বিজ্ঞাপন

রাজনীতি নয়, হেফাজতের সমস্যা ‘সিন্ডিকেট’!

November 26, 2020 | 9:51 pm

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঢুকে পড়া নিয়ে হৈ চৈ চলছে। তবে ‘রাজনীতি’ নয়, বরং ‘সিন্ডিকেট’-ই হেফাজতের মূল সমস্যা। গত ১৫ নভেম্বরের কেন্দ্রীয় সম্মেলন থেকে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, তা মূলত জুনায়েদ বাবুনগরী, নূর হোসাই কাসেমী এবং মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হকের সিন্ডিকেট কমিটি— এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে ১৫১ সদস্যের এ কমিটির অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কমিটিতে কয়েকজন জামায়াত নেতাও ঢুকে পড়েছেন। হেফাজতের নতুন কমিটির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক। হাবিবুল্লাহ আজাদীসহ আরও ছয় থেকে আট জন জামায়াত নেতা হেফাজতের নতুন কমিটিতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হেফাজতে জামায়াত নেতাদের ঢুকে পড়া নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের অনেকেই একসময়  জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়া সাবেক কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহী এক সময় জামায়াত করতেন। তিনি বাদ পড়েছেন জুনায়েদ বাবুনগরী, নূর হোসাইন কাসেমী ও মামুনুল হক সিন্ডিকেটের কোপে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- হেফাজতের রাজনীতি: ধীরে চলো নীতিতে শফীপন্থীরা

এ ছাড়া বাদ পড়া আলোচিত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতের সাবেক কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, ঢাকা মহানগরের মহাসচিব আবুল হাসানাত আমিনী। তারা দু’জনেই রাজনীতিতে সক্রিয়। আবুল হাসনাত আমিনী ইসলামী ঐক্যজোটের আমীর এবং মুফতি ফয়জুল্লাহ মহাসচিব। তাদের হেফজাতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হলেও ‘হেফাজতে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে’ বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সে অভিযোগ থেকে হেফাজতের মুক্তি মিলত না— এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টারা।

বিজ্ঞাপন

তাছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের দুই শীর্ষ নেতাকে হেফাজত থেকে বাদ দেওয়া হলেও তাদের দল থেকে অন্তত চার জনকে নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হেফাজত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দল বা নেতা হিসেবে নয়, কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে নির্ধারণ হয়েছে জুনায়েদ বাবুনগরী, নূর হোসাইন কাসেমী ও মামুনুল হকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে।

সূত্রমতে, হেফাজতের গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে— রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সংগঠনটির শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু নতুন কমিটির মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব। এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, জুনাইদ আল হাবিবসহ তিন জন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব হয়েছেন। জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি মুনির হোসাইন কাসেমীকে দেওয়া হয়েছে হেফাজতের অর্থ সম্পাদক পদ। এ ছাড়া আব্দুর রউফ ইউসুফ, বাহাউদ্দিন, মনজুরুল ইসলাম, ফয়সল, হাবিবুল্লাহসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন জমিয়তের প্রায় ৩৫ জন নেতা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এই ৩৫ জন নেতা হেফাজতে নতুন নয়। সাবেক কমিটিতেও এরা ছিলেন। খোদ নূর হোসাইন কাসেমী গত কমিটির নায়েবে আমির ছিলেন। ছিলেন ঢাকা মহানগর হেফাজতের আমিরও। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়া সাবেক নায়েবে আমির মুফতি ওয়াক্কাছ নিজেও জমিয়তে উলামেয়ে ইসলামের (একাংশ) আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মূলত, শফীপন্থী হওয়ার কারণে এবারের কমিটিতে এবারের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাননি। তাকে রাখা হয়েছে উপদেষ্টা। তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখার পেছনেও কাজ করেছে বাবুনগরী-নূর হোসাইন কাসেমী সিন্ডিকেট।

সূত্রমতে, সিন্ডিকেটের পাশাপাশি ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রও সমানভাবে কাজ করেছে হেফাজতের নতুন কমিটির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক যুগ্ম মহাসচিব, তার বড় ভাই খেলাফতে মজলিসের সাবেক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হককে নায়েবে আমির পদে বসানো হয়েছে। বাবুনগরীর নিকট আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে নতুন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে— যা এরই মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজন কমিটিতে যাকে আহ্বায়ক করা হয়েছিল, সেই মুহিব উল্লাহ বাবু নগরীর সঙ্গে জুনায়েদ বাবুনগরীর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। এই মুহিব উল্লাহ বাবুনগরী ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে হেফাজত থেকে বেরিয়ে যান। তাকে দিয়ে সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছে মূলত জুনায়েদ বাবুনগরী-নূর হোসাইন কাসেমীর সিন্ডিকেট কমিটি গঠন করার জন্য— এমনটিই অভিযোগ পদবঞ্চিতদের।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহী সারাবাংলাকে বলেন, ‘কমিটিতে যারা পদ পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশিই বিশেষ দু’টি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা ও বাবুনগরীর আত্মীয়-স্বজন। এই কমিটি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

কিন্তু যারা বাদ পড়েছেন তারাও তো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী— এমন প্রশ্নের জবাবে রুহী বলেন, ‘আসলে রাজনীতি এখানে সমস্যা না। মূল সমস্যা হলো সিন্ডিকেট। মূলত, বাবুনগরী-নূর হোসাইন কাসেমী মিলে সিন্ডিকেট কমিটি গঠন করেছে। তারা প্রয়াত আহমদ শফীর আদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্র কায়েক করেছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী সারাবাংলাকে বলেন, “হেফাজতের বেশিরভাগ নেতা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। যারা কমিটিতে আছেন, তারাও যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আবার যারা ‘সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে’র কারণে বাদ পড়েছেন, তারাও কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং ‘হেফাজতে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে’ বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা ঠিক নয়।”

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিটি গঠন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো সিন্ডিকেট নাই। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যোগ্য লোকদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা বাদ পড়েছেন, তারা তাদের কর্মদোষেই বাদ পড়েছেন।’

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন