌবাহিনীর বড় ধরনের উপস্থিতি দেখা যাবে— এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইপিএসের মূলনীতিতে এখন পর্যন্ত সামরিক কোনো নীতির কথা বলা হয়নি। এটা বেশ কিছুদিন এভাবেই চলবে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলো যেমন ফ্রান্স, জার্মানি এরই মধ্যে আইপিএসে সরাসরি সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছে এবং অবস্থান নিয়েছে। আইপএসের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে ফ্রান্স। ফ্রান্স এই কারণে যে তারা মনে করে এই এশিয়া মহাদেশে তাদের সার্বভৌম অঞ্চল রয়েছে। যে কারণে করোনা শুরুর আগে একটি আর্ন্তজাতিক কনফারেন্সে ফ্রান্স তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলপত্র ঘোষণা করে। এদিকে, গত মাসে (সেপ্টেম্বর) জার্মানি তাদের জাতীয় ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলপত্র ঘোষণা করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব আইপিএসের সঙ্গে শুধু যোগই দিচ্ছে না, একইসঙ্গে তারা তাদের সক্রিয় অবস্থানও ঘোষণা করছে। আবার সহযোগী সংগঠন হিসেবে কোয়াড নামের যে জোট সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই কোয়াড’কে আরও বড় করার চেষ্টা করা হতে পারে। এরই মধ্যে ‘কোয়াড প্লাস’ নামে একটি নাম চলে এসেছে, যেখানে বলা হচ্ছে কোয়াডের চার সদস্যের বাইরে আরও কিছু দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে কোয়াড’কে শুধু আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে না রেখে এই জোটকে বড় ধরনের সামরিক ভূমিকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। এটা যদি হয়, তবে দেখা যাবে যে কোয়াডের সঙ্গে আইপিএসের একটা বড় ধরনের সামরিক ভূমিকা যুক্ত হতে পারে। আমরা জানি যে মালাবার ন্যাভাল সিরিজ নামে প্রতিবছর একটি নৌমহড়া হয়, যা এবারও হতে যাচ্ছে। এই মহড়াতে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া কোয়াডের বাকি তিনদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মালাবারের এই নৌমহড়াতে প্রথম দিকে সিঙ্গাপুরও যোগ দিয়েছিল। তখন এই জোটকে ‘ডেমোক্রেটিক ফাইভ’ নামে ডাকা হতো। সিঙ্গাপুর এই মহড়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কোয়াড’ই এই মহড়া পরিচালনা করছিল। তবে ২০০৭ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া কখনো এই মহড়াতে যোগ দেয়নি। এই প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া এই মহড়াতে যোগ দিচ্ছে। তাই আমাদের নৌঅঞ্চলে এবার আর্ন্তজাতিক নৌবাহিনীর বড় ধরনের উপস্থিতি দেখা যাবে। যতবারই মালাবার নৌমহড়া হয়েছে, চীন তা ভালোভাবে নেয়নি। এই অঞ্চলে এমন ধরনের যতবার নৌমহড়া হয়েছে, কখনই চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাই চীন এই মহড়াকে কখনই স্বাগত জানায়নি বা ভালোভাবে নেয়নি। এবার যখন চারটি দেশ নতুন করে আবার এই মহড়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে চীন এবারও স্বাগত জানাবে না বা সঠিকভাবে নিবে না।’

বিজ্ঞাপন

আ ন ম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের এই নৌঅঞ্চলে বড় ধরনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখতে পাচ্ছি। এই প্রতিযোগিতা এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে যা এমন একটা পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যা কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে আরও ওপরে চলে যেতে পারে এবং একটা ধরনের একটা কৌশলগত উদ্বেগ (স্ট্র্যাটেজিক টেনশন) এখানে তৈরি হতে পারে। স্ট্র্যাটেজিক টেনশন যদি কোনো অঞ্চলে শুরু হয়, তবে সেখানে শান্তি থাকে না। বর্তমানে যেভাবে এই বিষয়গুলো এগুচ্ছে, আমরা আশঙ্কা করছি যে স্ট্র্যাটেজিক প্রতিযোগিতার পর্ব অতিক্রম করে এই অঞ্চলে এক ধরনের স্ট্র্যাটেজিক টেনশন এবং স্ট্র্যাটেজিক টেনশন থেকে স্ট্র্যাটেজিক কনফ্লিকটের (কৌশলগত বা স্নায়ুযুদ্ধ) দিকে যেতে পারে। এই বিষয়ে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর অবস্থানে অবস্থান করছি। ইতিহাস বলে— যখনই কোনো নতুন শক্তির উদয় হয়, তখন তা ভূ-রাজনৈতিকের চেয়ে কোনো একটি বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হিসেবে উদয় হয়েছিল। এখন বিশ্বে যে নতুন শক্তির উদয় হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রথমেই আসছে চীনের নাম। তারপরই ভারতের নাম আসছে। এবং দুই শক্তি উদয়ের পেছনে প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে ভারত মহাসাগর। একইসঙ্গে বর্তমান বিশ্বে যাকে এশিয়ান সেঞ্চুরি হিসেব আখ্যায়িত করা হয়, সেখানে দেখা যায়— এশীয় অঞ্চলে যে ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে, তার কারণে এই যে নতুন দুইটি শক্তির উদয় হচ্ছে, তার প্রধান ক্ষেত্রভূমি ভারত মহাসাগর। এই কারণে বর্তমান বিশ্বে যে পাওয়ার গেম বা পলিটিকস হচ্ছে, সেখানে ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব অনেক বেশি।’

আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই পরিস্থিতিতে সমপর্যায়ের দু’জনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সম-দূরত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশকে চলতে হবে— এটিই পরামর্শ মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামানের। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ আমরা। অর্থাৎ ভারত মহাসাগরের (আইওআর) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে। একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের যে স্থানে বাংলাদেশের অবস্থান, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মেরিটাইম ক্রিটিক্যাল স্পেস। তাই আমাদের সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে, যেন আমরা ভুল করে কোনো ভুল পথে চলে না যাই। তাই আমাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এবং পররাষ্ট্রনীতি এমন হতে হবে, যেন আমরা দুই শক্তির সঙ্গেই থাকতে পারি এবং নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে কাজ করতে পারি। অর্থাৎ সমপর্যায়ের দু’জনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সম-দূরত্ব বজায় রাখতে পারি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে একটি দেশের গভীর ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করা ক্ষমতা থাকতে হয়। এই গভীর ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ যে শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যারা জড়িত তারাই করতে পারেন, এমন ভাবা ঠিক না। এখানে সংযুক্তভাবে পর্যালোচনা করে, বিশ্লেষণ করে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকরা, সামরিক নির্ধারকরা, চিন্তাশালায় যারা কাজ করেন তারা, বিভিন্ন একাডেমিক এক্সপার্টরা, যারা এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চা করেন— এসব বিষয়ে এই সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে গভীর বিশ্লেষণের চর্চা সৃষ্টি করি, তাহলেই আমরা জাতীয়ভাবে সম্পূর্ণ একটি নীতি নির্ধারণ করতে পারব। এমন ধরনের প্রচেষ্টা এখনো বাংলাদেশ দেখা যাচ্ছে না। এই বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা দৃশ্যমান কোনো নীতি নেওয়া হয়েছে— সে ধরনের কোনো নিদর্শনও এখনো দেখা যাচ্ছে না। আমি বলতে চাই, এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, যা আরও জটিলতর হবে এবং এই জটিল পরিস্থিতিতে আমরা যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে শক্তিশালী দেশ হিসেবে পদচারণা করতে চাই, তবে প্রতিনিয়তই সমন্বিতভাবে গভীর বিশ্লেষণের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো এখনই নেওয়া খুব জরুরি। আমার মনে হয়, এই জায়গাতে কিছুটা হলেও আমরা পিছিয়ে আছি।’

সারাবাংলা/জেআইএল/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন