বিজ্ঞাপন

পাঁচ রাজ্যে নির্ধারণ হবে প্রেসিডেন্ট ভাগ্য

November 2, 2020 | 8:13 pm

ফিচার ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মূলত হাতেগোনা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যই ভাগ্য নির্ধারক হয়ে উঠে। এসব রাজ্যের ভোটারদের দোদুল্যমান মন ও ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যার কারণে নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবার পেনসিলভানিয়া, মিশিগান, উইসকনসিন, জর্জিয়া ও ফ্লোরিডাই মূলত নিয়তি নির্ধারক রাজ্য হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে আগাম জরিপে পিছিয়ে থেকেও এসব রাজ্যের বেশিরভাগে জিতে মূল নির্বাচনে বাজিমাত করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার জো বাইডেন যেমন এসব রাজ্যে জয় তুলে হোয়াইট হাউজ নিশ্চিত করতে চান, তেমনই ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও এগুলোতে জয় পাওয়া ছাড়া খুব কম বিকল্পই হাতে আছে।

বিজ্ঞাপন

এক সময়ের ডেমোক্রেটদের ঘাঁটি ব্লু ওয়াল খ্যাত মিশিগান, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় জিতে ২০১৬ সালে পপুলার ভোট কম পেয়েও বেশি ইলেকটোরাল ভোট যায় ট্রাম্পের দিকে। এবার ডেমোক্রেটরা এসব রাজ্য ফিরে পেতে মাথা বেঁধে নেমেছেন। ট্রাম্পও হাত গুটিয়ে বসে নেই।

সহজ ভাষায় ‘ইলেকটোরাল কলেজ’

বিজ্ঞাপন

দেখে নেওয়া যায় এসব রাজ্যে কার কী অবস্থা—

পেনসিলভানিয়া ( ইলেকটোরাল ভোট- ২০ )
ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের জন্ম এই অঙ্গরাজ্যে। এ রাজ্য এবার মার্কিন নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প ও বাইডেনের নির্বাচনি প্রচারণার সূচি দেখলে বুঝা যায় অঙ্গরাজ্যটিকে কত গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ট্রাম্প পেনসিলভানিয়ায় চারটি র‍্যালিতে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া সোমবারেও আবার এই রাজ্যেই ফিরেছেন। জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিস প্রচারণার শেষ দিনে এ রাজ্যের চার কোণা চষে বেড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ডেমোক্রেটদের ঘাঁটি ব্লু ওয়াল হিসেবে খ্যাত ছিল এই রাজ্য, তবে এখন আর তত নয়। রাজ্যের ফিলাডেলফিয়া ও পিটসবুর্গের মতো শহুরে অঞ্চলের ভোটাররা ব্যাপক হারে ডেমোক্রেটদের ভোট দিলেও গ্রামীণ এলাকাগুলোর ভোটাররা রিপাবলিকানদের দিকেই ঝুঁকেন।

ঐতিহাসিকভাবেই এ রাজ্যে ডেমোক্রেটরা শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের সমর্থনে রিপাবলিকানদের ঠেকানোর চেষ্টা করেন। বড় শহরগুলোর বাইরে যেখানে ডেমোক্রেটদের ঘাঁটি সেখানেও একই অবস্থা। ডেমোক্রেট থেকে পরে রিপাবলিকান শিবিরে যাওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এসব ভোটারদের বেশিরভাগকেই সেসময় নিজের বলয়ে টানতে পেরেছিলেন। তার পরবর্তী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও এসব ভোটারদের ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে ২০১২ সালে বারাক ওবামার দ্বিতীয় দফা নির্বাচন পর্যন্ত এসব সুইং ভোটার ডেমোক্রেটদের পক্ষেই মত দিয়েছেন। তবে ২০১৬ সালে তা পরিবর্তন হয়ে যায়। ট্রাম্প এসে গ্রামীণ শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন।

বিজ্ঞাপন

এবারের নির্বাচনের আগে যেসব জরিপের ফল পাওয়া যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে জানা যাচ্ছে, এবার অন্য ধরনের ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে। রিয়ালক্লিয়ারপলিটিক্স নামক এক জরিপ প্রতিষ্ঠানের রোববারে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, পেনসিলভানিয়াতে জো বাইডেন ৪ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন।

তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ২০১৬ সালের জরিপের মতো এবারও এসব জরিপ ভুল হতে পারে। কারণ এসব সুইং স্টেটে ভোটার মন বুঝা কঠিন হয়ে উঠেছে। গত জুলাইয়ে একই প্রতিষ্ঠানের করা জরিপে ১ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। ওই একই জরিপে ৫৭ শতাংশ মতদাতা বলেছিলেন, তাদের ধারণা— এলাকায় ট্রাম্পের বহু গোপন ভোটার রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মিশিগান (ইলেকটোরাল ভোট- ১৬)
ভোটের রাজনীতিতে অনেকটা পেনসিলভানিয়ার মতোই চিত্র মিশিগানেও। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত এ রাজ্য ডেমোক্রেটদের প্রতি ঝুঁকেছে। তবে ২০১৬ সালে এসে ট্রাম্প এ হিসাব উলটে দেন। সে সময় এ রাজ্যেও জয় পান তিনি।

এবারও পেনসিলভানিয়ার মতো এখানেও বিভিন্ন জরিপে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন। রিয়ালক্লিয়ারপলিটিক্সের জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের চেয়ে গড়ে ৭ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন তিনি। তবে গতবারও কিন্তু নির্বাচনের আগে জরিপে এগিয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু এবার পার্থক্য আছে। এ রাজ্যে গতবার হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে অনেক শক্ত অবস্থানে আছেন জো বাইডেন। তাই অনেকের মতে এ রাজ্যে সহজেই জয় পাবেন তিনি।

২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে এ রাজ্যের কংগ্রেসওম্যান ডেবি ডিংগল তখন হিলারি ক্লিনটনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, জরিপে এগিয়ে থাকলেও এ রাজ্যে প্রচুর ট্রাম্পের ভোটার রয়েছে। তখন তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন— এ রাজ্যে হারতে পারেন হিলারি। পরে তাই হয়েছে। কিন্তু এবার ডেবি ডিংগল বলছেন, গতবারে হিলারির চেয়ে এবার জো বাইডেন অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছেন। ডিংগলের মতে— হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে জো বাইডেন বেশি শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মিশতে পেরেছেন।

পেনসিলভানিয়ার মতো এ অঙ্গরাজ্যেও নির্বাচনের আগে শেষ সময় ব্যয় করছেন দুই দলের প্রার্থীরা। শনিবার বারাক ওবামাকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যে জোর প্রচারণা চালিয়েছেন জো বাইডেন। আর শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন ভিক্টরি র‍্যালি করেছেন। বৃহস্পতিবার এ রাজ্যে সময় দিয়েছেন দুই প্রার্থীর পরিবারের সদস্যরাও।

উইসকনসিন (ইলেকটোরাল ভোট- ১০)
নির্বাচন আসলে উইসকনসিন রাজ্যের নাম বেশ শোনা যায়। গতবার বৈরী এ রাজ্যে জয় পেয়েই হোয়াইট হাউজ নিশ্চিত করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৯৮৪ সালে রোনাল্ড রিগানের ভূমিধ্বস বিজয়ের পর ট্রাম্পের আগে আর কোনো রিপাবলিকান এ রাজ্যে জয় পাননি। উপরের দুই রাজ্যের মতো একই চিত্র এখানেও— শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্রেটদের ভোট দিলেও ২০১৬ সালে তারা ট্রাম্পের উপরই আস্থা রেখেছিলেন। এ রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় রিপাবলিকানদের সমর্থন বেশি হলেও শহর ডেমোক্রেটদের ঘাটি।

এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বড় শহরগুলোর ভোটাররা করোনাভাইরাস মহামারিতে ব্যর্থতা ও অন্যান্য বিষয়ে ট্রাম্পকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। তাই উইসকনসিনের শহর এলাকা থেকে বিশাল সমর্থন পাওয়ার অপেক্ষায় জো বাইডেন। তবে অন্য চিত্রও আছে। কিছু জরিপে দেখা যাচ্ছে, মিলওয়েকির মত গুরুত্বপূর্ণ শহরে ট্রাম্প এখনও এগিয়ে আছেন। গত সেপ্টেম্বরে মারকোইয়েট ল স্কুলের করা এক জরিপে দেখানো হয়েছে, এ অঞ্চলে ১০ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন ট্রাম্প।

২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে এ রাজ্যে পাঁচ বার র‍্যালি করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিপরীতে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এ রাজ্যে জয়ের ব্যাপারে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি কোনো প্রচারণাই চালাননি। যার যথাযথ ফলও পেয়েছিলেন দুই প্রার্থী।

এবার উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে রিয়ালক্লিয়ারপলিটিক্সের জরিপে অবশ্য ৬ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন। গত শুক্রবার ট্রাম্প-বাইডেন দুজনই এ রাজ্যে প্রচারণা চালিয়েছেন। বছর জুড়েই দুই প্রার্থীর অন্যতম গন্তব্য ছিলো উইসকনসিন।

জর্জিয়া (ইলেকটোরাল ভোট- ১৬)
১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের পর এ রাজ্যে আর কোনো ডেমোক্রেট প্রার্থী জয় পাননি। তবে আস্তে আস্তে এ রাজ্যে রিপাবলিকানরাও ভূমি হারিয়েছে। ২০১৮ সালে মিডটার্ম ইলেকশনে জর্জিয়ায় ডেমোক্রেটরা শক্তি দেখিয়েছে। রাজ্যের ষষ্ট কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে দেখা গেছে ডেমোক্রেটদের ভোট বেড়েছে।

রাজ্যটিতে তরুণ সংখ্যালঘু ভোটারদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ রাজ্যে এবার রিয়েলক্লিয়ারপলিটিক্স-এর জরিপ অনুযায়ী মাত্র ০.৪ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন। জো বাইডেন গত মঙ্গলবার এ রাজ্যে র‍্যালি করেছিলেন, আর রোববার শেষ প্রচারণা চালান ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ফ্লোরিডা (ইলেকটোরাল ভোট- ২৯)
এ অঙ্গরাজ্যটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় জনবহুল রাজ্য। ১৯৯৬ সালের পর থেকে ফ্লোরিডার ভোটাররা বরাবরই জয়ী প্রার্থীকে ভোট দিয়ে আসছেন। এখানে বিশাল সংখ্যক ইলেকটোরাল ভোট অনেক হিসাব-নিকাশই পালটে দেয়।

রিয়ালক্লিয়ারপলিটিক্স-এর জরিপে এ রাজ্যেও খুব কম ব্যবধানে এগিয়ে আছেন জো বাইডেনই। আবার কিছু কিছু জরিপ বলছে, রাজ্যটিতে ভোটারদের মন নিয়মিত পরিবর্তন হচ্ছে। এর আগে টেলেমুন্ডের এক জরিপে দেখা যায় ফ্লোরিডার ল্যাটিন বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যে জো বাইডেনের প্রতি সমর্থন ৪৮ ও ট্রাম্পের প্রতি ৪৩ শতাংশ।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে হিস্পাঙ্কি ভোটারদের ৬২ শতাংশই হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিয়েছিলেন। এ রাজ্যে জয় নিশ্চিত করতে হলে হিলারি ক্লিনটনের মতো হিস্পাঙ্কি ভোটারদের টানতে হবে জো বাইডেনকে— যা এখন অনেকটাই কঠিন বলে মনে হচ্ছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনই এ রাজ্যে র‍্যালি করেছেন।

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন