বিজ্ঞাপন

‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ বাস্তবায়নে আইনের প্রয়োগ জরুরি

October 28, 2020 | 10:41 pm

সন্দীপন বসু

কেউ শুনছে না কারও কথা

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস। কী বিপুল তাণ্ডবে লণ্ডভন্ড করে দিয়েছে আমাদের সাজানো পৃথিবীটাকে। সংক্রমণের শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসংস্থা প্রতিবেদন ও নথিতে যে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেই তুলনায় বাংলাদেশে করোনার তাণ্ডবলীলা এখনো অনেকটাই কম। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে— এ কথা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু জীবাণুর বিরুদ্ধে অসম এই যুদ্ধে একে সাফল্য বলার সুযোগও কম। সরকার ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা প্রবল। বিশ্বের অনেক দেশে এরই মধ্যে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পাশাপাশি পাশের দেশ ভারতেও করোনার দ্বিতীয় সংক্রমণ শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের বরাতে জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গত আট দিন ধরেই আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের প্রায় আট মাস পরে এসে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে করোনায় মারা গেছেন ৫ হাজার ৮৬১ জন। এখন পর্যন্ত মোট ৪ লাখ তিন হাজার ৭৯ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭৭৩ জন। এর মধ্যে টানা ৬৬ দিনের লকডাউন ও সাধারণ ছুটি ছিল। ছিল জনগণকে সচেতন করার জন্য সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার নেওয়া নানা পদক্ষেপ।

কিন্তু এই সচেতনতামূলক পদক্ষেপ অনেকক্ষেত্রেই কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ১৮ মার্চ প্রথম করোনায় মৃত্যুর তথ্য জানার পর জনগণের মধ্যে ভয় অথবা সচেতনতার একটি বাতাবরণ দেখা গেলেও সাড়ে সাত মাস পরে এসে সেই সচেতনতা একেবারে উধাও। একইসঙ্গে জনগণের মন থেকে উধাও হয়ে গেছে করোনার ভয়াবহতাও!

বিজ্ঞাপন

লকডাউন উঠে যাওয়ার পর আমাদের বড় শহরগুলোসহ গ্রামের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। শহরে ভিড়ভাট্টা এখন আগের মতোই, খুঁজলেও অনেকের মধ্যে একজনের মুখে করোনা সচেতনতার ন্যূনতম উদাহরণ মাস্ক দেখা যায় না। অথচ মাস্ক ব্যবহার করতে সরকারি নির্দেশনা, বেসরকারি আর্তি-আবেদন কোনো কিছুরই কমতি ছিল না, নেইও। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনস্বার্থে আইনের প্রয়োগ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনেরা গণমানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গেছেন বারবার, এখনো করছেন। কিন্তু কার্যত এইসব নির্দেশনা, সচেতনতা, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুরোধ ও আইনের কথা— সবকিছুকেই থোড়াই কেয়ার করেছে জনগণ।

এদিকে ক’দিন পরই আসছে শীত। শীত মৌসুমের শুরুতে এমনিতেই জ্বর ও ঠান্ডার প্রবণতা বাড়ে। আর একইসঙ্গে প্রায় নিশ্চিতভাবেই আসছে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার এরই মধ্যে নাগরিকদের সতর্ক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও গণমাধ্যম মানুষকে নানাভাবে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রাস্তায় বের হলে এই সচেতনতার আবেদন-নিবেদনের ফলাফল একবাক্যে বলে দেওয়া যায়— কেউ শুনছে না কারও কথা।

বিজ্ঞাপন

‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’

দেশে কিছুদিন আগ পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের হার ছিল নিম্নমুখী। এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কায় করোনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও করণীয় বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তে সরকারি ও বেসরকারি দফতরগুলোতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাস্ক পরা ছাড়া কাউকেই কোনো ধরনের সেবা দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিভাগটি এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীর ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করাসহ ৯ দফা নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরগুলোকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনার এই ৯ দফার মধ্যে আছে বিদেশ ফেরতদের কঠোর স্ক্রিনিং ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইন নিশ্চিত করা, সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা, অ্যান্টিজেন টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো, দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, গর্ভবতী মা ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ কার্যক্রম, মসজিদের মাইকে মাস্ক পরার বিষয়ে প্রচারণাসহ আরও নানামুখী পদক্ষেপের কথা। নিয়মিত হাত জীবাণুমুক্ত করা এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, সব বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। করোনা ছাড়াও শীতবাহিত অন্যান্য রোগের বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারণার ব্যবস্থা করা এবং করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি আছে এই ৯ দফার ভেতরে।

সরকারি দফতরে মাস্ক ছাড়া সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শীতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে পারে ধরে নিয়ে চারদিকে ‘ম্যাসিভ ইন্সট্রাকশন’ দেওয়া হয়েছে। এর এক নম্বর হলো— নো মাস্ক, নো সার্ভিস। সরকারি অফিসের পাশাপাশি বেসরকারি অফিসগুলোতেও মাস্ক ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সব জায়গায়, সব প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, শপিং মল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্মিলনে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ‘মাস্ক কম্পালসারি’ উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সংবাদমাধ্যমকে আরও জানান, মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানার সচেতনতাবিষয়ক পোস্টার টানাতে এবং বিষয়গুলো নিয়মিত মনিটর করতে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শুধু নির্দেশনা নয়, সংক্রামক আইন প্রয়োগ জরুরি

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই ৯ দফা নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম নির্দেশনাটি হলো স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নিতে করতে হবে।

শুরু থেকেই করোনা ঠেকাতে মাস্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কথা জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের অন্য সবার মতোই বাংলাদেশেও এ নিয়ে অনেক প্রচার, প্রচারণা হয়েছে। প্রায় সবাই বিষয়টি অবগত— এ কথা বলাই যায়। কিন্তু রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, অফিস আদালতে কোথাও এই সময়ে এসে এই মাস্ক নামক বস্তুটির দেখা পাওয়া দুষ্কর। অনেকে নিছকই ভদ্রতাবশত গলায়-থুতনিতে মাস্ক ঝুলিয়ে রাখেন। পরেন না কেন— প্রশ্নটি করলেই আসে নানা ওজর, আপত্তি, অজুহাত। অথচ মাস্ক না পরা একজন করোনাভাইরাস বহনকারী রোগী থেকে আক্রান্ত হতে পারে অসংখ্য সুস্থ মানুষ। আবার তাদের থেকে আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও।

‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ বাস্তবায়নে আইনের প্রয়োগ জরুরি

পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২১ জুলাই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তা গণবিজ্ঞপ্তি ও খবর আকারেও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগ কেবল বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে, কোথাও কড়াকড়ি আরোপের ঘটনা চোখে পড়েনি। মার্চে করোনায় প্রথম মৃত্যুর পর মাস্ক পরা নিয়ে যে হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছিল, তা বহাল ছিল পরের মাসখানেক পর্যন্ত। পরের মাসগুলোতে সারাদেশে যতটুকু মাস্ক পরার প্রবণতা দেখা গেছে, তা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায়। এখন অবশ্য সেই তৎপরতাও গেছে কমে, সুযোগে মাস্ক জিনিসটাকে যেন ভুলেই গেছে মানুষ। এমনকি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গায় শুরুর দিকে মাস্ক পরার ব্যাপারে কড়াকড়ি থাকলেও বর্তমানে দেখা যায় কেউ মানছেন না সেটি। গণপরিবহনে মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রায় কাউকেই মাস্ক পরতে দেখা যায় না।

এখন লাখ টাকার প্রশ্নটি হচ্ছে— মাস্ক পরার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাই জানেন ও বোঝেন, তবুও কেন এই জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি মানতে মানুষের এত অনীহা? এমন একটি ইস্যুতে মানুষ কেন সচেতন হচ্ছেন না? সরকার কেন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারছে না? কেনই বা নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনছে মানুষ?

সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদস্যরা। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন তারা। আরও একমত হয়েছেন, জনসমাগম হয় এমন স্থানে মাস্ক ব্যবহার করতে মানুষকে অনুরোধ ও বাধ্য করা— দু’টিই করতে হবে। প্রয়োজনে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮-এর প্রয়োগ করে জরিমানার বিধান কার্যকর করা হবে। এই আইনে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে জেল-জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

এটা তো সর্বজনস্বীকৃত সত্য, নতুন এই জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে টিকা আসার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে এটাও সত্য, জনগণের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে অনাগ্রহ আছে— এটা জেনে সরকারকে বসে থাকলেও চলবে না। প্রয়োজনে শুধুই নির্দেশনা নয়, সংক্রামক আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দেখার দায়িত্বটা শেষ পর্যন্ত সরকারের। সরকারকেই সংশ্লিষ্ট বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সহযোগিতা ও সমন্বয়ে এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবে। সরকার, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও জনগণ একাত্ম হয়ে কাজ করলে এই করোনা যুদ্ধে জাতি হিসেবে আমরা উৎরে যেতে পারব।

লেখক: সংবাদকর্মী

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন