বিজ্ঞাপন

‘যখন আসবেন, আমার ভিটে থেকে একটু মাটি নিয়ে আসবেন’

November 15, 2020 | 4:30 pm

আহমেদ জামান শিমুল

ঢাকা: কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেলেন রোববার (১৫ নভেম্বর) ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে। জীবনের ৮৫টি বসন্ত পেরিয়ে হার মানলেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি এ অভিনেতা। একটানা দীর্ঘ ৪০ দিনের লড়াই শেষ। এই উপমহাদেশে যে ক’জন অভিনেতা মেধায় আর সাবলীলতায় অভিনয়কে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায় তাদের মধ্যে অন্যতম নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বেলাশেষে ‘ফাইট ফেলুদা ফাইট’ ডাকে সাড়া দিলেন না বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম ‘ফেলুদা’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও সৌমিত্রের নাড়ির টান ছিল পদ্মাবিধৌত কুষ্টিয়াতেই। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের শিলাইদহের কাছে কুমারখালীর কয়া গ্রামে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতামহের আমল থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই সৌমিত্রের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া গ্রামের সন্তান নর্দান ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাকিবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সৌমিত্রের। সবশেষ কথোপকথনে ড. রাকিবুলের কাছে সৌমিত্র চেয়েছিলেন, কয়া গ্রামের মাটি। যা স্পর্শ করে তিনি অনুভব করবেন তার বাবা-ঠাকুরদার স্পর্শ।

বিজ্ঞাপন

ড. রাকিবুল হাসানের সঙ্গে সৌমিত্রের যোগাযোগ হয় মোবাইলে। প্রথম ফোন করে রাকিবুল বাংলাদেশ থেকে ফোন দিয়েছেন কিংবা শিক্ষকতা করেন তা বলেননি। বলেছিলেন, ‘স্যার আমি কয়া গ্রাম থেকে’।

রাকিবুল জানতেন, কয়া গ্রাম সৌমিত্রের পূর্বপুরুষের ভিটা। তাঁর ঠাকুরদা ললিত কুমার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিখ্যাত বিল্পবী বাঘা যতিনের আপন ছোট মামা। সে হিসেবে সৌমিত্র বাঘা যতিনের ভাতিজা। তাই ড. রাকিবুলের পরিচয় পেয়ে সৌমিত্র কয়েক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মৌনতা ভেঙ্গে কয়েক মুহুর্ত পরে বললেন, ‘কয়া গ্রাম, আমার কয়া গ্রাম।’ বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করলেন তিনি কথাটা।

বিজ্ঞাপন

সৌমিত্রের নাড়ির টান ছিল বাংলাদেশেই

তারপর ড. রাকিবুল হাসানের বিস্তারিত পরিচয় জেনে জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা, আমাদের যে বাড়িটা ওটা কি আছে? ওটা কি গড়াই নদীতে ভেঙে গেছে?’ যখন জানলেন বাড়িটা ভাঙেনি এবং সেখানে একটি কলেজ হয়েছে শুনে খুশি হলেন।

বিজ্ঞাপন

অনেকে মনে করেন সৌমিত্রের জন্ম কয়া গ্রামে। কিন্তু তিনি নিজে ড. রাকিবকে বলেছেন, ‘আমার মা আমার জন্মের আগে কলকাতায় নানুবাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই আমার জন্ম।’

ওখানে বড় না হলেও সৌমিত্র জানতেন কয়া গ্রাম থেকে শিলাইদহের দূরত্ব মাত্র চার মাইল। কোনদিন ওই গ্রামে যাওয়া না হলেও তিনি বলেন, ‘অচেনা, অদেখা গ্রামটার জন্য মায়া পড়ে আছে। গ্রামটা আমার দেখা হলো না।’

বিজ্ঞাপন

ড. রাকিবুল হাসান সৌমিত্রের সঙ্গে বাঘা যতিন নিয়েও কথা বলেন। জানান, তিনি বাঘা যতিনকে নিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ ও কয়া’ নামে একটি বই লিখেন। সেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিয়ে একটি অধ্যায় আছে—‘সৌমিত্র চট্টোপধ্যায় ও কয়া’। সে বইটি তাঁকে দিতে চান।

ডাকযোগে বইটি পাঠাতে চাইলে ড. রাকিবকে সৌমিত্র সরাসরি দেখা করে বইটি দিতে বলেন। সৌমিত্র বলেছিলেন, আপনি কলকাতাতে আসবেন, আপনার হাত থেকে আমি বইটা নিব। আমি আমার মাটির কাছ থেকে নেব।

‘যখন আসবেন, আমার ভিটে থেকে একটু মাটি নিয়ে আসবেন’

তার জন্য আর কিছু নিয়ে আনবেন কিনা জানতে চেয়েছিলেন ড. রাকিবুল হাসান। আবেগাপ্লুত সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘আমার জন্য কয়া গ্রামের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে আসবেন’।

–আর কি আনবো স্যার?

–যখন আসবেন আমার ভিটে থেকে একটু মাটি নিয়ে আসবেন। আমার কয়া গ্রামের মাটি!

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন ও করোনার কারণে লকডাউন পরে যাওয়ায় আর যাওয়া হয়নি বলে জানান ড. রাকিবুল হাসান। এখন আর সে সুযোগও নেই। কিংবদন্তি সৌমিত্র চলে গেছেন এমন এক জগতে  যেখান থেকে কেউ ফেরে না। তবে যতবার কথা হয়েছে ততবারই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সৌমিত্রের অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে আপ্লুত করেছে বলে জানান রাকিবুল।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়’র চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে নির্মিত প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবির মাধ্যমে। এর আগে তিনি রেডিওর ঘোষক ছিলেন এবং মঞ্চে ছোট চরিত্রে অভিনয় করতেন। ‘অপুর সংসার’ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে তিনি সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেন। পরবর্তীকালে তিনি মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় করের মতো পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন।

সিনেমা ছাড়াও তিনি বহু নাটক, যাত্রা, এবং টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘ফেলুদা’। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেছিলেন যে, ‘তার (সৌমিত্র) চেয়ে ভালো আর কেউ ছবিটি করতে পারতো না।’

গত ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় ৬ অক্টোবর তাকে বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। প্লাজমা থেরাপির পর তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। সেই সঙ্গে চিকিৎসাতেও সাড়া দিতে থাকেন তিনি। কিন্তু আচমকাই আবার তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। চিকিৎসকরা জানান, সৌমিত্রের শরীরে সমস্যার প্রধান কারণ কোভিড এনসেফ্যালোপ্যাথি। তার চেতনার মাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে। আশা করা হয়েছিল প্লাজমাফেরেসিসের পর অভিনেতার আচ্ছন্নভাব ও অসংলগ্নতা অনেকটাই কেটে যাবে। কিন্তু শুক্রবার তার কিছুই হয়নি, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। বেলভিউ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. অরিন্দম কর জানান, এর আগে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চেতনাস্তর ৯ থেকে ১০-এর মধ্যে ছিল। তা পাঁচ পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। এই স্তর তিনে পৌঁছে গেলে ব্রেন ডেথ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। শনিবার ডা. অরিন্দম কর জানালেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারকে পুরো বিষয়টি জানানো হয়েছে। রাত থেকে তার অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। রবিবার সকালে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। কোনো ওষুধেই আর সাড়া দিচ্ছিলেন না তিনি। কমছিল রক্তচাপ এবং রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা। ভারতীয় সময় বেলা ১২ টা ১৫ মিনিট (বাংলাদেশ ১২টা ৪৫ মিনিট) নাগাদ মৃত্যু হয় তার।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে— অপুর সংসার (১৯৫৯), ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০), দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা (১৯৬১), ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১), অতল জলের আহ্বান (১৯৬২), বেনারসী (১৯৬২), অভিজান (১৯৬২), সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কিনু গোয়ালার গলি (১৯৬৪), বাক্স বদল (১৯৬৫), কাপুরুষ (১৯৬৫), একই অঙ্গে এত রূপ (১৯৬৫), আকাশ কুসুম (১৯৬৫), মণিহার (১৯৬৬), কাঁচ কাটা হীরে (১৯৬৬), হাটে বাজারে (১৯৬৭), অজানা শপথ (১৯৬৭), বাঘিনী (১৯৬৮), তিন ভুবনের পারে (১৯৬৯), পরিণীতা (১৯৬৯), অপরিচিত (১৯৬৯), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), প্রথম কদম ফুল (১৯৭০), মাল্যদান (১৯৭১), স্ত্রী (১৯৭২), বসন্ত বিলাপ (১৯৭৩), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), সংসার সীমান্তে (১৯৭৪), দত্তা (১৯৭৬), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮), দেবদাস (১৯৭৯), গণদেবতা (১৯৭৯), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), কোণি (১৯৮৪), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), আতঙ্ক (১৯৮৬), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), তাহাদের কথা (১৯৯২), মহাপৃথিবী (১৯৯২), হুইল চেয়ার (১৯৯৪), পারমিতার একদিন (২০০০), দেখা (২০০১), আবার অরণ্যে (২০০২), পাতালঘর (২০০৩), পদক্ষেপ (২০০৬), দ্য বং কানেকশন (২০০৬), চাঁদের বাড়ি (২০০৭), নোবেল চোর (২০১২), মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর (২০১২), অলীক সুখ (২০১৩), রূপকথা নয় (২০১৩), দূরবিন (২০১৪)।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান 'Officier des Arts et Metiers' পেয়েছেন । সত্তরের দশকে তিনি পদ্মশ্রী পান কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে পান সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। ২০০১ ও ২০০৮ সালে দু’বার চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার পান। ২০১২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেছেন।

সারাবাংলা/এজেডএস/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন